চট্টগ্রামে ‘সন্দেহজনক হামের’ রোগী বাড়ছে, ১৩ দিনে হয়নি নমুনা পরীক্ষা
আতঙ্ক বাড়াচ্ছে হাম-পরবর্তী নিউমোনিয়া
চট্টগ্রামে নীরবে বাড়ছে হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। গত তিন মাসে ৫৬০ জন রোগীর দেহে শনাক্ত হয়েছে এই ভাইরাস। এর মধ্যে জুলাই মাসে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি ছিল। চলতি বছরে হাম সন্দেহে চিকিৎসা নিয়েছেন ৭ হাজার ৩৪ জন। এসব রোগীর মধ্যে বেশিরভাগই মহানগরের বাসিন্দা। তবে হামের সঙ্গে নতুন আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে নিউমোনিয়া। হামে আক্রান্ত শিশুদের শতকরা ৫ শতাংশ নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে দ্রুত সংকটাপন্ন হয়ে পড়ছে। অনেক শিশুকে শেষ পর্যন্ত নিতে হচ্ছে পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (পিআইসিইউ)।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ড ৮ ও ৯ এবং হামের জন্য নির্ধারিত স্পেসিফিক ওয়ার্ড-১-এ বর্তমানে ১৬১ জন সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ৮ নম্বর ওয়ার্ডে ২৪ জন, ৯ নম্বর ওয়ার্ডে ২৬ জন এবং হামের নির্দিষ্ট ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছে ১১১ জন।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সকালে শিশু ওয়ার্ড ৮ ও ৯ ঘুরে দেখা গেছে, দুই ওয়ার্ডে মোট ৪৪১ জন শিশু রোগী চিকিৎসাধীন। এর মধ্যে ৮ নম্বর ওয়ার্ডে ২৪০ জন এবং ৯ নম্বর ওয়ার্ডে ২০১ জন। অতিরিক্ত রোগীর চাপে শিশু ওয়ার্ডগুলোতে তৈরি হয়েছে ঠাসাঠাসি পরিস্থিতি।
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে পাঠানো প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম মহানগর ও বিভিন্ন উপজেলা থেকে সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত ৫৭ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকেও এসব শিশু চিকিৎসা নিচ্ছে।
তথ্য অনুযায়ী, চলতি সময়ে চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলার সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছে ২৯৬ জন। এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হামে মারা গেছে ১২ জন। তবে হামে শনাক্তের পর মারা গেছেন ৩ জন।
গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম মেডিকেলের শিশু ওয়ার্ডে সন্দেহজনক হামের রোগী ভর্তি হয়েছে ২৮ জন। জেনারেল হাসপাতালে ১০ জন, মা ও শিশু হাসপাতালে ৫ জন। আর বিআইটিআইডিতে ভর্তি হয়েছে ১৩ জন।
তিন মাসে ৫৬০ জন আক্রান্ত
গত তিন মাসে ৫৬০ জন রোগীর দেহে হাম শনাক্ত হয়েছে। সিভিল সার্জন কার্যালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৩০ জুন পর্যন্ত হামের রোগী চিকিৎসা নিয়েছে মহানগরে ৩ হাজার ৬২১ জন। ১৫ উপজেলায় ১৪৪ জন। মোট ৩ হাজার ৭৬৫ জন। শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ৩৩১ জন, যাদের ২৭৬ জন নগরের ও ৫৫ জন উপজেলার বাসিন্দা। যেখানে ৩১ মে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৫৬ জন।
৩১ জুলাই পর্যন্ত হামের রোগী চিকিৎসা নিয়েছে ৫ হাজার ২৯০ জন। এর মধ্যে মহানগরে ৫ হাজার ৬৬ জন, ১৫ উপজেলায় ২২৪ জন। শনাক্ত রোগী ছিল ৫৭৫ জন। যা গত মাসের চেয়ে ২৪৪ জন বেশি। আক্রান্তদের মধ্যে মহানগরের ৩৯৮ জন, উপজেলার ১৭৭ জন।
৩১ আগস্ট পর্যন্ত রোগী চিকিৎসা নিয়েছে ৬ হাজার ৯৭৭ জন। আক্রান্তদের মধ্যে মহানগরে ৬ হাজার ৬৪৩ জন আর ১৫ উপজেলায় ৩৩৪ জন। এর মধ্যে পজিটিভ রোগীর সংখ্যা ছিল ৭১৬ জন। এর মধ্যে মহানগরে ৪৭২ জন। উপজেলায় ২৪৪ জন। এ মাসে ১৪১ জনের শরীরে হাম ধরা পড়ে।
১৩ দিনে হয়নি কোনো নমুনা পরীক্ষা
চট্টগ্রামে প্রায় প্রতিদিনই হাম সন্দেহে হাসপাতালে রোগী ভর্তি হলেও পরীক্ষা নিয়মিত হচ্ছে না। মূলত এখানে কোনো ধরনের পরীক্ষার ল্যাব না থাকায় নমুন পরীক্ষায় এমন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
চলতি মাসের ১৯ আগস্ট সর্বশেষ নমুনা পরীক্ষা করা হয় ২৩ জনের। সেই হিসেবে নমুনা পরীক্ষা মোট রোগীর সংখ্যা ১৯৮০ জন। এর আগে ১৮ আগস্ট ৩৫ জন, ১৬ আগস্ট ৩০ জন রোগী নমুনা পরীক্ষা করা হয়।
বড় আতঙ্ক নিউমোনিয়া
চট্টগ্রাম মেডিকেলের শিশু ওয়ার্ডগুলোতে হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যেই চিকিৎসকদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে নিউমোনিয়ার জটিলতা। বিশেষজ্ঞদের মতে, হামে আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ৫ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে নিউমোনিয়া দেখা দিতে পারে। হামের কারণে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়লে ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। তখন নিউমোনিয়া দ্রুত মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে।
বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা, কম ওজন নিয়ে জন্ম নেওয়া এবং দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার শিশুদের ঝুঁকি বেশি। নিউমোনিয়ার পাশাপাশি ডায়রিয়া, বমি ও মারাত্মক পানিশূন্যতা দেখা দিলে শিশুর শারীরিক অবস্থা আরও দ্রুত অবনতি ঘটতে পারে। দেরিতে হাসপাতালে আসার কারণেও অনেক ক্ষেত্রে জটিলতা বাড়ছে।
চট্টগ্রামের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. বাসনা মহুরী বলেন, ‘হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ হলেও আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ৯৫ শতাংশই সাত থেকে ১০ দিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে যায়। তবে একটি অংশের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া কিংবা ব্রেইন ইনফেকশনের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘মূল বিপদ ওই ৫ শতাংশকে ঘিরে; যাদের নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া বা ব্রেইন ইনফেকশনের মতো জটিলতা তৈরি হয়। হামের কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং নিউমোনিয়ার ঝুঁকি আরও বাড়ে।’
তার মতে, হামজনিত মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ শ্বাসতন্ত্র বিকল হয়ে পড়া। নিউমোনিয়া শুধু ফুসফুসেই সীমাবদ্ধ থাকে না; গুরুতর সংক্রমণের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কসহ শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গেও জটিলতা তৈরি হতে পারে।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় প্রভাব
বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা বলছেন, অপুষ্টি, দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং দেরিতে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা শিশুদের হামের জটিলতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। অনেক শিশু জন্মের সময় কম ওজন নিয়ে জন্মায় বা পর্যাপ্ত মাতৃদুগ্ধ না পাওয়ায় তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল থাকে।
যখন একটি শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয় চিকিৎসায় তাকে রুটিনমাফিক অ্যান্টিবায়োটিক কোর্স করতে হয়। পরবর্তীতে সেই বাচ্চা হামে আক্রান্ত হয় তখন ওষুধের ধকল আর নিতে পারে না। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে না।
ঋতু পরিবর্তনে সংক্রমণের ঝুঁকি
সাধারণত আশ্বিন ও কার্তিক মাসে—অর্থাৎ অক্টোবর ও নভেম্বরে আবহাওয়ার দ্রুত পরিবর্তনের কারণে শিশুদের বিভিন্ন ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের ঝুঁকি বাড়ে। দিনে গরম ও রাতে তুলনামূলক ঠাণ্ডা আবহাওয়ার কারণে শিশুদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়।
ফলে সামনে সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. মোহাম্মদ মুছা চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘শিশু রোগীতে ঠাসা ওয়ার্ড। হঠাৎ করে আবারও সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। নিউমোনিয়া রোগীতে ওয়ার্ডে জায়গা সংকুলান হচ্ছে না। নিউমোনিয়া থেকে পরবর্তীতে হামে আক্রান্ত রোগীকে রিকভারি করা কঠিন হয়ে পড়ছে। পিআইসিউতে রোগী ট্রান্সফার করতে হচ্ছে। কিন্তু সেখানে সিট নির্ধারিত। আসলে পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হয়ে পড়ছে।
ডিজে




