চট্টগ্রাম বন্দর বোর্ডে প্রতিনিধি কেন নেই— প্রশ্ন ব্যবসায়ীদের

0

বাংলাদেশের অর্থনীতির লাইফলাইন চট্টগ্রাম বন্দর। বাংলাদেশের গেটওয়েও বলা হয় এ বন্দরকে। নৌ-পরিবহনের অন্যতম মাধ্যম চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম হয়ে থাকে। আর আমদানি-রপ্তানিকারক তথা ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীরাই চট্টগ্রাম বন্দরের প্রাণ। ব্যবহারকারীদের টাকায় চলে এ বন্দর। বিপুল পরিমাণ রাজস্ব প্রদান করে এ বন্দর ব্যবহারকারীরা তথা ব্যবসায়ীরা। অথচ চট্টগ্রাম বন্দর বোর্ডে নেই বন্দর মূল ব্যবহারকারী বা ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি। এতে বন্দর সম্পর্কিত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নেওয়া হয় না বন্দর ব্যবহারকারীদের মতামত ও পরামর্শ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর ফলে ব্যবসায়ীদের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। এতে বন্দরের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ছে না। অদক্ষই থেকে যাচ্ছে বন্দর। আমদানি-রপ্তানি পণ্যবাহী কোনো কনটেইনার ক্ষতিগ্রস্ত হলে ক্ষতিপূরণ পান না ব্যবসায়ীরা। এগুলো বলার কোনো জায়গা নেই। বোর্ডে ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি না থাকায় বন্দরের কাজে স্বচ্ছতা থাকছে না। আধুনিকায়ন সম্পর্কে ধারণা পাচ্ছে এই বন্দর।

বন্দর ব্যবহারকারীরা বলছেন, যুগের পর যুগ এ বন্দরে বিরাজ করে বিভিন্ন সমস্যা। একটি সংকটের সুরাহা হলে আরেকটি চাঙ্গা হয়ে ওঠে।

বন্দরের অভ্যন্তরে এবং বহির্নোঙ্গরের বিরাজমান নানা সমস্যার সমাধান এবং দেশের ভবিষ্যত চাহিদা পূরণে একটি সংকটমুক্ত বিশ্বমানের বন্দরের প্রত্যাশা করেন এর ব্যবহারকারীরা। একইসঙ্গে দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এবং স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য চট্টগ্রাম বন্দর বোর্ডে ব্যবসায়ীদের প্রতিনিনিধি অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। বোর্ডে ব্যবসায়ীদের অন্তর্ভুক্তি বন্দরের কাজে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে।

জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) পাঁচজনের একটি বোর্ড রয়েছে। এ বোর্ডে রয়েছেন চবক চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল জুলফিকার আজিজ, সদস্য (প্রশাসন) মো. জাফর আলম, সদস্য (অর্থ) মো. কামরুল আমিন, সদস্য (প্রকৌশল) কমডোর খন্দকার আক্তার এবং সদস্য (হারবার ও মেরিন) ক্যাপ্টেন এম শফিউল বারী।

জানা যায়, মন্ত্রণালয় থেকেই চট্টগ্রাম বোর্ডে সদস্যদের নিয়োগ দেওয়া হয়। বন্দর সম্পর্কিত যে কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এ বোর্ড থেকেই নেওয়া হয়।

চট্টগ্রাম বন্দর বোর্ডে নিজেদের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করাতে হলে ব্যবসায়ীদেরকেই সোচ্চার হতে হবে বলে মনে করেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বারের সচিব এম সেলিম উল্লাহ। তিনি বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে কোনো কিছু বলার জায়গা নেই। যাদের জন্য বন্দর, তাদের প্রতিনিধিই নেই বোর্ডে। ব্যবসায়ীরাই বন্দরের মূল ব্যবহারকারী। পণ্যবাহী কনটেইনারের কোনো ক্ষতি হলে স্টিভিডোরের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। ব্যবসায়ীদেরকেই ক্ষতি বহন করতে হবে। ২০ ফুট আর ৪০ ফুটের খালি কনটেইনার পরিবহনে একই খরচ। তাই টার্মিনাল অপারেটর বিশ ফুটের খালি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করতে চায় না। ’

চট্টগ্রাম বন্দর বোর্ডে ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন বিজিএমইএর প্রথম সহ-সভাপতি মোহাম্মদ আবদুস সালাম। তিনি বলেন, ‘বন্দর বোর্ডে মন্ত্রণালয় থেকেই নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক), চট্টগ্রাম ওয়াসার মতো বন্দর বোর্ডেও ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি থাকা প্রয়োজন।’

বোর্ডে ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি থাকলে চট্টগ্রাম বন্দর উপকৃত হবে বলে মনে করেন বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাফা) পরিচালক (পোর্ট অ্যান্ড কাস্টম) খায়রুল আলম সবুজ। তিনি বলেন, ‘বন্দর বোর্ডে ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। এতে অভিজ্ঞতা ও আইডিয়া শেয়ার করা যায়। বিশ্বের অন্যান্য বন্দরগুলো দ্রুত উন্নত হচ্ছে কিভাবে? উন্নত বন্দরগুলো গ্যান্ট্রিক্রেন ব্যবহার করছে আরো ২০ বছর আগ থেকে। চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করছে এখন। বোর্ডে ব্যবসায়ীদের অন্তর্ভুক্তি থাকলে আলোচনার সুযোগ থাকে।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান আহসানুল হক চৌধুরী বলেন, ‘শিপিং এজেন্টরাই হলো চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় ব্যবহারকারী। চট্টগ্রাম বন্দর বোর্ডে আমাদের প্রতিনিধি রাখার বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার জন্য আমরা এফবিসিসিআই এর কাছে চিঠি লিখেছি। তৎকালীন নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাহাজান খানকেও বলেছি। বন্দর যদি এর স্টেক হোল্ডারদের সঙ্গে নিয়ে চলতে চায়, তাহলে এর আইন পরিবর্তন করতে হবে। শিপিং এজেন্ট থেকে একজন এবং আমদানি-রপ্তানিকারকদের থেকে একজনকে বন্দর বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এর ফলে চট্টগ্রাম বন্দেেরর কাজে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে। তারা যে যন্ত্রপানিত কিনছে, তার প্রয়োজনীয়তা-অপ্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আমরা জানতে পারবো। পাশাপাশি আমাদের পরামর্শ নিয়ে বন্দরও লাভবান হবে।’

চট্টগ্রাম চেম্বার এবং পোর্ট ইউজার্স ফোরামের সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, ‘যখন চট্টগ্রাম পোর্ট ট্রাস্ট ছিল, তখন সেখানে পদাধিকার বলে চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি সদস্য হতেন। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ করার পর বোর্ডে ব্যবসায়ীদের আর রাখা হয় না। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দর বোর্ডে ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের কথা আমাদেরকেই বলতে হবে। আমাদের দাবি, বন্দর বোর্ডে ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করা হোক।’

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মো. ওমর ফারুক চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর আইন দ্বারা সৃষ্ট একটি প্রতিষ্ঠান। ১৯৭৬ অর্ডিন্যান্স অনুসারে এটি পরিচালিত হয়। ওই অর্ডিন্যান্সে নির্দিষ্ট করা আছে, কারা কারা বন্দর বোর্ডের সদস্য হবেন। আইন যদি সংশোধন হয়, তাহলে ভিন্ন কথা। বোর্ডে প্রতিনিধি রাখার জন্য ব্যবসায়ীরা কোথায় আবেদন করেছেন, আমার জানা নেই। তবে সরকার যদি আইন পরিবর্তন করে, তাহলে বন্দর বোর্ডে ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।’

এমএ/এএইচ

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

আরও পড়ুন