চট্টগ্রামে ৮ জনের পকেটে ৮ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ

চট্টগ্রামভিত্তিক নয়টি প্রতিষ্ঠানের হাতে আছে ৭ হাজার ৬৮৭ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ। দেশের সেরা ২০ ঋণখেলাপির নয়টিই চট্টগ্রামের এসব প্রতিষ্ঠান। এই নয়টি প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় আছেন আট শিল্পপতি। বছরের পর বছর এই খেলাপি ঋণের চক্করে পড়ে অনেক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান রীতিমতো ঝুঁকির মধ্যে পড়ে গিয়েছে।

চট্টগ্রামভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে— ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড লিমিটেড, রাইজিং স্টিল কোম্পানি লিমিটেড, ইলিয়াস ব্রাদার্স (প্রা.) লিমিটেড, সাদ মুসা ফেব্রিক্স লিমিটেড, সামান্নাজ সুপার অয়েল লিমিটেড, এহসান স্টিল রি-রোলিং, সিদ্দিক ট্রেডার্স এবং এসএম স্টিল রি-রোলিং মিলস।

মঙ্গলবার (২৪ জানুয়ারি) জাতীয় সংসদে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে মোট ১৬ হাজার ৫৮৭ কোটি ৯২ লাখ টাকা খেলাপি ঋণের অর্ধেকই চট্টগ্রামের এই নয় প্রতিষ্ঠানের। যদিও প্রকাশিত তথ্যের চেয়ে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বেশি হবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

ঋণের ভারে ডুবন্ত ওয়েস্টার্ন মেরিন

চট্টগ্রামভিত্তিক জাহাজনির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড লিমিটেড বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে মোট এক হাজার ৮৫৫ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে এক হাজার ৫২৯ কোটি ৭৪ লাখ টাকাই খেলাপি ঋণ। তবে সবমিলিয়ে ওয়েস্টার্ন মেরিনের কাছে অন্তত দুই হাজার কোটি টাকা পাবে ১৯টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী এসব ঋণের অধিকাংশই দীর্ঘমেয়াদে পুনর্গঠন ও রি-শিডিউলিং করা হয়েছে। যদিও এই ঋণের একটি অংশ আবার মন্দ ঋণ হিসেবে ক্লাসিফায়েড করা হয়েছে।

দেখা গেছে, ওয়েস্টার্ন মেরিন শুধু ন্যাশনাল ব্যাংক থেকেই ঋণ নিয়েছে ৭২১ কোটি টাকা। ব্যাংক এশিয়া থেকে নিয়েছে ৪৪৮ কোটি টাকা। এই কোম্পানিটির কাছ থেকে সোনালী ব্যাংক পাবে ১১৭ কোটি টাকা, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ১১১ কোটি টাকা, এনসিসি ব্যাংক ১০০ কোটি টাকা, আইএফআইসি ব্যাংক ৭২ কোটি টাকা, ঢাকা ব্যাংক ৬৩ কোটি টাকা এবং ওয়ান ব্যাংক পাবে ৫৩ কোটি টাকা। অন্যদিকে তুলনামূলক ছোট অংক হলেও পূবালী ব্যাংক পাবে ৫ কোটি টাকা, ব্র্যাক ব্যাংক ৫ কোটি টাকা, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ৩ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে কোম্পানিটির কাছ থেকে।

Yakub Group

এছাড়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মাইডাস ফিনান্স ওয়েস্টার্ন মেরিন থেকে পাবে ৪৫ কোটি টাকা, ইউনিয়ন ক্যাপিটাল ৩৬ কোটি টাকা, প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স ৩২ কোটি টাকা, রিলায়েন্স ফাইন্যান্স ২২ কোটি টাকা, ফারইস্ট ফাইন্যান্স ও ইনভেস্টমেন্ট ১৭ কোটি টাকা, ন্যাশনাল ফাইন্যান্স ১৩ কোটি টাকা, উত্তরা ফাইন্যান্স ও ইনভেস্টমেন্ট ১১ কোটি টাকা, ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্স ও ইনভেস্টমেন্টের পাওনা ২ কোটি টাকা।

আসলাম চৌধুরীর ৯৯০ কোটি

চট্টগ্রামভিত্তিক রাইজিং স্টিল কোম্পানি লিমিটেড বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে মোট ১ হাজার ১৪২ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৯০ কোটি ২৮ লাখ টাকা। বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরী প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান। তার স্ত্রী জামিলা নাজনিল মাওলা ছাড়াও দুই ভাই আমজাদ হোসেন চৌধুরী ও জসিম উদ্দিন চৌধুরীও প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে জড়িত।

আগাগোড়াই খেলাপি ইলিয়াস ব্রাদার্স

চট্টগ্রামে একসময়কার প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান ইলিয়াস ব্রাদার্স (প্রা.) লিমিটেডের নামে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছে ৯৬৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এর পুরো টাকাটাই খেলাপি ঋণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে অগ্রণী ব্যাংকে ২৮০ কোটি, ন্যাশনাল ব্যাংকে ২৭০ কোটি, ইস্টার্ন ব্যাংকে ৭৩ কোটি, এবি ব্যাংকে ৬২ কোটি, ইসলামী ব্যাংকে ৬৩ কোটি, মার্কেন্টাইল ব্যাংকে ৫৫ কোটি, সিটি ব্যাংকে ৫৫ কোটি, ব্যাংক এশিয়ায় ৩৯ কোটি, ওয়ান ব্যাংকে ৩০ কোটি, স্টান্ডার্ড ব্যাংকে ২৪ কোটি, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকে ১৮ কোটি, পুবালী ব্যাংকে ৭ কোটি এবং এক্সিম ব্যাংকে খেলাপি ঋণ রয়েছে ৪ কোটি টাকা।

প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার শামসুল আলম চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি ছিলেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে এখনও তার নাম রয়েছে। তিনি ছাড়াও তার স্ত্রী ও পরিচালক কামরুন নাহার বেগম, চেয়ারম্যান নুরুল আবসার, পরিচালক মোহাম্মদ নুরুল আলম, নুরুল আবসারের স্ত্রী ও এবং পরিচালক তাহমিনা বেগম বিভিন্ন ব্যাংকের দায়ের করা মামলায় কয়েক দফায় কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন।

সাদ মুসার ট্রিপল সেভেন

চট্টগ্রামভিত্তিক আরেক প্রতিষ্ঠান সাদ মুসা ফেব্রিক্স লিমিটেড বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে মোট এক হাজার ১৩১ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৭৭৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।

পোশাক খাতের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ মহসিনের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানটি যেসব ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে সাউথইস্ট ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, আল-আরাফা ইসলামী ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, এনআরবিসি ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক এবং প্রিমিয়ার ব্যাংক। এছাড়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে উত্তরা ফাইন্যান্স, বিডি ফাইন্যান্স এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং।

আবু আলমের এহসান গ্রুপ

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী আবু আলমের মালিকানাধীন এহসান গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান এহসান স্টিল রি-রোলিং বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে মোট ৬২৪ কোটি ২৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৫৯০ কোটি ২৩ লাখ টাকাই খেলাপি ঋণ।

এহসান গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে আরও রয়েছে মেসার্স আলম এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ, এহসান রি-রোলিং মিলস লিমিটেড, এহসান স্টিল রি-রোলিং মিলস লিমিটেড, এহসান প্রোপার্টিজ লিমিটেড, শাহ আমানত প্রোপার্টিজ লিমিটেড, এহসান এগ্রো লিমিটেড, আলম অ্যান্ড ব্রাদার্স। এই প্রতিষ্ঠানগুলোও বিভিন্ন ব্যাংকে খেলাপি ঋণের দায়ে অভিযুক্ত। বিভিন্ন সময়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেক সম্পদও নিলামে উঠেছে।

হাজার কোটির খেলাপি ছিদ্দিক ছাতা

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী আবু সাঈদ চৌধুরী সম্রাটের মালিকানাধীন সিদ্দিক ট্রেডার্স বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে মোট ৬৭০ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫৪১ কোটি ২০ লাখ টাকা। এর মধ্যে সিদ্দিক ট্রেডার্সের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান মেসার্স সাঈদ ফুডস লিমিটেডের কাছে ওয়ান ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখারই পাওনা দাঁড়িয়েছে ১৬০ কোটি টাকা। গত বছরের সেপ্টেম্বরে ওয়ান ব্যাংকের আবেদনের প্রেক্ষিতে চট্টগ্রামের অর্থঋণ আদালত আবু সাঈদ চৌধুরী ও তার স্ত্রী সালমা সাঈদ চৌধুরীর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন।

২০১৫ সালের আগ পর্যন্ত ছিদ্দিক ট্রেডার্স ও বিভিন্ন অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের কাছে অগ্রণী ব্যাংক লালদিঘি শাখা ২৫০ কোটি টাকা, ব্র্যাক ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখা ১১৩ কোটি টাকা, যমুনা ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখা ৭২ কোটি টাকা, প্রিমিয়ার ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখা ৬১ কোটি টাকা, সোনালী ব্যাংক লালদিঘি শাখা ৭৬ কোটি টাকা, এনসিসি ব্যাংক আন্দরকিল্লা শাখা ৪৯ কোটি টাকা, প্রাইম ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখা ৪১ কোটিসহ বিভিন্ন ব্যাংক আরও অন্তত অর্ধশত কোটি টাকা পাওনা ছিল। এসব পাওনা সুদাসলে এখন প্রায় দেড়হাজার কোটি টাকারও বেশি দাঁড়িয়েছে।

৬৩০ কোটি নিয়ে এসএম স্টিল

চট্টগ্রামভিত্তিক আরেক প্রতিষ্ঠান এসএম স্টিল রি-রোলিং মিলস লিমিটেড বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে মোট ৮৮৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬৩০ কোটি ২৬ লাখ টাকা।

সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ksrm