চট্টগ্রামে সকালের উকিল বিকেলেই আসামি হয়ে কারাগারে, ধর্ষণের অভিযোগ

বিয়ের প্রলোভনে নারী আইনজীবীকে ধর্ষণ

বিয়ের প্রলোভনে শিক্ষানবিশ নারী আইনজীবীকে ধর্ষণের ঘটনায় আরেক আইনজীবী পল্টন দাশকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত।

রোববার (৫ মার্চ) চট্টগ্রাম চতুর্থ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কাজী শরিফুল ইসলামের আদালত এই আদেশ দেন।

এর আগে মামলা তদন্ত শেষে গত ২০ ফেব্রুয়ারি কোতোয়ালী থানার এসআই মেহেদী হাসান আদালতের প্রসিকিউশন শাখায় চার্জশিট প্রদান করেছেন। এতে পল্টন দাশকে অভিযুক্ত করে সাতজনকে সাক্ষী করা হয়েছে। রোববার চার্জশিট গ্রহণ বিষয়ে শুনানির দিন ধার্য ছিল।

বাদিপক্ষের আইনজীবী শাহিন সুলতানা হীরা জানান, বিয়ের প্রলোভনে শিক্ষানবিশ নারী আইনজীবীকে ধর্ষণের ঘটনায় আদালতে চার্জশিট বিষয়ে শুনানির দিন ধার্য ছিল। এতে আসামির পক্ষে জামিন আবেদন করা হয়। কিন্তু আদালত তা নামঞ্জুর করে পল্টন দাশকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। একইসঙ্গে মামলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ এ স্থানান্তরিত করেছেন।

শুনানিতে সহায়তা করেছেন, ব্লাস্ট চট্টগ্রামের কো অর্ডিনেটর রেজাউল করিম চৌধুরী রেজা, আইনজীবী মানিক দত্ত, অর্পিতা দত্ত ও নিতাই ঘোষ।

আদালতে দেখা গেছে, সকালে আইনজীবীর পোশাক পড়ে পল্টন দাশ আদালতে হাজির হন। এরপর শুনানি শেষে আদালতের নির্দেশে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

এদিকে মামলার অভিযোগ থেকে জানা গেছে, ২০১৭ সালে চট্টগ্রাম আইন কলেজে প্রথমবর্ষে অধ্যয়নরত অবস্থায় অভিযুক্ত পল্টন দাশের সঙ্গে ওই নারীর পরিচয় হয়। পারিবারিক জমি-জমা সংক্রান্ত বিষয়ে পরামর্শ নিতে ওই নারী পল্টনের কাছে যেতেন। এর সুবাদে তাদের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে তা প্রেমে গড়ায়।

পরে বিয়ে করার প্রতিশ্রুতিতে তারা শারীরিক সম্পর্কে যান। ২০২০ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২১ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত চট্টগ্রাম আদালতের দোয়েল ভবনের সপ্তম তলার ৭১৮ নম্বর কক্ষসহ নগরীর বিভিন্ন হোটেলে তাদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক হয়।

এর ফলে ওই নারী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। বিষয়টি পল্টনকে জানালে তিনি গর্ভপাত করতে বলেন। এমনকি বিষয়টি ধামাচাপা দিতে ওই নারীকে টাকা দেওয়ার প্রস্তাবও করা হয়।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে ভুক্তভোগী নারী বলেন, ‘আমার অন্তঃসত্ত্বার বিষয়টি পল্টনকে জানালে সে আজ না হয় কাল, কাল নয় নয়তো পরশু মন্দিরে নিয়ে গিয়ে বিয়ের কথা বলেন। কিন্তু তিনি রীতিমতো কালক্ষেপণ করতে থাকেন। এদিকে গর্বের সন্তান বড় হওয়ায় সামাজিকভাবে বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছিল। ৬ মাসের অন্তঃসত্ত্বা থাকা অবস্থায় এই বিষয়ে তার পরিবারকে জানাই। কিন্তু তারা এই বিষয়ে কোনো সমাধান দিতে পারেননি। পল্টনের বাবা মামলা করতে বলেন।’

তিনি বলেন, ‘এছাড়া ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা থাকার সময় চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতিতেও পল্টনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করি। তারাও সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। উল্টো সিনিয়র নেতৃবৃন্দের কয়েকজন ভিন্ন কৌশলে কুপ্রস্তাব দিয়েছেন।’

ওই নারী বলেন, ‘বিষয়টি ধামাচাপা দিতে আমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন জায়গায় অপপ্রচার চালিয়েছিলেন পল্টনের মামাতো ভাই প্রকৃতি চৌধুরী ছোটন। একটি অনলাইন পত্রিকায় আমার বিরুদ্ধে ভুয়া সংবাদও প্রচার করেন। চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির গ্রুপেও আমাকে খারাপভাবে উপস্থাপন করেন। প্রকৃতি চৌধুরী ছোটন আমাকে ফোন করে জানতে চেয়েছিলেন—কত টাকা পেলে আমি এই সন্তান নষ্ট করে দেবো? এছাড়া তাদের বন্ধু বিজয় কৃষ্ণ ঘোষ ও সাবেকুন নাহার তারিনও আমার বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার করেছেন।’

ওই নারী আরও বলেন, ‘পল্টন হুমকি দিয়ে বলত, সে আইনজীবী। তার বাবাও আইনজীবী। তাকে কেউ কিছু করতে পারবে না। তাদের এমন ভয়-ভীতি ও হুমকির কারণে আইনি ব্যবস্থার সিদ্ধান্ত নিই। এছাড়া আমাদের অন্তরঙ্গ মুহূর্তে তোলা কিছু ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেয় পল্টন। পরে ২০২১ সালের ৬ জুন নগরের কোতোয়ালী থানায় পল্টনের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করি। এই মামলায় ১০ জুন বিকালে তাকে গ্রেপ্তার করে থানা পুলিশ। ১১ জুন পল্টনকে কারাগারে পাঠানো হয়। এর মধ্যে ডিএনএ টেস্ট করে রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত পল্টনকে জামিন দিয়েছেন আদালত। গ্রেপ্তারের ১৩ দিন পর ২৩ জুন তিনি জামিনে মুক্তি পান।’

চার্জশিট থেকে জানা গেছে, ৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা থাকায় ওই নারীর ডিএনএ টেস্ট করা সম্ভব হয়নি। ডিএনএ টেস্ট করলে মা ও সন্তান উভয়ের ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান চিকিৎসক।

পরে গর্ভজাত সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর আড়াই মাস বয়সে তার ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়। এই ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী পল্টন দাশ শিশুটির জৈবিক পিতা বলে জানা গেছে।

আরএস/ডিজে

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!