চট্টগ্রাম বন্দর আবার জিম্মি, রোববার সকাল থেকে লাগাতার ধর্মঘট

রমজানের আগে আমদানি-রপ্তানিতে ঝুঁকি

চট্টগ্রাম বন্দরকে আবারও অচল করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বিএনপিপন্থী শ্রমিক সংগঠনের নেতারা। নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি অপারেটরকে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ ঘিরে কর্মসূচি দুই দিন স্থগিত থাকার পর রোববার সকাল আটটা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য লাগাতার ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। নতুন ঘোষিত কর্মসূচিতে বন্দরের বহির্নোঙরেও কাজ বন্ধ রাখার ঘোষণা এসেছে। কর্মসূচি কার্যকর হলে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর কার্যত অচল হয়ে পড়বে। এর আগে শ্রমিকদের আন্দোলনে ছয় দিনে প্রায় ৬৬ কোটি ডলার বা প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য আটকে যাওয়ার তথ্যও উঠে আসে।

আন্দোলনের নামে নৈরাজ্য সৃষ্টির অভিযোগ ওঠা এই কর্মচারীদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ তদন্তের জন্য বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
আন্দোলনের নামে নৈরাজ্য সৃষ্টির অভিযোগ ওঠা এই কর্মচারীদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ তদন্তের জন্য বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।

রোববার সকাল থেকে পূর্ণ অচলাবস্থার আশঙ্কা

শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কর্মসূচি ঘোষণা করেন বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীর ও মো. ইব্রাহিম খোকন। তারা বলেন, কোনো কর্মচারী ধর্মঘট চলাকালে কাজে যাবেন না। সরকারকে অনেক সময় দেওয়া হলেও কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। তাই অনির্দিষ্টকালের জন্য লাগাতার ধর্মঘটে যেতে বাধ্য হয়েছেন তাঁরা।

নেতারা জানান, এতদিন আন্দোলন চললেও বন্দরের বহির্নোঙরের কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়নি। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ না আসায় রোববার থেকে বহির্নোঙরেও পণ্য খালাস বন্ধ থাকবে।

এনসিটি ইজারা বাতিলই মূল দাবি

সংগ্রাম পরিষদের কর্মসূচির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার ভার দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার প্রক্রিয়া বাতিল। পরিষদের সমন্বয়ক মো. ইব্রাহিম খোকন বলেন, ‘বৃহস্পতিবার নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে বৈঠকে পূর্ণাঙ্গ আশ্বাস না পেলেও ব্যবসায়ীদের ক্ষতি ও রোজার পণ্য খালাসের কথা বিবেচনায় নিয়ে আমরা কর্মসূচি দুই দিনের জন্য স্থগিত করেছিলাম। কিন্তু বৈঠকের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আন্দোলনকারীদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা ও সম্পদ তদন্তের জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষ চিঠি দেয়। বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান এসব পদক্ষেপ নিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করেছেন। এ অবস্থায় আবার লাগাতার কর্মসূচিতে যাওয়া ছাড়া উপায় ছিল না।’

তিনি বলেন, সরকারকে স্পষ্টভাবে ঘোষণা দিতে হবে যে এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে লিজ দেওয়া হবে না। পাশাপাশি বন্দর চেয়ারম্যানকে প্রত্যাহার করে আইনের আওতায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। আন্দোলনরত কর্মচারীদের বিরুদ্ধে নেওয়া সব শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বাতিল এবং তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়ার দাবিও জানান তিনি।

আন্দোলন স্থগিতের পর দুদকের চিঠি

কর্মসূচি স্থগিতের পরপরই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ১৫ জন কর্মচারীর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে আবেদন করে। একই সঙ্গে তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারির বিষয়েও সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানাতে অনুরোধ করা হয়। এ তথ্য জানার পর আন্দোলনকারীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং নতুন করে লাগাতার ধর্মঘটের ঘোষণা দেন।

এর আগে নৌপরিবহন উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের পর বৃহস্পতিবার বিকেলে আন্দোলন দুই দিনের জন্য শিথিল করা হয়েছিল। ওই সময় আন্দোলনকারী ১৬ কর্মচারীকে অন্যান্য বন্দরে বদলিও করা হয়। পরে আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী শ্রমিক-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত ও দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়।

আগের কর্মসূচিতে বড় বাণিজ্য ক্ষতি

এনসিটি ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গত ৩১ জানুয়ারি থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে কর্মবিরতি শুরু করে বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল। পরে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে আন্দোলন চালানো হয়। প্রথম তিন দিন আট ঘণ্টা করে কর্মবিরতি, পরে ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতি এবং এরপর লাগাতার কর্মসূচি পালন করা হয়। এতে বন্দরের কনটেইনার পরিবহন কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়ে।

এর আগে শ্রমিকদের আন্দোলনে ছয় দিনে প্রায় ৬৬ কোটি ডলার বা প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য আটকে যাওয়ার তথ্যও উঠে আসে। আন্দোলনের কারণে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল, চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল এবং জেনারেল কার্গো বার্থের কার্যক্রম একপর্যায়ে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

দেশের বাণিজ্যে বড় ঝুঁকি

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে সমুদ্রপথে দেশের আমদানি-রপ্তানি পণ্যের প্রায় ৭৮ শতাংশ পরিবহন হয়। কনটেইনার পরিবহনের ক্ষেত্রে প্রায় ৯৯ শতাংশই এই বন্দরনির্ভর। বন্দর বন্ধ হলে কনটেইনারে রপ্তানি কার্যত থেমে যায় এবং শিল্পকারখানার কাঁচামাল খালাস বন্ধ হয়ে পড়ে।

দেশের মোট রপ্তানির বড় অংশ এই বন্দর দিয়ে পরিচালিত হওয়ায় নতুন করে লাগাতার ধর্মঘট শুরু হলে রপ্তানি খাতে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীরা। রমজান সামনে রেখে আমদানি পণ্য খালাস বন্ধ থাকলে বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে তাঁদের আশঙ্কা।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের নেতা মোহাম্মদ হারুন, তসলিম হোসেন, আবুল কাসেম, ইয়াসিন রেজা রাজু, জাহিদ হোসেন, হারুন, ইমাম হোসেন খোকেন ও শরীফ হোসেন ভুট্টো।

বন্দর অচলের নেপথ্যে ১৫ জনের বলয়

সাধারণ শ্রমিকদের উস্কে দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর অচল করে দেওয়ার নেপথ্যে রয়েছে মোট ১৫ শ্রমিক নেতা। এদের তাদের মধ্যে কেউ চট্টগ্রাম বিভাগীয় শ্রমিক দলের সদস্য, কেউ বন্দর শ্রমিক দলের সদস্য হিসেবে যুক্ত। এর মধ্যে রয়েছেন মোংলা বন্দরে বদলির আদেশ পাওয়া অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও পরিদর্শন বিভাগের অডিট সহকারী মো. হুমায়ুন কবির এবং পায়রা বন্দরে বদলির আদেশ পাওয়া নৌ বিভাগের ইঞ্জিন ড্রাইভার মো. ইব্রাহিম খোকন। দুজনই চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ ও বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সমন্বয়ক।

এ ছাড়া রয়েছেন পায়রা বন্দরে বদলির আদেশ পাওয়া প্রকৌশল বিভাগের এসএস খালাসি মো. ফরিদুর রহমান, পরিবহন বিভাগের উচ্চ বহিঃসহকারী মো. শফি উদ্দিন, রাশেদুল ইসলাম, পরিকল্পনা বিভাগের স্টেনোটাইপিস্ট মো. জহিরুল ইসলাম, বিদ্যুৎ বিভাগের এসএস পেইন্টার মো. হুমায়ুন কবির, যান্ত্রিক বিভাগের ইসিএম ড্রাইভার মো. লিয়াকত আলী এবং যান্ত্রিক বিভাগের খালাসি মো. রাব্বানী।

তালিকায় আরও আছেন মোংলা বন্দরে বদলির আদেশ পাওয়া পরিবহন বিভাগের এফসিএল শাখার উচ্চ বহিঃসহকারী আব্দুল্লাহ আল মামুন, প্রশাসন বিভাগের উচ্চমান সহকারী মো. শাকিল রায়হান, যান্ত্রিক বিভাগের ইসিএম ড্রাইভার মানিক মিঝি, প্রকৌশল বিভাগের মেসন মো. শামশু মিয়া এবং যান্ত্রিক বিভাগের ইসিএম ড্রাইভার আমিনুর রসুল বুলবুল।

ksrm