চট্টগ্রামে যক্ষ্মার চার স্তর চিকিৎসার দুটিই নেই, হাসপাতালের মেশিনেও ঝামেলা

ফৌজদারহাট বক্ষব্যাধি হাসপাতালেও নেই পর্যাপ্ত সুবিধা

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে যক্ষ্মা রোগীদের চিকিৎসা চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। লোকবলের অভাব, মেশিন নষ্টসহ বিভিন্ন কারণে অনেক রোগী পূর্ণ মেয়াদি চিকিৎসা নিতে পারছেন না। অথচ যক্ষ্মা সন্দেহ হলেই রোগীদের পরীক্ষার জন্য প্রথমেই পাঠানো হয় এই হাসপাতালে।

এছাড়া ফৌজদারহাট বক্ষব্যাধি হাসপাতালে যেসব রোগীর দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন তাদের পাঠানো হয়। কিন্তু সেখানে থেকে অনেক রোগীকে রিলিজ দেওয়ার পর ঠিক মতো ওষুধ খান না। ফলে যক্ষ্মার জীবাণু পুরোপুরি ধ্বংস হয় না। তাছাড়া এসব রোগীকে বাড়িতে গিয়ে ডটস কর্নার বা হাসপাতালের স্বাস্থ্যকর্মীদের সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে গাফেলতি থাকে। ফলে এসব রোগী শরীরের যক্ষ্মার জীবাণু বয়ে বেড়ায়।

যক্ষ্মা রোগের চারটি স্তর রয়েছে। প্রথমটি প্রাথমিক যক্ষ্মা রোগ, দ্বিতীয়টি এমডিআর, তৃতীয়টি এক্সডিআর এবং চতুর্থটি হলো টোটাল ড্রাগ রেজিসটেন্ট (টিডিআর)। এর মধ্যে প্রাথমিক রোগীদের চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের বক্ষব্যাধি ক্লিনিকে দেওয়া হয়। আর এমডিআর রোগী শনাক্ত হলে তাদের ফৌজদারহাট বক্ষব্যাধি হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়। কিন্তু বাকি দুই স্তরের কোনো চিকিৎসায় হয় না চট্টগ্রামে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যক্ষ্মার জীবাণু পুরোপুরি ধ্বংস করতে সঠিক মাত্রায় ছয় মাস পূর্ণ মেয়াদে ওষুধ খেতে হয়। অনেকে এক-দুই মাস ওষুধ খেয়ে একটু সুস্থ হওয়ার পর ওষুধ ছেড়ে দেয়। তখন ওষুধের মাত্রা ঠিক না থাকায় অথবা কোর্স শেষ না হলে জীবাণু ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে ওঠে। সেক্ষেত্রে আবারও নতুন মাত্রায় প্রায় দুই বছর ওষুধ সেবন করতে হয়, যা ব্যয়বহুল। এর মধ্যে যারা এমডিআর যক্ষ্মার রোগী, তারা সরাসরি জীবাণু ছড়ায়।

এমডিআর ল্যাব সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের বহির্বিভাগের চতুর্থ তলায় ২০১০ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠা করা হয় আঞ্চলিক যক্ষ্মা পরীক্ষাগার (আরটিআর) ল্যাব। আধুনিক চিকিৎসা উপকরণ সমৃদ্ধ এই ল্যাব দেশে আছে তিনটি—ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে। কিন্তু এমডিআর যক্ষ্মা শনাক্তের হার বাড়ানোর জন্য জেনারেল হাসপাতালের জিন এক্সপার্ট যন্ত্রের (দুই ঘণ্টার মধ্যে এমডিআর যক্ষ্মা জীবাণু শনাক্ত করা যায়) ১৬টি অংশের ২টি নষ্ট। যার ফলে ১৬টি টেস্ট যেখানে হওয়ার কথা থাকলেও তা হচ্ছে না।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, জেনারেল হাসপাতালের বক্ষব্যাধি ক্লিনিকে মাত্র একজন কনসালট্যান্ট আর একজন মেডিকেল অফিসার দিয়ে চলছে চিকিৎসা। দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট এক্স-রে মেশিন, নেই রেডিওলজিস্ট ও রেডিওগ্রাফার। তাই অনেক সময় শুধুমাত্র কফ পরীক্ষা করেও যক্ষ্মা রোগ নিরূপণ করা যাচ্ছে না। অনেক রোগীকে বাইরের ল্যাবে এক্স-রে করার পরামর্শ দিলেও গরিবদের পক্ষে তা সম্ভবে হচ্ছে না।

অভিযোগ আছে, এই ক্লিনিকের কনসালট্যান্ট রোগীদের হাতে কার্ড দিয়ে চেম্বারে যাওয়ার পরামর্শ দেন। কনসালট্যান্টের ভিজিটিং কার্ডে যে ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চেম্বার করেন সেটির ঠিকানা দেওয়া থাকে।

এছাড়া বক্ষব্যাধি ক্লিনিক থেকে বিনামূল্যে সরকারি ওষুধ ও যক্ষ্মা রোগের চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকলেও রোগীকে ডটস কর্নারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু ডটস কর্নারে গিয়ে রোগী নিয়মিত ওষুধ সেবন করেন না। মূলত যক্ষ্মায় আক্রান্ত হওয়ার পর অনিয়মিত ওষুধ সেবন এবং চিকিৎসার পূর্ণ কোর্স শেষ না করার কারণে রোগ জটিল হয়।

জানা গেছে, ২০২২ সালে চট্টগ্রাম জেলায় সর্বমোট ১৫ হাজার ৯৯১ জন যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত হয়। ক্যাটাগরি-১ রোগীর সংখ্যা ১৪ হাজার ৯৩৩ জন। পুনঃআক্রান্ত যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যা ১০৫৮ জন। ফুসফুস আক্রান্ত যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যা ১০ হাজার ৫৪৫ জন। ফুসফুস বর্হিভূত যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যা ৫ হাজার ৪৪৬জন।

ফুসফুস আক্রান্ত জীবাণুযুক্ত নতুন যক্ষ্মা রোগী শনাক্তের হার ৭৬ শতাংশ (প্রতি এক লাখে)। সার্বিক যক্ষ্মা রোগ শনাক্তের হার ১৫০ (প্রতি এক লাখে)। চিকিৎসাপ্রাপ্ত রোগীদের মধ্যে সাফল্যের হার শতকরা ৯৭ শতাংশ। শনাক্ত রোগীর মধ্যে শিশু যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যা ৬৬৬ জন। চিকিৎসাধীন রোগীদের মধ্যে যক্ষ্মা ও অন্যান্য কারণে মৃত্যু হয়েছে ১৬১ জনের।

আরও জানা গেছে, চট্টগ্রামে ডটস কর্নারের সংখ্যা ৭৯টি (মেট্রোপলিটনে ৬৪টি ও উপজেলা পর্যায়ে ১৫টি)। কফ পরীক্ষার কেন্দ্র ৬৫টি (মেট্রোপলিটনে ২৭টি ও উপজেলা পর্যায়ে ৩৮টি)। সন্দেহজনক রোগীর (যাদের দুই সপ্তাহের বেশি কাশি আছে) কফ পরীক্ষা করা হয়েছে ১ লাখ ৪৩ হাজার ৪৮৯ জন। ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যা ১১৯ জন (২০২২ সালে শনাক্ত)।

২০১১ থেকে ২০২২ পর্যন্ত চট্টগ্রামে ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত হয় ১ হাজার ৬০ জন। ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মা চিকিৎসায় সাফল্যের হার শতকরা ৮০ শতাংশ। এছাড়া শনাক্ত যক্ষ্মা রোগীদের মধ্যে এইচআইভি পরীক্ষা করা হয় ৬ হাজার ৩৯৬ জনের।

চট্টগ্রাম বক্ষব্যাধি ক্লিনিকের কনসালট্যান্ট ডা. মোস্তফা নূর মোর্শেদ বলেন, ‘এমডিআর যক্ষ্মা শনাক্ত হলে রোগীকে ২৪ মাসের চিকিৎসার জন্য ফৌজদারহাট বক্ষব্যাধি হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। সেখানে বিনামূল্যে ওষুধ, ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়। কিন্তু রোগীরা সেখানে যেতে চান না। আবার অনেক রোগীকে ছয় মাসের চিকিৎসার পর বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বাসায় ওই রোগীকে হাসপাতালের স্বাস্থ্যকর্মী বা ডটস কর্নারের কর্মীরা ওষুধ খাওয়ানো এবং নিয়মিত ইঞ্জেকশন দিয়ে আসার নিয়ম। কিন্তু ডটসকর্মীদের তা না করার অভিযোগ রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘করোনার কারণে রোগীর উপস্থিতি কম ছিল। যার ফলে আমরা ট্রেসিং করতে পারিনি। রোগীকে ডায়াগনসিস করা যায়নি। তবে অবস্থার এখন কিছুটা উন্নতি হয়েছে। রোগীরা আগের তুলনায় বেশি আসছেন বক্ষব্যাধি ক্লিনিকে।’

এদিকে শুক্রবার (২৪ মার্চ) বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস। কিন্তু শুক্রবার বন্ধের দিন হওয়ায় বৃহস্পতিবার (২৩ মার্চ) দিবসটি পালন করেছে চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়।

বৃহস্পতিবার সকালে দিবস উপলক্ষে একটি শোভাযাত্রা নগরীর জেনারেল হাসপাতালের সামনে থেকে শুরু হয়ে সিভিল সার্জন কার্যালয়ে গিয়ে শেষ হয়।

এর আগে জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. সেখ ফজলে রাব্বী বেলুন উড়িয়ে দিবসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। পরে সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াছ চৌধুরীর সভাপতিত্বে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

ডিজে

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!