চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘অসমাপ্ত পরীক্ষা’ নিয়ে ছেলে ভোলানো খেলা

পরীক্ষার উদ্যোগ নেই এক সপ্তাহেও, শিক্ষার্থীরা হতাশ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) করোনাভাইরাসের কারণে আটকে থাকা বিভিন্ন বিভাগের অসমাপ্ত পরীক্ষা স্বাস্থ্যবিধি মেনে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নেওয়ার ঘোষণা দিলেও এক সপ্তাহেও এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেয়নি কর্তৃপক্ষ। এখনও পর্যন্ত পরীক্ষা সংক্রান্ত কোনো কমিটি গঠন বা এই সংক্রান্ত কোনো নির্দেশনা দেয়নি তারা। ফলে পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে কর্তৃপক্ষের ঘোষণাকে ‘শুভংকরের ফাঁকি’ হিসেবে দেখছেন শিক্ষার্থীরা। অন্যদিকে ১০ দিনের মধ্যে পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে অগ্রগতি দৃশ্যমান হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ১৫ নভেম্বর দুপুরে অনুষ্ঠিত একাডেমিক কাউন্সিলের সভায় অসমাপ্ত পরীক্ষা দ্রুত নেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করতে উপাচার্যকে ক্ষমতা দেয় একাডেমিক কাউন্সিল। একইসঙ্গে পরীক্ষা চলাকালীন আবাসিক হলগুলো না খোলার বিষয়েও সিদ্ধান্ত হয়। তবে কর্তৃপক্ষের এমন সিদ্ধান্তে শিক্ষার্থীরা আশা ফিরে পেলেও দ্রুতই সেটা পরিণত হয় হতাশায়। এক সপ্তাহেও ন্যূনতম অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশা ব্যক্ত করেছেন চবি শিক্ষার্থীরা। এমন পরিস্থিতিতে পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে আদৌ কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা আছে কিনা তা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন তারা।

অসমাপ্ত পরীক্ষা নেওয়ার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসা আইন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ফোরকানুল আলম চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গত ১৫ নভেম্বরের একাডেমিক কাউন্সিলের মিটিংয়ে স্থগিত পরীক্ষা নেওয়ার ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে সাংবাদিকদের মাধ্যমে জেনেছি। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও কোনো অফিসিয়াল নোটিশ বা কোনো কমিটি বা সিদ্ধান্তের কোনো বাস্তবায়ন এখনো দৃশ্যমান হয়নি। যেখানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটা কাশি দিলেও অফিসিয়াল নোটিশ আসে, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান শেষ পর্বের হাজারো শিক্ষার্থীর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরীক্ষা নিয়ে এই ধরনের মশকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনকে মানায় না। এ যেন শুভঙ্করের ফাঁকি, ছেলে ভোলানোর কাল্পনিক গান। এই প্রহসনের অবসান হোক।’

পরিসংখ্যান বিভাগের একই বর্ষের শিক্ষার্থী তাইব হাসান বাঁধন বলেন, ‘পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার এক সপ্তাহ হয়ে গেলেও এখনও কোন অগ্রগতি নেই। বিভাগ থেকে বলা হচ্ছে কর্তৃপক্ষ কমিটিই গঠন করতে পারেনি। কমিটি গঠন হলে যে নির্দেশনা আসবে তা মেনে পরীক্ষা নেওয়া হবে। তবে কখন কমিটি গঠন হবে কিংবা আদৌ হবে কিনা তা আমরা জানি না। এসব নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে।’

তিনি বলেন, ‘৪১তম বিসিএসের সার্কুলার হয়ে গেল, আবেদন করতে পারিনি। এখন নাকি ৪৩তম বিসিএসেরও সার্কুলার দিবে। আমরা এটাতেও আবেদন করতে পারবো না।’

ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী রিপন সরকার বলেন, ‘সবাই শুধু আশ্বাসই দিয়ে যাচ্ছে। কর্তৃপক্ষ বলে পরীক্ষা নেবে। আর বিভাগ তাকিয়ে আছে কর্তৃপক্ষের দিকে। কর্তৃপক্ষ আসলে সময়ক্ষেপণ করার জন্যই এসব করছে। তারা পরীক্ষা নেবে বলে মনে হচ্ছে না। আমরা কোনো ভরসা পাচ্ছি না।’

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক এসএম মনিরুল হাসান চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘এখনও কমিটি গঠন করা হয়নি। উপাচার্য মহোদয় ডিনদের সাথে কথা বলে একটা নির্দেশনা দেবেন। আগামী ৮-১০ দিনের মধ্যে একটা অগ্রগতি দেখতে পাবে শিক্ষার্থীরা।’

এ বিষয়ে জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. শিরীণ আখতারকে মুঠোফোনে কয়েকবার কল দিলেও তিনি সাড়া দেননি।

প্রসঙ্গত, করোনাভাইরাসের সংক্রমণের শংকায় গেল মার্চের মাঝামাঝিতে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি)। ফলে দুই একটা কোর্স বাকি থাকতেই স্থগিত হয়ে যায় বিভিন্ন বর্ষে চলমান ফাইনাল পরীক্ষা। আর এতে বিপাকে পড়েছেন বিভিন্ন বিভাগের কয়েক হাজার শিক্ষার্থী। স্বাস্থ্যবিধি মেনে অসমাপ্ত পরীক্ষা নেওয়ার দাবিতে দুই দফা মানববন্ধন ও উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপিও দিয়েছে বিভিন্ন বিভাগের ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে অসমাপ্ত পরীক্ষার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, করোনা সংকটে সাধারণ ছুটি ঘোষণার আগে বিভিন্ন বিভাগের পুরোদমে পরীক্ষা চলমান ছিল। এর মধ্যে বেশিরভাগ বিভাগ সম্পূর্ণ পরীক্ষা শেষ করলেও কিছু বিভাগে অর্ধেক পরীক্ষা শেষ করে আটকে যায়। এসব বিভাগের মধ্য আছে অর্থনীতি, ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা, সমাজতত্ত্ব ও আইন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের পরীক্ষা, রাজনীতি বিভাগের তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষ, লোক প্রশাসন ও সংস্কৃত বিভাগের মাস্টার্স, হিসাব বিজ্ঞান ও মানবসম্পদ ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের দুটি ব্যাচের ইন্টারশিপের মৌখিক পরীক্ষা, ফার্মেসি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের তিনটি ব্যবহারিক পরীক্ষা, গণিত বিভাগের তৃতীয় বর্ষ ও দ্বিতীয় বর্ষের ব্যবহারিক, ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের মৌখিক ও ব্যবহারিক, ফরেস্ট্রি এন্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের অষ্টম সেমিস্টার, ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সের দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষ, ওশানোগ্রাফি বিভাগের তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষ ও ফিশারিজ বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষা অর্ধেকের মধ্যে আটকে আছে। এছাড়া বেশ কয়েকটি বিভাগে পরীক্ষার রুটিন দেওয়া হয়েছিল।

সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!