চট্টগ্রাম বন্দরে দেড় কোটির কাপড় উধাও হয়ে মিলল শুধু খালি কন্টেইনার, জাল কাগজে গায়েব আরও এক

সিস্টেমে অথচ ‘আছে’ দেখাচ্ছে এখনও

চট্টগ্রাম বন্দরের কম্পিউটার স্ক্রিনে এখনও একটি কন্টেইনার ‘আছে’ বলে দেখাচ্ছে, অথচ বাস্তবে সেটি বহু আগেই বন্দরের গেট পেরিয়ে উধাও হয়ে গেছে। বন্দরের নিজস্ব ওরাকল সিস্টেমের রেকর্ড এখনও বলছে, কন্টেইনারটি সিসিটি ইয়ার্ডেই সংরক্ষিত আছে, অথচ টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম (টিওএস) ও সরেজমিন অনুসন্ধানে সেটির কোনো অস্তিত্বই মেলেনি। সিল-স্বাক্ষর জাল করে, রাতের আঁধারে সিস্টেমে অবৈধ এন্ট্রি দিয়ে বের করে নেওয়া হয়েছে ৮০ লাখ টাকার কাপড়ভর্তি একটি কন্টেইনার। এটিই দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরে অল্প কিছু দিনের ব্যবধানে ঘটা দ্বিতীয় কন্টেইনার গায়েবের ঘটনা, যার মোট মূল্য প্রায় দুই কোটি ত্রিশ লাখ টাকা। প্রথম ঘটনায় দশ মাস পর উদ্ধার হয়েছে শুধু খালি কন্টেইনার, ভেতরের পণ্যের কোনো হদিস মেলেনি। পরপর ঘটা এই দুই ঘটনা নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থা, ইয়ার্ড তদারকি ও কাগজপত্র যাচাই প্রক্রিয়াকে।

প্রথম ঘটনায় ধারণা করা হচ্ছে, গত বছরের ৪ আগস্ট থেকে চলতি বছরের ২ এপ্রিলের মধ্যবর্তী কোনো এক সময়ে কন্টেইনারটি গায়েব হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় মামলা হওয়ার পর দশ মাসের মাথায় ৪০ ফুট দীর্ঘ খালি কন্টেইনারটি উদ্ধার করে বন্দর থানা পুলিশ। এখানেই শেষ নয়, চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি থেকে ২৮ এপ্রিলের মধ্যবর্তী সময়ে কাপড় বোঝাই আরও একটি কন্টেইনার গায়েব হয়, যার এখনও কোনো খোঁজ মেলেনি।

জাল কাগজ, জাল সই, তদন্তে বেরোল আরও জালিয়াতি

বন্দর থানার পরিদর্শক (ওসি) আবদুর রহিম জানান, কাপড়ভর্তি কন্টেইনার গায়েবের ঘটনায় গত ৭ এপ্রিল থানায় মামলা দায়ের করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। মামলাটি বন্দর থানায় মামলা নম্বর ৯ হিসেবে রুজু হয়, যাতে চুরির অভিযোগে পেনাল কোডের ৩৭৯ ধারা প্রয়োগ করা হয়। যে ইয়ার্ড থেকে কন্টেইনারটি গায়েব হয়েছে, সেই ইয়ার্ডের ইনচার্জ মিজানুর রহমান ও ক্রেন অপারেটর আবু সুফিয়ানকে এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া যে লং ভেহিকেলে কন্টেইনারটি বন্দর থেকে বের করা হয়েছে, সেই গাড়ির হেলপার রুবেলকে ঢাকার আশুলিয়া থেকে এবং দুলালকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। গায়েব হওয়া আরেকটি কন্টেইনার নিয়েও তদন্ত চলছে।

পুলিশ কর্মকর্তা আবদুর রহিম বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত ১৪ জুন হালিশহরের আব্বাসপাড়ার গলাচিপা এলাকা থেকে খালি কন্টেইনারটি উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত আরেক ব্যক্তি এখনও পলাতক। তাকে পাওয়া গেলে পণ্যের প্রকৃত গন্তব্য সম্পর্কে জানা যাবে বলে জানান তিনি।

পণ্যভর্তি কন্টেইনার গায়েবের ঘটনায় মামলাটি দায়ের করেন বন্দরের জেআর ইয়ার্ডের পরিবহন পরিদর্শক মো. আবদুল মান্নান। মামলার এজাহারে বলা হয়, ঢাকার গাজীপুরের মুয়াজ উদ্দিন টেক্সটাইল নামের একটি প্রতিষ্ঠান চীন থেকে একটি ফেব্রিক্স পণ্যবাহী কন্টেইনার (কন্টেইনার নম্বর টিসিএলইউ৮৫৫৭৩০৪এক্স৪০) আমদানি করেছিল। কন্টেইনারটি গত বছরের ৪ আগস্ট বার্থ অপারেটর বশির আহমেদ অ্যান্ড কোম্পানির মাধ্যমে বন্দরের সংরক্ষিত কনটেইনার ও পণ্য রাখার জেআর ইয়ার্ডে রাখা হয়। চলতি বছরের ২ এপ্রিল কন্টেইনারটি কায়িক পরীক্ষার পর দ্রুত ডেলিভারির জন্য জেআর ইয়ার্ডের অ্যাপ্রেইজ ক্লার্কের সঙ্গে যোগাযোগ করে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এস জামান অ্যান্ড ব্রাদার্স। দিনভর খোঁজাখুঁজি করেও কন্টেইনারটির হদিস মেলেনি, পরে ডেলিভারি অ্যাসাইনমেন্ট বাতিল করা হয়।

কন্টেইনার গায়েবের ঘটনা এখানেই থামেনি। চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি থেকে ২৮ এপ্রিলের মধ্যবর্তী সময়ে কাপড় বোঝাই আরও একটি কন্টেইনার গায়েব হওয়ার ঘটনা ঘটে, যা নিয়েও বন্দর থানায় পৃথক মামলা হয়েছে। গায়েব হওয়া এই কন্টেইনারভর্তি কাপড়ের বাজারমূল্য আনুমানিক ৮০ লাখ টাকা। কাপড়গুলো আমদানি করেছিল ঢাকার খিলক্ষেত সুপার মার্কেটের ফাহিম অ্যাটায়ার অ্যান্ড কম্পোসিট লি. নামের একটি প্রতিষ্ঠান।

রাত দুইটা ৫৪ মিনিটে সিস্টেমে ‘ভুতুড়ে’ এন্ট্রি

এজাহারে বলা হয়, ফাহিম অ্যাটায়ার অ্যান্ড কম্পোসিট লি. চীন থেকে ফেব্রিক্স পণ্যবাহী ৪০ ফুট দীর্ঘ একটি কন্টেইনার (কন্টেইনার নম্বর কেওসিইউ–৪৮২৯৩৯৯) আমদানি করে। কন্টেইনারটি চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি টার্মিনাল অপারেটর মেসার্স সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেডের মাধ্যমে জাহাজ থেকে ডিসচার্জ করে চিটাগং কন্টেইনার টার্মিনালে (সিসিটি) রাখা হয়। পণ্যবাহী এই কন্টেইনারটি গত ২৮ এপ্রিল কাস্টমসের পণ্য যাচাইয়ের জন্য অ্যাসাইনমেন্টভুক্ত ছিল, অর্থাৎ এই তারিখে কন্টেইনার নামানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু সিসিটি ইয়ার্ডের ডায়েরি থেকে জানা যায়, কন্টেইনারটির অবস্থান খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কন্টেইনারের অবস্থান জানতে গত ৬ মে টার্মিনাল অপারেটর মেসার্স সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেডকে চিঠি দেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ। গত ১০ মে সাইফ পাওয়ারটেক কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে জানায়, গত ২১ জানুয়ারি কন্টেইনারটি জাহাজ থেকে নামিয়ে সিসিটি ইয়ার্ডে রাখা হয়েছিল এবং গত ১৭ মার্চ তা অনডেট অনচেসিস পদ্ধতিতে দ্রুত খালাস প্রক্রিয়ায় ডেলিভারির জন্য নির্ধারণ করা হয়। কন্টেইনারটি চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেমে (টিওএস) অনচেসিস হিসেবে ডেলিভারি দেখানো হয়েছে বলে টিওএসে সংরক্ষিত আছে। তবে একইসঙ্গে বন্দরের ওরাকল সিস্টেমে এখনো কন্টেইনারটি সিসিটি ইয়ার্ডেই সংরক্ষিত আছে বলে দেখানো হচ্ছে, অর্থাৎ বন্দরের দুটি পৃথক সিস্টেমে কন্টেইনারটির অবস্থান নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

এজাহারে বলা হয়, টার্মিনাল অপারেটর সাইফ পাওয়ারটেকের চিঠি পাওয়ার পর কন্টেইনারের কাগজপত্র যাচাই–বাছাই করা হয়। মামলার বাদী পরিবহন পরিদর্শক হিসেবে কর্মরত হামিদুর রহমান বলেন, অনডেট ও অনচেসিস অ্যাসাইনমেন্টের ৫০ নম্বর ক্রমিকের কপিতে থাকা সৈয়দ মোহাম্মদ হামিদুর রহমান, ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (সিসি), সিসিটি ও এনসিটি ইয়ার্ড, চট্টগ্রাম পোর্ট অথরিটি নামের সিলের জায়গায় ভুলভাবে সৈয়দ মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান, ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (সিসি), সিসিটি অ্যান্ড এনসিটি ইয়ার্ড, চট্টগ্রাম পোর্ট অথরিটি লেখা রয়েছে। তিনি দাবি করেন, ডকুমেন্টে থাকা সই ও সিল তার নয়, এবং সব কাগজপত্র ও স্বাক্ষর জাল করে কন্টেইনারটি বন্দর থেকে বের করে নেওয়া হয়েছে।

এজাহারে আরও বলা হয়, অনডেট ও অনচেসিস অ্যাসাইনমেন্টের কপিতে থাকা পরিবহন পরিদর্শকের স্থলে থাকা টার্মিনাল ম্যানেজার দপ্তরের এফসিএল পরিবহন পরিদর্শক মো. শফিকুল ইসলাম এবং প্রিপারড বাইয়ের স্থলে থাকা উচ্চমান বহিঃসহকারী এমএইচ সিরাজীর স্বাক্ষরও তাদের নয়। কাগজপত্রে থাকা সিল ও স্বাক্ষরে গরমিল রয়েছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়।

টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম (টিওএস) যাচাই করে দেখা যায়, বন্দরের এফসিএল শাখার কর্মচারী মোকাদ্দেস হোসেন টিওএস সিস্টেমের আইডি ও পাসওয়ার্ড অবৈধভাবে ব্যবহার করে চলতি বছরের ১৭ মার্চ রাত আনুমানিক দুইটা ৫৪ মিনিটে কন্টেইনারের তথ্য টিওএস সিস্টেমে প্রবেশ করান। একই সময়ে কন্টেইনারটি টার্মিনাল অপারেটর সাইফ পাওয়ারটেকের ইক্যুইপমেন্ট অপারেটরের সহায়তায় নামানো হয়। পরে কন্টেইনারটি বন্দরের গেট দিয়ে বাইরে বের করে নেওয়া হয়, তবে ঠিক কোন্ সময়ে এটি বন্দর থেকে বের করা হয়েছিল, তা জানেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। মামলাটি বন্দর থানায় মামলা নম্বর ১১ হিসেবে রুজু হয়, যাতে প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগে পেনাল কোডের একাধিক ধারা প্রয়োগ করা হয়। এজাহারে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি, বরং অজ্ঞাতনামা আসামির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

সাইফ পাওয়ারটেকের ভূমিকা ঘিরে প্রশ্ন

দ্বিতীয় ঘটনায় টার্মিনাল অপারেটর সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেডের ভূমিকা দ্বিমুখী চরিত্র নিয়ে হাজির হয়েছে। একদিকে কন্টেইনারের অবস্থান জানতে বন্দর কর্তৃপক্ষের চিঠির জবাবে প্রতিষ্ঠানটি যে তথ্য সরবরাহ করে, তার সূত্র ধরেই কাগজপত্রের গরমিল ও জালিয়াতি প্রথম ধরা পড়ে। অন্যদিকে এজাহারে উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, যে সময়ে বন্দরের এফসিএল শাখার কর্মচারী মোকাদ্দেস হোসেন অবৈধভাবে অন্যের আইডি ব্যবহার করে রাতের আঁধারে টিওএস সিস্টেমে কন্টেইনারের তথ্য প্রবেশ করান, একই সময়ে সাইফ পাওয়ারটেকের নিজস্ব ইক্যুইপমেন্ট অপারেটরের সহায়তাতেই কন্টেইনারটি নামানো হয়। অর্থাৎ একটি ৪০ ফুট দীর্ঘ কন্টেইনার বন্দরের গেট পেরিয়ে বাইরে যাওয়ার পুরো প্রক্রিয়ায় টার্মিনাল অপারেটরের কর্মী সরাসরি যুক্ত ছিলেন বলে এজাহারের তথ্যে উঠে এসেছে, যদিও কোন কর্মকর্তা বা কর্মচারী এই কাজে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছেন, তা এখনও জানাতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা।

নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন উদ্বেগ

স্বল্প ব্যবধানে ঘটা এই দুই কন্টেইনার গায়েবের ঘটনা চট্টগ্রাম বন্দরের সার্বিক নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। প্রথম ঘটনায় একটি ৪০ ফুট দীর্ঘ কন্টেইনার আট মাসেরও বেশি সময় ধরে নিখোঁজ থাকার বিষয়টি বন্দর কর্তৃপক্ষের নজরেই আসেনি, যা ইয়ার্ড পর্যায়ের নিয়মিত মজুত যাচাইয়ে গুরুতর অবহেলার বিষয়টি ওঠে আসে। দ্বিতীয় ঘটনায় টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেমের মতো স্পর্শকাতর সিস্টেমে অন্যের পরিচয় ব্যবহার করে রাতের আঁধারে এন্ট্রি দেওয়া, একাধিক কর্মকর্তার সিল-স্বাক্ষর জাল করা এবং বন্দরের দুটি পৃথক সিস্টেমে কন্টেইনারের অবস্থান নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য থাকার বিষয়টি সামনে আসায় বন্দরের অভ্যন্তরীণ নথি যাচাই প্রক্রিয়া ও তথ্যপ্রযুক্তি নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই একটি ৪০ ফুট কন্টেইনার বন্দরের গেট দিয়ে ঠিক কখন ও কিভাবে বের হয়ে গেল, তার সুনির্দিষ্ট রেকর্ড সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছেও না থাকার বিষয়টি তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বন্দর থানার পরিদর্শক আবদুর রহিম জানান, সিসিটি ইয়ার্ড থেকে কাপড়ভর্তি কন্টেইনার পাচার হওয়ার ঘটনায় বন্দর কর্তৃপক্ষ পৃথক একটি মামলা দায়ের করেছে। পণ্যগুলো কীভাবে বন্দরের বাইরে গেল এবং এ ঘটনায় কারা জড়িত, সবকিছু খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

সিপি

ksrm