চট্টগ্রামে বিক্ষিপ্ত বৃষ্টিতে বাড়ছে ডেঙ্গুর ভয়, ৫ দিনে আক্রান্ত ৫৭

নগরের ৮ ওয়ার্ড ‘হটস্পট’, লার্ভার ঘনত্ব বেশি দুই এলাকায়

চট্টগ্রামে বিক্ষিপ্ত বৃষ্টিতে বাড়ছে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। চলতি মাসের পাঁচদিনেই ৫৭ জন আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে নগরের ৮টি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গুর ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের জরিপে ইতোমধ্যে নগরের দুটি এলাকায় এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব বেশি পাওয়া গেছে। তবে বর্ষা মৌসুম চলে আসলেও এখনও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি সিটি কর্পোরেশন।

ডাক্তাররা বলছেন, বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়াতে পারে। থেমে থেমে বৃষ্টি ও উচ্চ আর্দ্রতা ডেঙ্গু ভাইরাসের পরিচিত বাহক এডিস মশার প্রজননের জন্য খুবই উপযোগী। এরই মধ্যে চট্টগ্রামে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে হাসপাতালগুলোতে।

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি জুলাই মাসের ৫ দিনে ৫৭ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ১৮ জন।

চলতি বছরে মোট আক্রান্ত হয়েছে ৩৫৫ জন। যাদের মধ্যে ১৪৪ জন উপজেলা, ১৩১ জন নগর এবং ৮০ জন অন্যান্য জেলার বাসিন্দা। এর মধ্যে ফেব্রুয়ারি ও জুন মাসে যথাক্রমে একজন করে রোগীর মৃত্যু হয়েছে।

‘হটস্পট’ ৮ ওয়ার্ড

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন অফিস নগরীর ৮টি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গুর হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই ওয়ার্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে—জালালাবাদ (২ নম্বর ওয়ার্ড), পাঁচলাইশ (৩ নম্বর ওয়ার্ড), উত্তর কাট্টলী (১০ নম্বর ওয়ার্ড), পশ্চিম বাকলিয়া (১৭ নম্বর ওয়ার্ড), দক্ষিণ বাকলিয়া (১৯ নম্বর ওয়ার্ড), পাথরঘাটা (৩৪ নম্বর ওয়ার্ড), দক্ষিণ হালিশহর (৩৯ নম্বর ওয়ার্ড) ও দক্ষিণ পতেঙ্গা (৪১ নম্বর ওয়ার্ড)।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম জানান, নগরীর আটটি এলাকাকে হটস্পট হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। বায়েজিদ, পতেঙ্গা, কোতোয়ালী, আন্দরকিল্লা, হালিশহর, বাকলিয়াসহ এলাকাগুলোতে বিশেষ করে মশার ওষুধ ছিটানোর জন্য আমরা চিঠি কর্পোরেশনকে চিঠি দিয়েছি।

মাসজুড়ে সিটি কর্পোরেশনের ক্যাম্পেইন

দেশে সাধারণত জুন থেকে বর্ষা মৌসুম শুরু হয়। টানা বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগে সিটি কর্পোরেশনের খাল-নালার ময়লা পরিষ্কার, ঝোপঝাঁড় পরিষ্কার, মশার ওষুধ ছিটানোর মতো তেমন কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি বলে জানিয়েছেন বিভিন্ন এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা। ফলে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির মধ্যে ওষুধ ছিটালে তা ধুয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে বলে মনে করছেন তারা। তবে এর মধ্যে মাসজুড়ে ডেঙ্গু মোকাবিলায় বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন।

সিটি কর্পোরেশনের ম্যালেরিয়া ও মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. সরফুল ইসলাম (মাহি) বলেন, বর্ষার আগে ডেঙ্গু প্রতিরোধের জন্য আমরা সচেতনতামূলক কার্যক্রম হাতে নিয়েছি। মাসজুড়ে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন চলবে। পাশাপাশি নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডেই মশক নিধনের জন্য সকালে লার্ভিসাইড ও বিকেলে ফগিং বা অ্যাডাল্টিসাইড ছিটানোর কাজ ত্বরান্বিত করা হয়েছে।

ভবনের ছাদে বেশি ঝুঁকি

চট্টগ্রামে নগরের ভবনের ছাদ এডিস মশার প্রজননের নিরাপদ স্থান। বেশিরভাগ বাড়ির ছাদের কোণায়, ফুলের টবে, পরিত্যক্ত কোনো প্লাস্টিকে জমে থাকা পানিতে এডিস মশা সহজেই লার্ভা ছাড়ে। এছাড়া নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত ভবনের ছাদও এডিস মশার নিরাপদ প্রজননস্থল। সম্প্রতি স্বাস্থ্য বিভাগের এক জরিপে এমন চিত্র উঠে এসেছে। জরিপে দেখা গেছে, নগরের ৩৭০টি বাড়ির মধ্যে ৯৯টি বাড়িতে এবং ঘরে-বাইরে থাকা ৩৪৫টি পানির পাত্রের মধ্যে ১১৪টি পাত্রে এডিস মশার লার্ভা মিলেছে। এর মধ্যে লার্ভার সংখ্যা বা ঘনত্ব বায়েজিদ ও শেরশাহ এলাকায় বেশি পাওয়া গেছে।

মো. সরফুল ইসলাম (মাহি) বলেন, ‘চিহ্নিত হটস্পটগুলোতে এডিস মশার বিস্তার রোধে পরিত্যক্ত ও নির্মাণাধীন ভবনগুলোকে টার্গেট করে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। কারণ পরিত্যক্ত ভবনগুলোতে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার বিস্তার বেশি হয়।

আবহাওয়ার সতর্কবার্তা

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের কারণে দেশের সমুদ্রবন্দরগুলোতে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত চলছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা বন্দরকে এই সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামে রোববার (৫ জুলাই) রাত থেকে ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। ফলে মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যদি যদি আবহাওয়ার এই ধরন (উচ্চ আর্দ্রতা ও থেমে থেমে বৃষ্টিপাত) অব্যাহত থাকে, তবে অক্টোবরে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা শীর্ষে উঠতে পারে বলে মনে করছেন আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা।

আইএমই/ডিজে

ksrm