চট্টগ্রামে স্কুলের মাঠে আওয়ামী লীগ নেতাদের ‘মেলা’, বাইরে তালা লাগিয়ে ভেতরে চলছে ক্লাস

চট্টগ্রাম নগরীর চান্দগাঁও মোহরা এলাকার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাস চলাকালেই স্কুলের মাঠে বসানো হয়েছে পণ্যের মেলা। স্কুলের আশপাশ ছাড়াও পুরো মাঠজুড়ে দোকানিরা যখন পসরা সাজিয়ে বেচাকেনায় ব্যস্ত, ঠিক তখন স্কুলের ভেতর আরেক দৃশ্য। ক্লাসের ভেতর তালা দিয়ে শিক্ষার্থীদের কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে পাঠদানের বৃথা চেষ্টা করছেন শিক্ষকরা।

জানা গেছে, স্থানীয় শামসুদ্দিন আউলিয়ার মাজারের ওরশকে কেন্দ্র করে বার্ষিক মেলা আয়োজন করা হলেও সেটা মাজারের সীমানা সড়ক ছাপিয়ে পাশ্ববর্তী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও বসানো হয়েছে। স্কুল শিক্ষকদের মতামতের ধার না ধেরেই স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা মেলাটিকে স্কুল মাঠ পর্যন্ত বিস্তৃত করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, সেই সিন্ডিকেটে রয়েছেন খোদ স্কুল কমিটির সভাপতিও।

চট্টগ্রামে স্কুলের মাঠে আওয়ামী লীগ নেতাদের ‘মেলা’, বাইরে তালা লাগিয়ে ভেতরে চলছে ক্লাস 1

স্কুল কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, ক্লাস চলাকালীন স্কুল মাঠে মেলা বসার অনুমতি নাই। আয়োজক কমিটি অনুমোদন না নিয়েই এ মেলার আয়োজন করেছে।

জানা গেছে, কয়েক বছর ধরে চান্দগাঁওয়ের পশ্চিম মোহরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই স্কুলের মাঠে মেলা করে আসছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা। সঙ্গে জড়িত আছেন খোদ স্কুল কমিটির সভাপতিই। ছোট মাঠে শতাধিক লোকের এ আয়োজনের কারণে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের চলাচলও বাধাগ্রস্ত হয়। কার্যত ক্লাসও চলতে পারে না। মেলায় আসা লোকজনের কথাবার্তা ও ডাকাডাকিতে ক্লাসে শিক্ষার্থীদের মনঃসংযোগ নষ্ট হয়। যদিও ওরশ উপলক্ষে এ মেলা স্কুলের আশপাশের সড়কেও বসানো হয়েছে।

Yakub Group

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একজন বলেন, ‘ওরশের মেলা রাস্তায় বা মাজারের আশপাশে করলে আপত্তি নেই। কিন্তু মেলা বসাতে বসাতে স্কুলের ভেতর পর্যন্ত নিয়ে গেছে। এমনকি ক্লাস চলাকালেও মেলা চলছে। এতে বাচ্চাদের পাঠদান ব্যাহত হয়েছে। স্কুল কমিটির সভাপতির ইন্ধনে আওয়ামী লীগের নেতারা এসব করেছেন। শিক্ষকদের পাত্তা দেয়নি তারা।’

এ বিষয়ে পশ্চিম মোহরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুমনা চৌধুরী বলেন, ‘স্কুলের মাঠে মেলা হওয়ার কোনো অনুমতি নেই। স্কুলে ক্লাস চলছিল। কিন্তু এখানে মাজার কমিটি মেলা করছে। এটা প্রতি বছর হয়। আমি আসার পর থেকেই দেখতে পাচ্ছি। মাঝখানে করোনার কারণে দুই বছর হয়নি। মেলাটা দুই-এক দিন হয়। আজকে স্কুল চলাকালে রুম বন্ধ করে বাচ্চাদের ক্লাস নিয়েছি বাধ্য হয়ে।’

এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করা হয়েছে কিনা— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আসলে আমি কোনো অভিযোগ করিনি। যেহেতু এখানে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা জড়িত আছে, তাদেরকে গত বছর বলেছিলাম। তখন তারা বলেছে, এটা কর্মীদের জন্য করতে হয়। তাই আমি আর এই বিষয়ে কোনো কথা বাড়াইনি। তবে আমি এখানে আসার পর ২০১৮ সালের দিকে জেলা প্রশাসক বরাবর একটা অভিযোগ করেছিলাম। তখনকার সভাপতি মেলা কমিটিতে ছিল। এখনকার স্কুল কমিটির সঙ্গে যারা যুক্ত আছে, তারা হয়তো মেলা কমিটির সঙ্গে যুক্ত। আমি আর বেশি কিছু জানি না। যেহেতু একদিনের জন্য মেলা হয়, তাই কিছু বলিনি। দীর্ঘদিন চললে কর্তৃপক্ষের বরাবর অভিযোগ করতাম।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মেলা পরিচালনাকারী জাফর বলেন, ‘প্রতিবছরই মেলা করি। স্কুলের সময় মেলা তো জমে না। রাতে মেলা জমে। আমাদের বড় বড় নেতা, এখানে যারা মাথা আছে সবাইকে জানাইছি। তারা জানে। এই মাজারে একদিনের মেলা। আজকে ওরশ আছে। সেজন্য এই মেলা বসাইছি।’

স্কুল কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছিল কিনা— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, স্কুলের সভাপতি নাজিম চৌধুরী (সাবেক সভাপতি ও মোহরা ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক) থেকে অনুমতি নেয়া হইছে। এখানে তিন গ্রুপের পোলাপান মেলা বসিয়েছে। ওয়ার্ড কমিশনার মামুনকেও বলা হইছে। তার পোলাপান আছে ২০ জনের মতো, জসিম (ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের ‍যুগ্ম আহ্বায়ক) নেতার আছে ২০ জন আবার স্কুলের সভাপতি নাজিম ও বর্তমান সভাপতি নাছিরের আছে ৩০ জনের মতো।’

এদিকে অভিযোগ প্রসঙ্গে পশ্চিম মোহরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদ্যবিদায়ী সভাপতি ও মোহরা ৫নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক নাজিম উদ্দিন চৌধুরী চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘মেলার জন্য সিটিএসবির কাছে আবেদন করেছিলাম। তারা বলেছে, প্রতিবছরই আপনারা মেলা করেন। এখানে তো কোনো সমস্যা নেই। স্কুলের সময়ে স্কুল চলছে। তাই এলাকাবাসীর সম্মতিতে মেলা বসেছে একদিনের জন্য। আগামীকাল সকালেই তারা (মেলার স্টল) চলে যাবে।’

মেলায় কাউন্সিলরের অনুসারী থাকা প্রসঙ্গে ৫ নং মোহরা ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ কাজী নুরুল আমিন মামুন বলেন, ‘আমার ছেলেপেলে বলতে কোনো শব্দ নাই। পুরো মোহরাই আমার ছেলে পেলে রয়েছে। আমার কাছে এই ধরনের কোনো অনুমতি নেয়নি কেউ। আর এরকম কোনো অনুমতি আমি দেইও না।’

একই বিষয়ে চান্দগাঁও থানা শিক্ষা অফিসার ইশরাত জাহান বলেন, ‘এই বিষয়ে আমি জানি না। আর স্কুল যেহেতু সামাজিক প্রতিষ্ঠান, স্কুলে শুক্র-শনি যদি মেলা হয় সেটা তো হতে পারে। এলাকার একটা ডিমান্ড থাকে। এখন ওই ব্যাপারে আমি জানি না।’

স্কুল চলাকালীন সময়ে মেলা হতে পারে কিনা— এমন প্রশ্নের জবাবে এ কর্মকর্তা বলেন, ‘স্কুল চলাকালীন সময়ে মেলা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. শহিদুল ইসলাম চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। শিক্ষা অফিসারকে বলে দিয়েছি এমন কিছু হয়ে থাকলে তাদেরকে মাঠ থেকে তুলে দিতে।’

আরএম/সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ksrm