চট্টগ্রামে রেলইয়ার্ডে ৩ মাসে ৬৯৪ পার্টস চুরি, জড়িত আরএনবি সদস্যরাও

ঘুষের টাকা ম্যানেজ করতে চুরিতে জড়াচ্ছেন আরএনবি সদস্যরা

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল চট্টগ্রামের টাইগারপাসের মার্শালিং ইয়ার্ডে গত তিন মাসে ট্রেনের কোচের (বগি) ৬৯৪টি যন্ত্রাংশ চুরি হয়েছে। যার মূল্য প্রায় অর্ধ কোটি টাকা। আর এই চুরির পেছনে ইয়ার্ডে দায়িত্বরত রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) কয়েকজন সদস্যকে দায়ী করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠিও দেওয়া হয়েছে।

সুবিধাজনক স্থানে বদলির জন্য ঘুষের টাকা ‘ম্যানেজ’ করতেই এই ধরনের চুরিতে আরএনবি সদস্যরা জড়িয়ে পড়ছে বলে জানা গেছে। তবে আরএনবির প্রধান এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন ও মিডিয়ার মনগড়া তথ্য বলে দাবি করেন।

গত ৩ জানুয়ারি ঊর্ধ্বতন উপ-সহকারী প্রকৌশলী ও প্রধান রেল যান পরীক্ষক আকরাম হোসেন যন্ত্রাংশ চুরির বিষয়ে অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে তিনি আরএনবি সদস্যদের দায়িত্বহীনতা, চুরি এবং ইয়ার্ডের আশপাশে সোনিয়ার মার মাদকের আখড়ার বিষয়টিও উল্লেখ করেন।

তবে আকরাম হোসেন যন্ত্রাংশ চুরির বিষয়টি নিশ্চিত করলেও বিস্তারিত বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

জানা গেছে, রেলের টাইগারপাস মার্শালিং ইয়ার্ডে ওয়ার্কশপ কারখানা শাখা থেকে মেরামত করা কোচসহ ট্রেনের বিভিন্ন কোচ ইয়ার্ডে রাখা হয়। এখান থেকে গতবছরের অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে ৩৬টি কোচ ৬৯৪টি যন্ত্রাংশ চুরি হয়। রেল যান নিয়ন্ত্রকের লিখিত তথ্য মতে, কোচ নম্বর ৭০০৮, ৯৩৮৩, ২১৪৮, ৪০৫, ৪৪৭০, ৭৬৭৩, ৬০০৭, ৯১৬৩, ৮৬৭২, ৭০০৫, ২১৬০, ১৬৮৬, ৭৬৭৭, ৭৬৭৪, ৭৬৭১, ৮৬৭১, ৫০৩৭, ৮৮৫৪, ৮৬৭৩, ১৮৮৭, ২২০৭, ২১৯, ২১০৭, ৭০৬১, ৭৯৩, ৭৪৬, ৮০২, ৫৩০৩, ১৯০৭, ৮৭৭, ৮৮৫২, ৭৩৫৯, ৯৬৮৮, ৭৬৭২, ৬০২২, ৫৩০৮ সহ মোট ৩৬ কোচ হতে সার্টার ৪৫২টি, পুল রড ৬৭টি, কানেক্টিং লিভার ৩০টি, ব্রেক ব্লক ৯৯টি, কাপলিং সেট ৬টি, ট্রাসবার ৩৪টি, বাফার হুক ৩টি, ডাস্টবার ৩টিসহ মোট ৬৯৪টি যন্ত্র্রাংশ চুরি হয়েছে। এসব যন্ত্রাংশের মূল্য প্রায় ৫০ লাখ টাকা।

এদিকে আরএনবি দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চুরির বিষয়ে ইয়ার্ড ইনচার্জ (এএসআই) ইমন মজুমদার গত ২ জানুয়ারি লিখিত অভিযোগ করেন। এতে সিপাহী সামিউল চুরির ঘটনায় সম্পৃক্ত ছিল বলে উল্লেখ করা হয়।

এএসআই ইমন মজুমদার বলেন, ৯ জন সৈনিক, ৪ জন হাবিলদার এবং আমিসহ ১৪ জন রয়েছি ইয়ার্ডে। সংরক্ষিত ইয়ার্ড অনেক বড়, সেই হিসেবে জনবল সামান্য। তবে যন্ত্রাংশ চুরির বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

ঘুষের টাকা জোগাড় করতে চুরি!

আরএনবির কয়েকজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সুবিধাজনক স্থানে বদলির জন্য ‘ঘুষ’ দিতে হয় সব জায়গায়। বদলির জন্য সিপাহীদের ৩০ হাজার, হাবিলদার ৫০ হাজার, এসআই ৫০ হাজার করে দিতে হয়। পূর্বাঞ্চলের অন্যান্য স্টেশনে যেতে দিতে হয় লাখ টাকার কাছাকাছি।

এছাড়া চিফ ইন্সপেক্টর বদলির জন্য স্থানভেদে ২ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয় বাহিনীর প্রধানকে। এই টাকা তুলতেই অনেকে রেলের মালামাল চুরিতে জড়ান। এছাড়া অনেকে রেলের জায়গা অবৈধ স্থাপনা, টিকিট কালোবাজারিসহ বিভিন্ন অনৈতিক কাজে জড়ান।

একইসঙ্গে কোনো অভিযোগ এলে শাস্তির হাত থেকে রক্ষা পেতেও দিতে হয় ঘুষ। বিভিন চৌকি হতে প্রতি মাসে দিতে হয় টাকা। তা নাহলে ঠুনকো অজুহাতে বদলি করে দেওয়া হয়।

জানতে চাইলে রেল পূর্বাঞ্চল আরএনবির চিফ কমান্ড্যান্ট জহিরুল ইসলাম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এসব মিডিয়ার মনগড়া বক্তব্য। সমকাল, চট্টগ্রাম প্রতিদিনসহ আরও দুটি প্রিন্ট মিডিয়া আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিন বছর ধরে অপপ্রচার চালাচ্ছে।’ এক পর্যায় তিনি মানহানি মামলারও হুমকি দেন।

আরও জানা গেছে, জহিরুল ইসলাম দুদকের নিয়োগ দুর্নীতি মামলার আসামি। তবে তিনি বর্তমানে জামিনে আছেন। এছাড়া এক জায়গায় তিনি তিন বছর ধরে কাজ করে গেলেও বদলি হননি।

এদিকে রেলের মাল চুরি ও মাদককাণ্ডে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের স্ট্যান্ড রিলিজের আদেশ দেন বিভাগীয় কর্ম ব্যবস্থাপক আবিদুর রহমান। কিন্তু তাকেও পাত্তা দেননি আরএনবির প্রধান।

আবিদুর রহমান বলেন, ‘অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কেন বদলি করা হয়নি তা জানি না। আমি বিষয়টি খোঁজ নিচ্ছি।’

এই বিষয়ে জানতে চাইলে রেল মহাব্যবস্থাপক জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘এসব বিষয়ে আমি খোঁজ নেবো। প্রয়োজনে বিভাগীয় তদন্তের ব্যবস্থা করা হবে।’

ডিজে

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!