চট্টগ্রামে ব্যাংক থেকে ৩০ লাখ টাকা উধাও অনলাইনের ১৭ লেনদেনে, গ্রাহক জানেই না

টানা তিন ছুটির দিনে ‘ব্লক’ ছিল গ্রাহকের মোবাইল সিম

চট্টগ্রামে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) বিরুদ্ধে গ্রাহকের অজান্তে ৩০ লাখ টাকার আমানত সরিয়ে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। টানা তিন ছুটির দিনে অনলাইনে করা ১৭টি লেনদেনের মাধ্যমে ওই টাকা সরানো হয়। ওই সময় বিশেষ কায়দায় ‘ব্লক’ করে দেওয়া হয় ওই গ্রাহকের মোবাইল সিমটি।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের মুরাদপুর শাখার গ্রাহক মোহাম্মদ শামসুল হুদা এমন অভিযোগ এনে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিটে (বিএফআইইউ)। এই অভিযোগ গড়িয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয় পর্যন্ত।

চট্টগ্রামের ওই গ্রাহক অভিযোগ করেছেন, গত ১৮ আগস্ট থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত তিন দিনে ১৭টি ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের (ইএফটি) মাধ্যমে তার একাউন্ট থেকে সরানো হয়েছে ৩০ লাখ টাকা। অথচ এ ব্যাপারে তিনি কিছুই জানতেন না। ব্যাংকে এ নিয়ে দেনদরবারের পর সরিয়ে নেওয়া ওই ৩০ লাখ টাকা থেকে মাত্র এক লাখ টাকা গ্রাহক শামসুল হুদার একাউন্টে ফিরিয়ে দেওয়া হয় পরে। বাকি ২৯ লাখ টাকা ‘ব্যবস্থা নিচ্ছি-দিচ্ছি-দেবো’ করে ওই গ্রাহককে ‘বুঝ’ দিচ্ছেন ব্যাংক কর্মকর্তারা।

অভিযোগসূত্রে জানা গেছে, গত ১৮ আগস্ট জন্মাষ্টমীর বন্ধের দিন বিকেল চারটার পর গ্রাহক শামসুল হুদার মোবাইল নম্বরে কল ও এসএমএস আদান-প্রদানে সমস্যা হতে থাকে। শুরুতে এটাকে তিনি মোবাইলের নেটওয়ার্কের সমস্যা বলেই ধারণা করেন। কিন্তু পরদিনও যখন একই সমস্যার মুখোমুখি হন, তখন তিনি বিষয়টি সিমঘটিত সমস্যা বলে সন্দেহ করেন। শুক্রবার গ্রামীণ ফোনের কলসেন্টার বন্ধ থাকায় শনিবার (২০ আগস্ট) তিনি গ্রামীণফোনের অফিসে যোগাযোগ করে জানতে পারেন তার মোবাইলের সিমটি একটি ‘কোড নম্বর’ দিয়ে ব্লক করা আছে।

ঘটনা জেনে ওইদিনই সিমের ব্লক খোলার পরপরই শামসুল হুদার মোবাইলে চারটি এসএমএস আসে। তাতে দেখা যায় মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক থেকে তার অজ্ঞাতে টাকা স্থানান্তরিত হচ্ছে। এমন ঘটনায় বিস্মিত হয়ে সঙ্গে সঙ্গে তিনি মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এক কর্মকর্তাকে ফোন করেন। কিন্তু চারবার কল দিলেও সেই কর্মকর্তা ফোন ধরেননি। এরপর মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের কন্ট্যাক্ট সেন্টারের ১৬২১৯ নম্বরে কল করে তার একাউন্টের সবরকম লেনদেন বন্ধ করে দেন শামসুল হুদা।

Yakub Group

এরপর শামসুল হুদা মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এক উর্ধতন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে ওই কর্মকর্তা তাকে জানান, ১৮ থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত তার একাউন্টে ১৭টি ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) ট্রানজেকশন হয়েছে। এগুলোর মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংকে প্রায় ৩০ লাখ টাকা স্থানান্তর হয়েছে।

২১ আগস্ট শামসুল হুদা সশরীরে যান মুরাদপুর শাখায়। সেখানেও ঘটনার কূলকিনারা না পেয়ে ওইদিনই চট্টগ্রাম নগরীর পাঁচলাইশ থানায় এ বিষয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। সেই ডায়েরির কপিসহ মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক মুরাদপুর শাখার ম্যানেজার বরাবরে একটি অভিযোগ জমা দেন তিনি। এরপর বেহাত হওয়া ৩০ লাখ টাকার মধ্যে ১ লাখ টাকা সেই ম্যানেজারের সহযোগিতায় শামসুল হুদার একাউন্টে ফিরে আসে।

দেখা গেছে, ১৮ আগস্ট শামসুল হুদার একাউন্টে ৩ লাখ টাকার দুটি এবং দুই লাখ টাকার একটি লেনদেনসহ মোট ১০ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে সাতটি। পরদিন ১৯ আগস্ট ৩ লাখ টাকার দুটি ও ২ লাখ টাকার একটিসহ ১০ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে পাঁচটি। সর্বশেষ ২০ আগস্ট ৩ লাখ টাকার দুটি ও ২ লাখ টাকার একটিসহ ১০ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে পাঁচটি।

শামসুল হুদা বলেন, একাউন্ট থেকে অর্থ উত্তোলনের সীমা নগদ হলে ২ লাখ টাকা এবং ট্রান্সফার হলে ১ লাখ টাকা ফরমে লিপিবদ্ধ হয়। একদিনে সর্বোচ্চ চারটি লেনদেন করা যাবে— এমন শর্তও দেওয়া আছে ফরমে। অথচ

তিনি অভিযোগ করেন, আমানতকারীর হিসাব ফরমের নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করলে তো কোনভাবেই টাকা ট্রান্সফার হওয়ার কথা নয়। নির্ধারিত সেই সীমা যদি প্রয়োজনে বাড়াতেও হয়, তাহলেও সেখানে আমানতকারী তথা গ্রাহকের স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক।

দেখা গেছে, ১৮, ১৯ ও ২০ আগস্ট— এ তিনদিনই ব্যাংক ছিল বন্ধ। বড় অংকের এই টাকা সরানোর জন্য ছুটির এই দিনগুলোকেই বেছে নেওয়া হয়েছে।

মোহাম্মদ শামসুল হুদা মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের মুরাদপুর শাখায় একাউন্ট খুলেছেনও ঘটনার মাত্র একমাস আগে। এরপর থেকে তিনি কখনোই অনলাইনে একটিও লেনদেন করেননি। এরপরও ছুটির দিনে অনলাইনমাধ্যম ব্যবহার করে এমন অস্বাভাবিক লেনদেনের বিষয়টি ব্যাংকের সার্ভারে কি একটুও সন্দেহ জাগায়নি— প্রশ্ন তুলেছেন শামসুল হুদা।

গত ২৭ জুলাই মোহাম্মদ শামসুল হুদা মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের আগ্রাবাদ প্রধান শাখায় গিয়ে একাউন্ট খোলার একটি ফরম নেন। একাউন্ট খোলার ফরমটি তিনি নিজে পূরণ করার আগ্রহ দেখালেও ব্যাংকের এক নারী কর্মকর্তা সেটা পূরণ করে দেবেন জানিয়ে ফরমের কয়েকটি স্থানে শামসুল হুদার স্বাক্ষর ও সংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে নেন।

এরপর ওইদিনই তিনি নগদ দুই হাজার টাকা এবং শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ৪০ লাখ টাকার চেক মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের মুরাদপুর শাখায় জমা দিয়ে একাউন্টটি খোলেন। একাউন্ট খোলার ফরম পূরণের ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের সর্বোচ্চ লিমিট ছাড়া অন্য সব তথ্য ব্যাংক কর্মকর্তা নিজে পূরণ করেন বলে জানান ভুক্তভোগী গ্রাহক শামসুল হুদা।

সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ksrm