চট্টগ্রাম বন্দরে নতুন অধ্যায়, এনসিটির দায়িত্ব যাচ্ছে বিদেশি অপারেটরের হাতে
খসড়া চুক্তি অনুমোদন দিল সরকার
চট্টগ্রাম বন্দরের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তনের পথে বাংলাদেশ। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় আন্তর্জাতিক অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া আবারও এগিয়েছে। অবশেষে চুক্তির খসড়া অনুমোদন দিয়েছে সরকার। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বন্দরের পরিচালন সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি আমদানি-রপ্তানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে এবং বাংলাদেশ বৈশ্বিক লজিস্টিকস নেটওয়ার্কে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে। এর পাশাপাশি টার্মিনালটি ঘিরে দীর্ঘদিনের লুটপাটের অবসান ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে এনসিটির পরিচালনার দায়িত্ব আন্তর্জাতিক অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়ার খসড়া চুক্তি অনুমোদনের কথা জানানো হয়। শুরু থেকেই এনসিটি ইজারা দেওয়ার বিষয়ে দুবাইভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা হলেও কোন্ বিদেশি অপারেটরকে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে, বিজ্ঞপ্তিতে তা উল্লেখ করা হয়নি।
বন্দরের সবচেয়ে বড় টার্মিনাল
চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে চালু থাকা চারটি কনটেইনার টার্মিনালের মধ্যে এনসিটি সবচেয়ে বড়। গত বছর চট্টগ্রাম বন্দরে হ্যান্ডলিং হওয়া মোট কনটেইনারের ৪৪ শতাংশই হয়েছে এই টার্মিনালে।
২০২৪ সালের ৭ জুলাই থেকে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব নেয় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি চট্টগ্রাম ড্রাইডক লিমিটেড (সিডিডিএল)। এরপর থেকে এনসিটিতে কনটেইনার হ্যান্ডলিং ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) ও সরকারি পর্যায়ে (জিটুজি) কাঠামোর অধীনে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে তখন সেই উদ্যোগ চূড়ান্ত পরিণতি পায়নি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এনসিটির দায়িত্ব বিদেশি অপারেটরের হাতে দেওয়ার কার্যক্রম আবার শুরু করে।
অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি অপারেটরের হাতে দেওয়ার বিষয়ে জোর আলোচনা শুরু হলে আন্দোলনে নামেন বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের একাংশ।
পরে অন্তর্বর্তী সরকার গত ৮ ফেব্রুয়ারি এনসিটি বিদেশি অপারেটরকে ইজারা দেওয়ার কার্যক্রম স্থগিত করে। এরপর বিএনপির নতুন সরকার গত ৪ জুন দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয়।
সরকারের নির্দেশনার পর আলোচনা প্রক্রিয়ায় সহায়তার জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ১২ সদস্যের একটি সাপোর্ট টিম গঠন করে।
চট্টগ্রাম বন্দরের নিজস্ব অর্থায়নে প্রায় ৫৮২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ২০১৭ সাল থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে কনটেইনার হ্যান্ডলিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে বর্তমানে টার্মিনালটি বিভিন্ন পরিচালনাগত চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী কনটেইনার হ্যান্ডলিং সরঞ্জামের সহজলভ্যতা ৯৩ শতাংশ হওয়া প্রয়োজন হলেও এনসিটিতে তা বর্তমানে ৭০ শতাংশে নেমে এসেছে।
এ কারণে বর্তমানে টার্মিনালটিতে প্রতি ঘণ্টায় ২০ থেকে ২২টি কনটেইনার হ্যান্ডলিং সম্ভব হচ্ছে, যেখানে আন্তর্জাতিক মান প্রতি ঘণ্টায় ৩০টি। ফলে জাহাজের অবস্থানকাল বেড়ে যাচ্ছে এবং আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের ব্যয়ও বাড়ছে। এ প্রেক্ষাপটে বিদেশি অপারেটরের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্বের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিনিয়োগ ও আধুনিক প্রযুক্তির প্রতিশ্রুতি
বিশ্বের ৭০টিরও বেশি দেশে ৮০টি টার্মিনাল পরিচালনা করছে ডিপি ওয়ার্ল্ড। বাংলাদেশে লজিস্টিকস ও অবকাঠামো খাতে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে।
জানা গেছে, ডিপি ওয়ার্ল্ড এনসিটিতে অত্যাধুনিক টার্মিনাল পরিচালনা ব্যবস্থা, স্মার্ট সফটওয়্যার এবং পরিবেশবান্ধব বন্দর প্রযুক্তি যুক্ত করবে। পাশাপাশি তাদের বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের কারণে বিশ্বের শীর্ষ জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলো চট্টগ্রাম বন্দরে সরাসরি বড় মাদার ভ্যাসেল পাঠাতে আগ্রহী হতে পারে। এতে দেশের আমদানি-রপ্তানি ব্যয় প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
মালিকানা ও নিরাপত্তা রাষ্ট্রের হাতেই
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এ অংশীদারিত্বে দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ‘ল্যান্ডলর্ড মডেল’ অনুযায়ী বন্দরের জমি, জেটি ও অবকাঠামোর মালিকানা রাষ্ট্রের কাছেই থাকবে। ডিপি ওয়ার্ল্ড নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কেবল পরিচালনার লাইসেন্স পাবে।
এ ছাড়া বন্দরের সামগ্রিক নিরাপত্তা, বহির্নোঙর এলাকায় নজরদারি এবং সাইবার গেটওয়ে নিয়ন্ত্রণ করবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও দেশীয় নিরাপত্তা বাহিনী। ডিপি ওয়ার্ল্ডের ব্যবহৃত সব তথ্য ও সিসিটিভি ফিড তাৎক্ষণিকভাবে কাস্টমস এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পর্যবেক্ষণ করতে পারবে বলেও সূত্র জানিয়েছে।
সিপি




