বিদেশির চোখে/ চট্টগ্রামে শেষ লড়াই— ৭ ডিসেম্বর ১৯৭১

জাপানের নাগরিক তাদামাসা হুকিউরা ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে পরবর্তী আট মাস আন্তর্জাতিক রেডক্রসের প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশে অবস্থানকালে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন। সেসবের স্মৃতিচারণা নিয়ে তিনি একটি বই লিখেছেন ‘চি-তো দোরো-তো’ নামে। জাপানি ভাষায় লেখা বইটির বাংলা অনুবাদ করেছেন কাজুহিরো ওয়াতানাবে। ‘রক্ত ও কাদা ১৯৭১’ নামের সেই বইটি ২০১২ সালে প্রকাশিত হয় ‘প্রথমা’ থেকে।

চট্টগ্রামে অদ্ভুত রকমের নীরবতা বিরাজ করছিল। মেজর থাপারের বাহিনী চট্টগ্রামে প্রবেশ করেছে। পরিস্থিতি জানতে তাদের সঙ্গে আমিও এই বন্দরনগরে যাই। শহরটিতে কোনো উত্তেজনা নেই। সব চুপচাপ, যেন একেবারে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। প্রায় সব দোকানের দরজা বন্ধ। বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাও চোখে পড়েনি। কোনো কোনো দোকানে এখনো প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের ছবি টাঙানো আছে।

ঢাকার পতনের পরও চট্টগ্রামে পাকিস্তানি সেনাদের প্রতিরোধ থামেনি। আগের রাতে বরং তা তীব্র আকার ধারণ করেছিল। তবে আজ সকালে পাকিস্তানি সেনাদের কাছ থেকে দূত এসে জানায় যে চট্টগ্রামে মোতায়েন পাকিস্তানি বাহিনী ভারতীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করবে। কেবল ভারতীয় বাহিনী নয়, এই আত্মসমর্পণ ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ হিসেবে গণ্য করা হবে, এই শর্তে ভারতীয় পক্ষ সেই প্রস্তাবে সম্মত হয়েছে।
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের পর চট্টগ্রামে প্রথমে প্রবেশ করে মেজর খালেদ মোশাররফ ও ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন মুক্তিবাহিনী। তারপর পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের আরেকটি দল পৌঁছায়। এরপর ভারতীয় বাহিনীর আগমন হলো। শহরের কেন্দ্রভাগে গিয়ে নাগরিকদের আনন্দে মেতে উঠতে দেখলাম। তারা আমাদের ফুলের মালা ও মিষ্টি দিল। কেউ কেউ মেজর থাপার, এমনকি আমাকে ও জাঁ পিয়েরকে পর্যন্ত কাঁধে তুলে নাচতে লাগল।

ভারতীয় সেনাদের বিদায় জানিয়ে আমরা আগ্রাবাদ হোটেলে যাই। আমাদের দুজন সহকর্মী পশ্চিম জার্মানির কোখ ও অস্ট্রিয়ার ইয়ানৎস হোটেলে থাকে। হোটেল ঘিরে রেখেছিলেন মুক্তিবাহিনীর প্রায় এক হাজার সদস্য। তাঁদের কমান্ডারের সঙ্গে দেখা করতে চাইলে এখন হোটেলের ভেতরে রেডক্রসের মধ্যস্থতায় পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের বিষয়ে আলোচনা করছেন বলে জবাব এল। হোটেলের ভেতরে এক হাজারের বেশি পাকিস্তানি সেনা আশ্রয় নিয়েছে বলে জানানো হয়।

সদর দরজার পাশে স্তূপীকৃত বালুর বস্তা। তা পেরিয়ে লবিতে পৌঁছালাম। সেখানে খাটো একজন বাঙালি দীর্ঘকায় কোখের সঙ্গে জোরে জোরে কথা বলছিল। মুক্তিবাহিনী চায়, হোটেলে আশ্রয় নেওয়া পাকিস্তানি সেনাদের অস্ত্রমুক্ত করার পর দুপুরে তাদের গণ-আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হোক। কোখ মুখ লাল করে দাবি করছেন, মুক্তিবাহিনী যেন জেনেভা চুক্তি মেনে চলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে একটা চিঠি লেখে। মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে বন্দীদের

ন্যস্ত করা হলে তাদের ভাগ্যে কী ঘটবে, সেই দুশ্চিন্তা থেকে কোখ বন্দীদের ভারতীয় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে রাখতে চাইছেন। নানা অজুহাত দেখিয়ে ভারতীয় সেনারা এখানে না পৌঁছানো পর্যন্ত তিনি কালক্ষেপণের চেষ্টা করছিলেন। সে সময় ইয়ানৎস এল লবিতে। আমি তার কানে ফিসফিস করে বললাম, জার্মান ভাষায় কোখকে জানাও, জাঁ পিয়ের ভারতীয় বাহিনীকে ডাকতে গেছে। আরও আধা ঘণ্টা মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে কথাবার্তা চালাতে হবে।
এরপর আমিও কোখদের আলোচনায় যোগ দিলাম।

Yakub Group

মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ছাত্র। তিনি জেনেভা চুক্তি সম্পর্কে কিছুই জানেন না। রেডক্রসের প্রতিনিধির দাবি শুনে তিনি বিরক্ত ও বিচলিত বোধ করছেন। পাকিস্তানি পক্ষ নাকি বলছে, মুক্তিবাহিনী যদি তাদের অস্ত্রমুক্ত করতে চায়, তবে তারা হোটেলের বিদেশি অতিথিদের জিম্মি করে শেষ পর্যন্ত লড়াই করতে প্রস্তুত।

পরবর্তী ৩০ মিনিট খুব লম্বা সময় বলে মনে হলো। শেষ পর্যন্ত জাঁ পিয়েরের সঙ্গে মেজর থাপারকে দেখে মনে মনে উৎফুল্ল হলাম। ভারতীয় বাহিনীর ৩০টি ট্রাক এসে পৌঁছাল হোটেলের সামনে। এখানে আসার পথে জাঁ পিয়ের ও থাপার পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের প্রস্তাব তৈরি করে এনেছেন। প্রস্তাবটি হলো এ রকম: পাকিস্তানি বাহিনী আন্তর্জাতিক রেডক্রসের কর্মীদের উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও ভারতের মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করবে। মুক্তিবাহিনী তাদের অস্ত্রমুক্ত করার পর ভারতীয় বাহিনী তাদের বন্দিশিবিরে আটক এবং তাদের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নেবে। এ প্রস্তাবে সবাই সম্মত হলো।

রাজাকার ও পাঞ্জাবি সেনা মিলিয়ে মোট ৭৫১ জনকে বন্দী করা হয়। একটি হোটেলে এত লোক কীভাবে গা-ঢাকা দিয়ে ছিল, ভেবে অবাক হলাম।
চট্টগ্রামের লড়াই এভাবে শেষ হয়েছে।

সারা দেশ মুক্ত ও শান্তিপূর্ণ। আশা করলাম, দেশের স্বাধীনতার জন্য যেসব যুবক বন্দুক হাতে যুদ্ধে নিজেদের উৎসর্গ করেছিল, তারা যেন সদ্যপ্রাপ্ত বিজয়ে দীর্ঘদিন মেতে না থেকে দেশের পুনর্গঠন ও উন্নয়নের লক্ষ্যে নতুন সংগ্রামে শরিক হয়।

সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ksrm