চট্টগ্রামে শিশু নিখোঁজের ঘটনার পেছনে অন্য ঘটনা, তবে সবই ‘গুজব’ নয়

চট্টগ্রাম নগরীর বহদ্দারহাটের বাসা থেকে ৩ জুলাই নিখোঁজ হন মো. মিনহাজ। এ ঘটনায় ওইদিনই পরিবারের পক্ষ থেকে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয় চান্দগাঁও থানায়। তাকে খুঁজে পেতে ফেসবুকের কয়েকটি গ্রুপে হারানো বিজ্ঞপ্তিও দেওয়া হয়। কিন্তু সেই মিনহাজকে পাওয়া গেছে পতেঙ্গার বিয়েবাড়িতে। তাকে খুঁজে পেতে পৃথিবীর সমস্ত দুশ্চিন্তা যখন পরিবারের মাথায় তখন মিনহাজ নাচছিল বিয়ের অনুষ্ঠানে।

ফেসবুকে মিনহাজের ভাইয়ের পোস্ট দেখে বিয়েবাড়ি থেকে পতেঙ্গার এক যুবক যোগাযোগ করেন। এরপর ৫ জুলাই তাকে নিয়ে আসা হয় ঘরে।

বহাদ্দারহাট থেকে কিভাবে পতেঙ্গা গেলেন—জানতে চাইলে নিখোঁজ মিনহাজের বড় ভাই ইসমাইল বলেন, ‘সে (মিনহাজ) চুল কাটতে সেলুনে যায়। পরে দোকানদার টাকা চাইলে ঘর থেকে এনে দিবে বলে রাস্তায় হাঁটতে থাকে। যদিও সে মানসিকভাবে অসুস্থ। পরে কিভাবে সে পতেঙ্গা গিয়েছে, সে বিষয়ে আর কিছু জানাতে পারেনি।’

চট্টগ্রামভিত্তিক ফেসবুক গ্রুপগুলোতে প্রতিদিনই এমন হারানো বিজ্ঞপ্তির দেখা মিলছে। এদের মধ্যে বেশিরভাগই ১৮ বছরের নিচে। এসব বিজ্ঞপ্তি শেয়ারও হচ্ছে বেশি। তবে নিখোঁজ বেশিরভাগ শিশু-কিশোর পাওয়া গেলেও সেগুলো কোনো পোস্ট বা আপডেট আর দিচ্ছেন না স্বজনরা। ফলে নিখোঁজের এসব ঘটনা নিয়ে ধোঁয়াশা থেকে যাচ্ছে। একইসঙ্গে এসব নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি দেখে জনমনে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে।

৪৮ ঘণ্টায় ৩৫ শিশু নির্খোঁজ—চট্টগ্রামে গত দুদিনে এমন ফেসবুক পোস্ট চাউর হয়েছে। তবে এ খবর যে গুজব, তা জানিয়ে পুলিশ বিবৃতিও দিয়েছে। এমন ঘটনার শিকার অন্তত অর্ধডজন পরিবার ফেসবুকে নিখোঁজের বিজ্ঞপ্তি দিলেও দেয়নি ফিরে পাওয়ার সংবাদ। নিখোঁজের শিকার শিশু-কিশোরদের বেশ কয়েকটি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা হলে জানা গেছে ভিন্ন তথ্য।

সবই ‘গুজব’ নয়

অন্য ঘটনার বিপরীতে আবার সত্যিকারের ‘নিখোঁজ সংবাদ’ও মিলেছে। হাটহাজারীর ছিপাতলীর জমিয়াতুল মদিনা মাদ্রাসার শিক্ষার্থী বাকলিয়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ সাকিব গত ১ মে হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যায়। দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে ১২ বছর বয়সী ওই ছাত্রের খোঁজ না মেলায় তার মা এখন পাগলপ্রায়। বিভিন্ন সূত্রে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এলাকার বিভিন্ন হেফজখানা থেকে মাঝেমধ্যে শিক্ষার্থী উধাও হয়ে যাওয়ার খবর মিলছে। এর পেছনে সংঘবদ্ধ অপহরণকারী চক্র সক্রিয় থাকতে পারে বলে অনেকের ধারণা। এর আগে সাতকানিয়ার কাঞ্চনা থেকে এক মাদ্রাসাশিক্ষার্থীকে র‍‍্যাব চট্টগ্রামের একটি দল অভিযান চালিয়ে নারায়ণগঞ্জ থেকে উদ্ধার করেছিল। অপহরণের পর থেকে ওই শিক্ষার্থীকে পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল বলে জিজ্ঞাসাবাদে র‍‍্যাব জানতে পারে।

‘শখ করেই’ ঢাকায় ঘুরতে যায় স্কুলছাত্র তাহিন

নগরীর হালিশহর ‘কে’ ব্লক থেকে ৪ জুলাই কোচিংয়ে যাওয়ার কথা বলে ঘর থেকে বের হয় রাহিনুল ইসলাম তাহিন (১৬)। কিন্তু কোচিংয়ে না গিয়ে রিকশায় ঘুরতে মন চায় তাহিনের। এরপর সে হালিশহরের ওয়াপদা মোড় থেকে ৮০ টাকায় রিকশা ভাড়া করে এ কে খান মোড়ে যায়। সেখানে যাওয়ার পর তাহিনের মন চায় ঢাকা ঘুরতে। সেজন্য সে সেন্টমার্টিন পরিবহনের একটি বাসের টিকিট করে ঢাকায় গিয়ে আব্দুল্লাহপুর বাসস্টপে নামে।

মধ্যরাতে ঢাকায় গিয়ে রাস্তায় হাঁটতে থাকে। পরে এক পুলিশ কর্মকর্তার নজরে পড়লে ঢাকায় এসে হারিয়ে যাওয়ার কথা জানায় তাহিন। এরপর ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থানা থেকে তাহিনের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে ৭ জুলাই হস্তান্তর করা হয়।

ঢাকায় ঘুরার সময় তাহিন ছিনতাইকারীর খপ্পরেও পড়েন বলে জানান তার ভাই তৌহিদ। তিনি জানান, ছিনতাইকারীরা তাহিনের সঙ্গে থাকা ব্যাগ নিয়ে যায়। তবে কি কারণে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় গিয়েছিল—তা জানতে চাইলে তাহিন জানায়, তার ঘুরতে ইচ্ছে হয়েছিল, তাই।

‘পড়ার চাপে’ পালায় আব্দুল্লাহ

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর এলাকার একটি মাদ্রাসার আবাসিক ছাত্র ছিল ১০ বছরের শিশু আব্দুল্লাহ। ৩ জুলাই হঠাৎ নিখোঁজ হয় আব্দুল্লাহ। তাকে খুঁজে না পেয়ে ফেসবুকে হারানো বিজ্ঞপ্তি দেন তার খালাতো ভাই মিজান। যদিও হারানোর কয়েক ঘণ্টা পর পাশের একটি এলাকা থেকে আব্দুল্লাহকে পাওয়া যায়। মিজান জানান, মাদ্রাসার পড়ার চাপ থেকে বাঁচতে পালিয়ে যেতে চেয়েছিল সে।

তবে নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি দিলেও ফিরে পাওয়ার বিজ্ঞপ্তি দিতে ভুলে যান মিজান। সেই হারানো বিজ্ঞপ্তিটিও এখন রয়ে গেছে ফেসবুক গ্রুপে। তাই ফেসবুক ব্যবহারকারীদের কাছে এখনও ‘নিখোঁজ’
মিজান।

খোঁজ পাওয়ার বিষয়ে পোস্ট দেন না কেউই

চট্টগ্রাম নগরীর ২ নম্বর গেট এলাকার তুলাতলী থেকে ২৯ জুন হারিয়ে যায় খাদিজা নামের মানসিক প্রতিবন্ধী এক কিশোরী। তাকে খুঁজে পেতে ফেসবুক গ্রুপে পোস্ট দেন প্রতিবেশী আনোয়ার হুজুর।

৫ জুলাই তাকে নগরীর বাকলিয়া থেকে পাওয়া গেলেও সেই নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি রয়ে যায় ফেসবুক গ্রুপে। খুঁজে পাওয়ার বিষয়ে পোস্ট দিতেও ভুলে যান আনোয়ার হুজুর। তিনি বলেন, তাকে (খাদিজা) খুঁজে পেয়েছি। তবে সেটি ফেসবুকে জানাতে ভুলে গেছি।’

প্রেমিকের সঙ্গে ‘পালিয়ে’ও নিখোঁজের তালিকায়

নিখোঁজ সাধারণ ডায়েরিগুলোর বেশির ভাগই হয় প্রেমঘটিত। তবে চক্ষুলজ্জার ভয়ে সেগুলো নিখোঁজ বলে এলাকায় প্রচার করে ভুক্তভোগী পরিবার। কারণ এসব ঘটনার প্রভাব পড়ে পরিবারের অন্যান্য সন্তান ও সদস্যদের ওপর।

এসব নিখোঁজের বিষয়ে জানতে কথা হয় নগরীর হালিশহর, বন্দর, বায়েজিদ, চকবাজার ও চান্দগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) সঙ্গে। তাদের ভাষ্য, হারানোর কয়েকটি অভিযোগ এলেও তা কিছুদিন পর উদ্ধার করা হয়।

এ বিষয়ে বায়েজিদ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সঞ্জয় কুমার সিনহা বলেন, গত মাসে (জুন) আমার থানায় ছয়টি নিখোঁজ জিডি হয়। যাদের সবাইকে রিকোভারি করেছি। তবে এদের বেশিরভাগই হচ্ছে প্রেমঘটিত বিষয়, প্রেমিকের সঙ্গে পালিয়ে যায়। যেমন—গতকালও (সোমবার) ফেনী থেকে এক মেয়েকে উদ্ধার করে এনেছি, সে ক্লাস নাইনে পড়ে, মাত্র ১৬ বছর বয়স।’

বন্দর থানার ওসি মঞ্জুর কাদের মজুমদার বলেন, ‘নিখোঁজের বেশিরভাগই প্রেমঘটিত বিষয়। ওরা পরবর্তীতে নিজেরাই সমাধান করে নেন। আমার থানায় গত জুন মাসে এমন তিনটি ডায়েরি হয়েছে।’

হালিশহর থানার ওসি কায়সার হামিদ বলেন, ‘জুন মাসে আমার থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি হয়েছে। পরে তাকে ঢাকা থেকে উদ্ধার করে তার পরিবার।’

চকবাজার থানার ওসি ওয়ালী উদ্দিন আকবর বলেন, ‘আমার এলাকায় বেশ কয়েকটি নিখোঁজের ঘটনা আছে।’ তবে কতজন নিখোঁজ সে বিষয়ে সঠিক তথ্য দিতে পারেননি তিনি।

চান্দগাঁও থানার ওসি জাহিদুল কবির বলেন, ‘আমার থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি ছিল, সেই ছেলেকে পতেঙ্গা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। এখন কোনো নিখোঁজের ঘটনা নেই।’

এছাড়া চট্টগ্রামভিত্তিক ফেসবুক গ্রুপ ‘ডেসপারেটলি সিকিং চিটাগাং’-এ ৬ ও ৭ জুলাই চট্টগ্রামের পটিয়ায় আরিফুল ইসলাম (১০), ফটিকছড়ির সফওয়ান (১৪), হালিশহরের বসুন্ধরা মাদ্রাসার মো. সারাফাত (৮), বিমানবন্দর আবাসিক এলাকার রবিউল ইসলাম রাফি (১২), ডবলমুরিংয়ের তুহিন (১২), পটিয়ার ইয়াসিম আরফাত মহিদসহ (১৩) বেশ কয়েকজন শিশু হারানোর বিজ্ঞপ্তি দেন তাদের স্বজনরা। কিন্তু ৯ জুলাই ওই গ্রুপে কোনো ধরনের হারানো বিজ্ঞপ্তি দেখা যায়নি।

ডিজে

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!