রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল চট্টগ্রামে ‘বাংলাদেশ রেলওয়ে ঋণদান সমবায় সমিতি’ যেন অনিয়মের বড় খনি। ঋণ নিতে গেলেই এখানে ঋণগ্রহীতাদের দিতে হয় ‘ঘুষ’। ৬ লাখ টাকা ঋণ পেতে গুণতে হয় প্রায় ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ। সমিতি এক পরিচালকের বিরুদ্ধে উঠেছে এমন অনিয়মের অভিযোগ।
একইসঙ্গে ভোটের সময় ভোটারদের ৩০০ টাকা করে দেওয়ার কথা থাকলেও প্রায় ২০ শতাংশ ভোটার সেই টাকা পাননি বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে সম্প্রতি নির্বাচনী আইন বিধিমালা অনুসরণ না করায় সমিতির ২০২৫ সালের ব্যবস্থাপনা কমিটি বাতিল ঘোষণা করে সমবায় অধিদপ্তর।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রেলের স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঋণ দিয়ে থাকে ‘রেলওয়ে ঋণদান সমবায় সমিতি’। রেলের কোনো অঙ্গ সংগঠন না হলেও শুধুমাত্র ‘রেলওয়ে’ শব্দটি লাগিয়ে ১৪ কক্ষবিশিষ্ট ভবন অফিসের নামে দখলে রাখা হয়েছে। সমিতির সদস্য সংখ্যা প্রায় সাড়ে ২৩ হাজার। তবে ভোটার সংখ্যা ছয় হাজার ১৯ জন। গত কমিটির সময়কালে ৩ হাজার ৬০০ জনকে ঋণ দেওয়া হয়েছে।
সমিতি থেকে একজন ঋণগ্রহীতা ৬ লাখ টাকা ঋণ পেয়ে থাকেন। এই সমিতির তহবিলে বর্তমানে জমা রয়েছে প্রায় ১০৫ কোটি টাকা। সমিতি মূলত পরিচালনা করেন আট পরিচালক। তারা নির্বাচনের মাধ্যমে স্থায়ী রেল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভোটে দুই বছরের জন্য নির্বাচন হন। সর্বশেষ কমিটির আট পরিচালক হলেন—মজিবুর রহমান, কামরুল হাসান, গাজী মো. জাহাঙ্গীর, শরিফুল আলম স্বপন, মোহাম্মদ সেলিম, আরিফুর রহমান, বুলু রহমান ও আবুল কাশেম।
এদের মধ্যে মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন কয়েকজন ঋণগ্রহীতা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক নারী রেলকর্মী জানান, ৬ লাখ টাকা ঋণ নিতে গিয়ে প্রায় ৮০ হাজার টাকার বেশি শুধু ঘুষ দিতে হয়েছে। এর মধ্যে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা শুধু পরিচালক মুজিবুরকে দিতে হয়েছে। আরেক রেলকর্মী জানান, ঋণ নিতে গিয়ে ৩০ হাজার টাকার বেশি ঘুষ নিতে হয়েছে তাকে। এছাড়া দালালকে ৫ থেকে ১০ হাজার; ব্যাংক, দাপ্তরিক অফিসের লোকজনদের ২০ হাজার ও অফিস খরচ ৫ হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়।
ঋণ বাবদ গ্রহীতাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সমিতির পরিচালক-১ মুজিবুর রহমান টেলিফোনে কথা বলেন না বলে জানান। তিনি প্রতিবেদককে অফিসে এসে সাক্ষাৎ করতে বলেন।
এদিকে ভোটের সময় ভোটারদের জনপ্রতি বরাদ্দ ৩০০ টাকাও অনেকে ঠিকমতো পায়নি বলে অভিযোগ তুলেছেন। মুজিবুর রহমান ছাড়াও সাত পরিচালকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কেউ শতভাগ টাকা বণ্টন করতে পারেননি। অনেকে ৫০ শতাংশ আবার অনেকে ৭০ শতাংশ ভোটারের কাছে ৩০০ টাকা করে পৌঁছে দিতে পেরেছেন। তবে মুজিবুর দাবি করেন, তিনি শতভাগ ভোটারদের কাছে ৩০০ টাকা করে পৌঁছে দিয়েছেন। নির্বাচনের সময় এই টাকা ভোটারদের জন্য সমিতির পক্ষ থেকে পরিচালকদের মাধ্যমে বরাদ্দ হয়ে থাকে।
ঋণদান সমিতি সূত্রে জানা গেছে, পরিচালক-(১) মজিবুর রহমানের আওতাধীন দপ্তর—নিরাপত্তা ট্রেনিং সেন্টার, হিসাব বিভাগ, সিআরবি ট্রাফিক, সিআরবি মেকানিক্যাল, ইঞ্জিনিয়ারিং, সিপিওতে ভোটার ৫০৩, আর ভোট দেন ৩৯১ জন। প্রত্যেকের ৩০০ টাকা হিসেবে দাঁড়ায় ১ লাখ ১৭ হাজার ৩০০ টাকা। পরিচালক-(২) কামরুল হাসানের আওতাধীন আরএনবি মেডিক্যাল, স্টোর, লাকসাম, চাঁদপুরে ভোটার ছিল ৮৩৩ জন, এর মধ্যে ভোট দেন ৬৫৯ জন। সে হিসেবে টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৯৭ হাজার ৭০০। পরিচালক-(৩) গাজী মো. জাহাঙ্গীরের আওতাধীন ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়েম্যান, লাকসাম, চাঁদপুরে ভোটার ছিল ৬৩৫ জন, ভোট দেন ৪০৮ জন। তাদের টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ২২ হাজার ৪০০। পরিচালক-(৪) শরিফুল আলম স্বপনের আওতাধীন বিদ্যুৎ, মেকানিক্যাল (লোকো, ক্যারেজ) এবং সিগন্যালে ভোটার সংখ্যা ৬৮৩ জন, ভোট দেন ৪৭৮ জন। টাকা অংক দাঁড়ায় ১ লাখ ৪৩ হাজার ৪০০।
পরিচালক-(৫) মোহাম্মদ সেলিমের আওতাধীন ওয়ার্শকপ পাহাড়তলী এলাকায় ভোটার ৪৬৩ জন, ভোট দেন ৩৮১ জন। তাদের টাকার অংক দাঁড়ায় ১ লাখ ১৪ হাজার ৩০০। পরিচালক-(৬) আরিফুর রহমানের ঢাকা বিভাগে ভোটার ছিল ১২৩৭ জন, ভোট দেন ৮৯১ জন। ভোটারদের টাকা দাঁড়ায় ২ লাখ ৬৭ হাজার ৩০০। পরিচালক-(৭) বুলু রহমানের সৈয়দপুর ওয়ার্কশপে ভোটার ছিল ২৫৪ জন, ভোট দেন ২১৩ জন। তাদের টাকার পরিমাণ ছিল ৬৩ হাজার ৯০০। পরিচালক-(৮) আবুল কাশেমের রাজশাহী বিভাগ, খুলনা পাকশী, লালমনিরহাট, পার্বতীপুর, বগুড়া, দিনাজপুরে ভোটার ছিল ১৪১১ জন, ভোট দেন ৮৮০ জন। তারা প্রতিজন ৩০০ টাকা করে ২ লাখ ৬৪ হাজার টাকা পাওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু পরিচালক-১ মুজিবুর রহমান অর্ধেকেরও বেশি ভোটারকে টাকা দেননি।
২০২৫ সালের নির্বাচন বাতিল
বাংলাদেশ রেলওয়ে সমবায় ঋণদান সমিতি (সীমিত) চট্টগ্রাম ব্যবস্থাপনা কমিটির ২০২৫ সালের নির্বাচনী আইন বিধিমালা অনুসরণ না করায় বাতিল ঘোষণা করেছেন বিভাগীয় সমবায় দপ্তর, চট্টগ্রাম উপ-নিবন্ধক (বিচার) ও আপীলাত কর্মকর্তা।
গত ৮ জুলাই দপ্তরের উপ -নিবন্ধক (বিচার) জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা স্বাক্ষরিত আপিল নম্বর-০৯/২০২৬-এর রায়ে এ সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়।
সমবায় সমিতি আইন ২০১১, সংশোধিত (২০০২ -২০১৩) সমিতির বিধিমালা ২০০৪ (সংশোধিত ২০২০) অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে চট্টগ্রাম জেলা সমবায় অফিসারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পরিচালক প্রার্থী এক সদস্যের ২০২৫ সালে দায়ের করা মামলায় এ আদেশ দেওয়া হয়।
জানা গেছে, ২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর নির্বাচন অনুষ্ঠিত না করে, সেটা ২০২৫ সালের ১৫ অক্টোবর করা হয়। আগের কমিটির মেয়াদ ২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর শেষ হয়ে গেলেও, তারা নির্বাচন করে ওই বছরের ১৫ অক্টোবর নির্বাচন আয়োজন করে, যা সম্পূর্ণ অবৈধ।
আবুল কালামের দায়ের মামলায় ভোটারদের নাম হালনাগাদ না করা, একই সদস্যের নাম একাধিকবার অন্তর্ভুক্ত করা, মৃত ব্যক্তিদের তালিকা প্রকাশ না করা, তফসিল ও নোটিশে বিধিমালা এবং আইন অনুসরণ না করার অভিযোগ তোলা হয়।
রায়ে বলা হয়েছে, নির্বাচন সংক্রান্ত নোটিশও বিধিমালায় নির্ধারিত একাধিক পদ্ধতির পরিবর্তে শুধুমাত্র পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রকাশ করা হয়েছিল। বিধিমালার বাধ্যতামূলক বিধান অনুসরণ করা হয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ বিবাদিপক্ষ উপস্থাপন করতে পারেনি।
ডিজে




