চট্টগ্রামে লিজের ৫ একর সরকারি জমি বিক্রি, ১২ কোটি টাকার দলিল জালিয়াতি

সাবেক সাব-রেজিস্ট্রারসহ দুজনের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

চট্টগ্রামের নাসিরাবাদ (অক্সিজেন) শিল্প এলাকায় সরকার সংশ্লিষ্ট প্রায় ৫ দশমিক ২০ একর লীজকৃত জমি অবৈধভাবে বিক্রি, পরে ব্যাংকে বন্ধক রাখা এবং তৃতীয় পক্ষের কাছে পুনরায় বিক্রির চেষ্টা করার অভিযোগে দুইজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ১২ কোটি টাকার বেশি মূল্যের দলিল জালিয়াতির অভিযোগে দায়ের করা এ মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং এক সাবেক সাব-রেজিস্ট্রারকে।

অভিযুক্তরা হলেন বি.কে. টেক্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হারুন অর রশিদ এবং চট্টগ্রাম সদর সাবেক সাব-রেজিস্ট্রার মো. আবু তালিব খান। তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০ ও ১০৯ ধারার পাশাপাশি দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় মামলা করা হয়েছে। দুদকের সহকারী পরিচালক নুরুল ইসলাম রোববার (৮ মার্চ) কমিশনের প্রধান কার্যালয় থেকে এজাহার দায়ের করেন।

লীজ জমি নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ

দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার ১৯৫৭ সালে চট্টগ্রামের নাসিরাবাদ শিল্প এলাকায় শিল্প প্লট নম্বর ২৩৩, ২৩৩এ, ২৩৪ ও ২৩৪এ—মোট প্রায় ৫ দশমিক ২০ একর জমি ৯৯ বছরের জন্য পাকিস্তান অক্সিজেন লিমিটেডকে ইজারা দেয়। শিল্প গ্যাস উৎপাদনের উদ্দেশ্যে লীজ দেওয়া ওই জমি গভর্নরের পূর্বানুমতি ছাড়া বিক্রি বা বন্ধক দেওয়া যাবে না—এমন শর্ত চুক্তিতে উল্লেখ ছিল।

পরে পাকিস্তান অক্সিজেন লিমিটেডের নাম পরিবর্তন হয়ে বিওসি বাংলাদেশ লিমিটেড এবং বর্তমানে লিন্ডে বাংলাদেশ লিমিটেড হয়।

দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ সালে কোম্পানির বোর্ড সভায় উক্ত জমি বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সালের ২৯ মার্চ চট্টগ্রাম সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ১২ কোটি ৫১ লাখ টাকার একটি সাফ কবলা দলিলের মাধ্যমে জমিটি বি.কে. টেক্স লিমিটেডের কাছে বিক্রি করা হয়। ওই দলিলে ক্রেতা হিসেবে স্বাক্ষর করেন কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হারুন অর রশিদ এবং বিক্রেতা হিসেবে স্বাক্ষর করেন বিওসি বাংলাদেশ লিমিটেডের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওয়ালি উর রহমান ভূঁইয়া।

তবে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে যে অনুমতি দেওয়া হয়েছিল তাতে কেবল ‘হস্তান্তর’ সম্পাদনের কথা বলা হলেও বাস্তবে জমিটি সরাসরি ‘বিক্রি’ করা হয়। দুদকের অভিযোগ, এটি লীজ চুক্তির শর্তের পরিপন্থী।

ব্যাংকে বন্ধক ও পুনরায় বিক্রির চেষ্টা

এজাহারে বলা হয়েছে, ২০১০ সালে সরকার থেকে অনুমতি না পাওয়া সত্ত্বেও ওই শিল্প প্লটগুলো ব্যাংক এশিয়া লিমিটেডের খাতুনগঞ্জ শাখায় একটি ক্লাসিফাইড ঋণের বিপরীতে অতিরিক্ত জামানত হিসেবে বন্ধক রাখা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, বি.কে. ওভারসিজ ও বি.কে. রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড অ্যাপার্টমেন্টস লিমিটেড নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানের ঋণের মেয়াদ বাড়াতে ওই জমি কোলেটরাল মর্টগেজ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

পরবর্তীতে দুদকের অনুসন্ধান শুরু হলে ২০২৩ সালের ২৬ অক্টোবর ২০০৯ সালের সাফ কবলা দলিল সংশোধনের জন্য ‘হস্তান্তর দলিল সংক্রান্ত সংশোধনী ঘোষণাপত্র’ নামে একটি নতুন দলিল সম্পাদন করা হয়। তবে ওই সংশোধনী দলিলে আগের বিক্রেতা বা সংশ্লিষ্ট কোম্পানির কোনো প্রতিনিধি বা কর্মকর্তার স্বাক্ষর পাওয়া যায়নি। দুদকের মতে, মূল অপরাধ আড়াল করতে এবং আইনি দায় এড়াতে এই সংশোধনী দলিল তৈরি করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, উক্ত শিল্প প্লটগুলো বিক্রির পর বিভিন্ন সমঝোতা স্মারক, চুক্তিপত্র ও বায়নাপত্রে ‘বিক্রয়’, ‘ক্রেতা-বিক্রেতা’ এবং ‘নিরঙ্কুশ মালিকানা হস্তান্তর’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি জমিটি তৃতীয় পক্ষের কাছে পুনরায় বিক্রির জন্য আলোচনা ও সমঝোতার চেষ্টাও চলছিল বলে দুদকের অভিযোগ।

দুদকের দাবি, সরকার সংশ্লিষ্ট লীজ জমি অনুমতি ছাড়া বিক্রি করা, পরে ব্যাংকে বন্ধক রাখা এবং বিভিন্নভাবে মালিকানা হস্তান্তরের চেষ্টা করার মাধ্যমে আসামিরা অপরাধজনক বিশ্বাসভঙ্গ, প্রতারণা এবং লীজ চুক্তি ভঙ্গ করেছেন। কমিশনের আইন অনুবিভাগের মতামত ও অনুমোদনের ভিত্তিতে মামলাটি দায়ের করা হয়েছে।

দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময়ে সংঘটিত এসব অনিয়মের ঘটনাস্থল চট্টগ্রাম মহানগর এলাকা। তদন্তে নতুন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে এজাহারে উল্লেখ করেছেন দুদকের সহকারী পরিচালক নুরুল ইসলাম।

ksrm