চট্টগ্রামে শীর্ষ সন্ত্রাসী আট খুনের আসামি সঙ্গে নিয়ে বিএনপি প্রার্থীর প্রচারণা

পুলিশের খাতায় পলাতক, মঞ্চে প্রচারে রায়হান

চট্টগ্রামের সন্ত্রাস-উপদ্রুত রাউজানের রাজনীতিতে ভোটের উত্তাপ ছড়ানোর কথা। সেখানে এখন আতঙ্ক ছড়াচ্ছে গুলির ছায়া। আটটি হত্যাসহ ১৫ মামলার আসামি, পুলিশের খাতায় পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী মোহাম্মদ রায়হান আলম প্রকাশ্যে নিজের গ্যাং নিয়ে চট্টগ্রামের রাউজানে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী, বিএনপির পদস্থগিত ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় নেমেছেন। যাকে গ্রেপ্তারে পুলিশ দীর্ঘদিন ধরে অভিযান চালাচ্ছে, সেই রায়হানই এখন এলাকায় মিছিল, সমাবেশ আর মোটরসাইকেল শোডাউন করে ভোটের মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন।

সর্বশেষ শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে পূর্ব রাউজানের রশিদের পাড়ায় গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পক্ষে এক নির্বাচনী সমাবেশের আয়োজন করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মোটরসাইকেলের বহর নিয়ে সেখানে হাজির হন রায়হান। তার নিয়ন্ত্রণে থাকা কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা এ সময় স্লোগান দেন, ‘রায়হান ভাই, তালে তালে, রায়হান ভাই, আবার বলো।’ তাদের গায়ে ছিল একই ধরনের সাদা গেঞ্জি। সামনে লেখা ‘রায়হান এক্সপ্রেস’, পেছনে বিএনপি প্রার্থীর ছবির নিচে লেখা ছিল ‘সৌজন্যে মোহাম্মদ রায়হান আলম’।

সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন বিলুপ্ত উত্তর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এমএ হালিম। সেখানে মঞ্চে ওঠে রায়হানের দুই সহযোগী বক্তব্যে বলেন, ‘রায়হান আছে বলেই রাউজান শান্ত আছে। রায়হানকে সেইভ করতে হলে ধানের শীষে ভোট দিয়ে বিএনপি প্রার্থীকে জিতিয়ে আনতে হবে।’

সেদিন সন্ধ্যায় রায়হান নিজের ফেসবুক আইডি ‘রায়হান আলম’ থেকে সমাবেশের দুটি ভিডিও যুক্ত করে পোস্ট দেন। সেখানে তিনি লেখেন, ‘এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা ও স্বাগতম জানাচ্ছি। ১২ তারিখ সারাদিন ধানের শীষে ভোট দিতে হবে।’ স্থানীয় সূত্র জানায়, নির্বাচনের আগে প্রতিদিনই মোটরসাইকেল নিয়ে মহড়া দিচ্ছেন রায়হান। এতে পুরো এলাকায় ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে সমাবেশে উপস্থিত থাকা গিয়াসউদ্দিন কাদেরকে ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। অন্যদিকে বিএনপি নেতা এমএ হালিম পুরো বিষয়টা জেনে ‘নামাজে আছেন’ বলে জানান। পরে ফোন করা হলেও তিনি আর ধরেননি। এদিকে অভিযুক্ত রায়হানের ফেসবুক মেসেঞ্জারে বার্তা পাঠানো হলেও তার কোনো সাড়া মেলেনি।

এর আগেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুমকি দিয়েছেন রায়হান। গত ২৩ জানুয়ারি এক পোস্টে তিনি ‘১২ তারিখ সারাদিন ধানের শীষে ভোট’ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে লিখেছিলেন, ‘রাউজান ৭ নং সদর ইউনিয়নে এমন ও ব্যক্তির সন্ধান পাচ্ছি ,তারা দিন হলে ধানের শীষের জন্য ভোট খুজে আবার রাত ১২ টার পরে মোমবাতি জন্য লোকজন কালেকশন করে,ওই সমস্ত লোকদের সাবধান করে বলতে চাই এখনো সময় আছে ভালো হয়ে যাও।’ এলাকাবাসীর মতে, এটি ছিল প্রকাশ্য হুমকি।

ফেসবুকেও দিচ্ছেন প্রকাশ্য হুমকি

পুলিশের খাতায় মোহাম্মদ রায়হান শীর্ষ অপরাধী। তার বিরুদ্ধে আটটি হত্যা মামলাসহ মোট ১৫টি মামলা রয়েছে। তিনি রাউজান থানার ওসি ও কয়েকজন ব্যবসায়ীকে হত্যার হুমকিও দিয়েছেন। ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি থেকে গত বছরের ৫ থেকে ১৩ নভেম্বরের মধ্যে বিভিন্ন ব্যক্তিকে ‘ভয়ংকর মৃত্যু’, ‘খেলা শুরু’ ধরনের ভাষায় হত্যার হুমকি দেন।

গত বছরের ১৩ নভেম্বর আজিজ নামের এক ব্যক্তিকে উদ্দেশ করে রায়হান লেখেন, তার মৃত্যু হবে সবচেয়ে ভয়ংকর। আরেক পোস্টে তিনি দাবি করেন, তাকে হত্যার জন্য ২০ লাখ টাকা বাজেট করা হয়েছে। পাল্টা তিনি ৩০ লাখ দেওয়ার ঘোষণা দেন।

সর্বশেষ গত বছরের ১৪ নভেম্বর রাতে চট্টগ্রামের পাথর ব্যবসায়ী মো. একরামকে মুঠোফোনে হত্যার হুমকি দেন রায়হান। পরে হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় ব্লেড দিয়ে খুঁচিয়ে মারার কথা জানান। একরাম বলেন, ঢাকার একটি শপিং মলে শীর্ষ সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদকে ধরে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার পর থেকেই সাজ্জাদের পক্ষ হয়ে রায়হান তাকে হুমকি দিচ্ছেন।

রায়হানের অপরাধের যৎসামান্য

মোহাম্মদ রায়হান রাউজান উপজেলার ৭ নম্বর ইউনিয়নের জুরুরকুল খলিফা বাড়ির মৃত বদিউল আলমের ছেলে। তিনি চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী। একসময় চোলাই মদ বিক্রি ও পরে সিএনজি অটোরিকশা চালাতেন রায়হান। হত্যাচেষ্টার মামলায় কারাগারে গিয়ে ছোট সাজ্জাদের সঙ্গে পরিচয়ের পরই তিনি বেপরোয়া হয়ে ওঠেন।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রাম নগর ও জেলায় জোড়া খুনসহ তার বিরুদ্ধে ১৩টি নতুন মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি হত্যা মামলা। রাউজানে যুবদল কর্মী মো. আলমগীর ওরফে আলম, কদলপুর ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্যসচিব মো. সেলিম, রাউজান ইউনিয়নের যুবদল কর্মী মোহাম্মদ ইব্রাহিম, নগরের বাকলিয়া এক্সেস রোডে প্রাইভেটকারে থাকা মো. বখতিয়ার হোসেন ওরফে মানিক এবং আব্দুল্লাহ আল রিফাতকে গুলি করে হত্যায় তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যাকাণ্ডেও রায়হানের নাম উঠে এসেছে।

গত বছরের ২৫ অক্টোবর রাউজান পৌরসভার চারাবটতল এলাকায় যুবদল কর্মী মো. আলমগীরকে গুলি করে হত্যার ঘটনাতেও রায়হানের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পেয়েছে পুলিশ। নিহতের ছেলে মো. আশফায়েত হাসেন বলেন, তার বাবাকে হত্যায় সরাসরি রায়হান গুলি করেছে। নিহতের স্ত্রী লাভলী আকতার বলেন, চোখের সামনে স্বামীকে গুলি করে হত্যা করেছে রায়হান ও তার সহযোগীরা।

রাজনীতির ছায়ায় সন্ত্রাস

স্থানীয় সূত্র জানায়, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রায়হান দলটির বিভিন্ন মিছিল ও সমাবেশে অংশ নিতেন। তার মামা ইখতিয়ার উদ্দীন রাউজান সদর ইউনিয়ন ৪ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক এবং সাবেক এমপি ফজলে করিমের বিশেষ বিবেচনায় ‘সিলেক্টেড’ ইউপি সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। মামার সঙ্গে মিলে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন রায়হান।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর রায়হান বিএনপির সভা-সমাবেশে যুক্ত হন। সেই থেকে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পৃষ্ঠপোষকতায় রাউজান ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় তার দাপট আরও বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এলাকাবাসীর প্রশ্ন, আটটি হত্যা মামলার আসামি, পুলিশের খাতায় পলাতক একজন সন্ত্রাসী কীভাবে প্রকাশ্যে গ্যাং নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালান। নির্বাচন সামনে রেখে রাউজানে রাজনীতির মাঠে এখন আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠাই বড় হয়ে উঠছে।

সিপি

ksrm