চট্টগ্রামে রেলের ২৬ একর জমি বেহাতের ঘটনায় একের দায় পড়েছে অন্যের ঘাড়ে

রেক্টরের উৎসাহে চিফ কমান্ড্যান্টের তড়িঘড়ি কমিটি

0

চট্টগ্রামে রেলওয়ে ট্রেনিং একাডেমির প্রায় ২৬ একরের একটি জমি পুনরায় বেহাত হয়েছে। যে প্রতিষ্ঠানকে উচ্ছেদ করে এই জমি হেফাজতে নিয়েছিল রেলওয়ে, সেই প্রতিষ্ঠানের হাতেই আবার দখল হয়েছে এই জমি। আর এই জমি বেহাতের জন্য রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা বাহিনী চৌকি, চট্টগ্রামের তৎকালীন চিফ ইন্সপেক্টর আমান উল্লাহ আমানকে দায়ী করেছেন রেলওয়ে ট্রেনিং একাডেমির রেক্টর মনির হোসেন চৌধুরী।

অথচ জমি বেহাতের যে দিনক্ষণ রেক্টর উল্লেখ করেছেন তার চিঠিতে, ওই সময়ে ওই দায়িত্বে ছিলেন মুজিবুল হক। অবাক করা বিষয় হলো, রেক্টরের চিঠির প্রেক্ষিতে কোনো বাছবিচার না করেই আমান উল্লাহ আমানের বিরুদ্ধেই নিরাপত্তা বাহিনীর চিফ কমান্ড্যান্ট জহিরুল ইসলাম গঠন করেছেন তদন্ত কমিটি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এভাবে বাহিনীর প্রধান হয়ে রেক্টরের পাঠানো চিঠি পেয়েই অধীনস্থ ইন্সপেক্টরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া চিফ কমান্ড্যান্টের অদক্ষতাই প্রমাণ করে।

জানা গেছে, আমান উল্লাহ আমান রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা বাহিনী চৌকি, চট্টগ্রামের চিফ ইন্সপেক্টর পদে ২০২০ সালের ৫ জুন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। বদলি আদেশ পেয়ে একই দিন বিকেলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা বাহিনী চৌকি চট্টগ্রামের সিজিপিওয়াই পদে যোগদান করেন। তার আগে নিরাপত্তা বাহিনী চৌকি, চট্টগ্রামের চিফ ইন্সপেক্টর পদে ২০১৯ সালের ১১ এপ্রিল থেকে ২০২০ সালের ৫ জুন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন মুজিবুল হক। তার দায়িত্ব পালনকালীন ২০২০ সালের ২৫ মার্চ থেকে ৩০ মে সময়ের মধ্যে রেলওয়ে ট্রেনিং একাডেমির ভেতর থেকে অতীতে উচ্ছেদকৃত একটি প্রতিষ্ঠানকে পুনরায় এসব জমি হস্তান্তর করে দেওয়া হয়। অথচ ট্রেনিং একাডেমির রেক্টর এ ঘটনায় মুজিবুল হককে দায়ী না করে অভিযোগ তোলেন ২০২০ সালের ৫ জুন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা বাহিনী চৌকি চট্টগ্রামের সিজিপিওয়াই পদে যোগদান করা আমান উল্লাহ আমানের বিরুদ্ধে।

গত ২ নভেম্বর রেলওয়ে ট্রেনিং একাডেমির রেক্টর স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ২০১৫ সালের ১০ অক্টোবর ট্রেনিং একাডেমির ৯ নম্বর পরিত্যক্ত বাংলো এলাকায় জলাশয়, বাগান ও ভূমি একটি প্রতিষ্ঠানকে শর্তসাপেক্ষে ২৫ দশমিক ৯০ একর জমি লিজ দেওয়া হয়। চুক্তির শর্ত ভঙ্গ ও সরকারি জমি অবৈধপন্থায় ব্যবহারের কারণে এই লিজ বাতিল করা হয়। রেল মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কমিটিই এই লিজ বাতিল ও প্রতিষ্ঠানটিকে উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত প্রদান করেন। ২০১৯ সালের ১৩ অক্টোবর এই প্রতিষ্ঠানটিকে উচ্ছেদ করে রেলওয়ে ট্রেনিং একাডেমি এই ভূমি হেফাজতে নেয়। এই ভূমির নিরাপত্তায় রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর ছয় জন সদস্য মোতায়েন করতে রেল মন্ত্রণালয়ের সচিব ও রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মৌখিক আদেশ দেন।

চিঠিতে ট্রেনিং একাডেমির রেক্টর মনির হোসেন চৌধুরী আরও উল্লেখ করেন, ‘২০২০ সালের ২৫ মার্চ থেকে ৩০ মের মধ্যে লকডাউন চলাকালে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা বাহিনী চৌকি চট্টগ্রামের তৎকালীন চিফ ইন্সপেক্টর আমান উল্লাহ আমান এই ভূমি উচ্ছেদকৃত প্রতিষ্ঠানকে পুনরায় হস্তান্তর করে। যা সরকারি স্বার্থ উপেক্ষা ও অর্পিত দায়িত্ব অবজ্ঞার শামিল।’ এই অভিযোগ তুলে তিনি তদন্তসাপেক্ষে আমান উল্লাহ আমানের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণেরও অনুরোধ জানান রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চিফ কমান্ড্যান্ট জহিরুল ইসলামকে।

২ নভেম্বরের এই চিঠির প্রেক্ষিতে বাছবিচার ছাড়াই ১০ নভেম্বর চিফ কমান্ড্যান্ট জহিরুল ইসলাম তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন। এতে আহবায়ক করা হয় রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী ঢাকার এসিকে। এছাড়া চট্টগ্রামের পাহাড়তলী রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা ও হালিশহরের সিগন্যাল ট্রেনিং অফিসারকে সদস্য করা হয়। কমিটিকে ৭ দিনের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘যে কর্মকর্তা রেক্টরের চিঠিতে উল্লিখিত ঘটনার সময়ের আরও পাঁচ মাস পর দায়িত্ব নিয়েছেন অর্থাৎ যিনি দায়িত্বেই ছিলেন না, তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নজিরবিহীন। এ ঘটনায় রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীতেও চলছে তোলপাড়। কারণ ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত না হয়েও ট্রেনিং একাডেমির রেক্টরের এ ধরনের চিঠি ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা কি-না তাও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। আবার রেক্টরের চিঠি পেয়েই বাছবিচার না করেই তদন্ত কমিটি গঠন চিফ কমান্ড্যান্ট অফিসারের অদক্ষতা নাকি ক্ষমতার অপব্যবহার সে বিষয়েও উঠেছে প্রশ্ন।’

তারা আরও বলেন, ‘যার দায়িত্বে থাকাকালীন ট্রেনিং একাডেমির জমি বেহাতের ঘটনা ঘটেছে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি। এর ফলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।’

এ বিষয়ে আমান উল্লাহ আমান বলেন, ‘জানি না কেন রেক্টর স্যার না জেনে এমন কাজ করলেন। আমার জন্য আরও বেশি কষ্টের বিষয় হলো, আমার অভিভাবক যাচাই না করেই তদন্ত কমিটি গঠন করলেন। এটাকে আমি অযোগ্যতা বলবো না, এটা আসলে ভুল। মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়।’

রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর কমান্ড্যান্ট শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘রেলওয়ের কোনো স্থাবর, অস্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষমতা রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীকে কাগজে-কলমে দেওয়া হয়েছে কি-না তা অন্তত আমার জানা নেই।’

এ বিষয়ে জানতে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চিফ কমান্ড্যান্ট জহিরুল ইসলামকে কল করা হলেও তার কাছ থেকে সাড়া মেলেনি।

এ বিষয়ে রেলওয়ে ট্রেনিং একাডেমির রেক্টর মনির হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি প্রতিবেদককে পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, ‘আপনি গোপন অভিযোগের কপি কিভাবে পেলেন।’ এরপর তিনি বলেন, ‘তার (আমান উল্লাহ আমান) যোগদান কবে সে বিষয়টি আমি জানি না।’

এমএফও

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

ksrm