চট্টগ্রামে বিএনপির চার প্রার্থী মনোনয়ন হারানোর বড় ঝুঁকিতে, ভাগ্য ঝুলছে আপিলে
১৭০০ কোটির ঋণ থেকে হত্যা মামলার তথ্য গোপন
চট্টগ্রামের নির্বাচনী মাঠে হঠাৎ করেই উত্তাপ ছড়িয়েছে বিএনপির চার প্রার্থীর মনোনয়নপত্র নিয়ে। ঋণখেলাপির দায়, হলফনামায় তথ্যের গরমিল এবং ফৌজদারি মামলার তথ্য গোপনের মতো গুরুতর অভিযোগে তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার মুখে। বিশেষ করে উত্তর চট্টগ্রামের তিন প্রভাবশালী নেতার ওপর বাতিলের খড়গ ঝুলছে, যা স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন নাটকীয়তার জন্ম দিয়েছে। আগামী বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার নির্বাচন কমিশনের আপিল শুনানিতে নির্ধারিত হবে তারা নির্বাচনী লড়াইয়ে ফিরতে পারবেন কি না।

ঋণখেলাপের অভিযোগ হুম্মাম কাদের চৌধুরীর ওপর
চট্টগ্রাম-৭ আসনে বিএনপির প্রার্থী ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরীর মনোনয়নপত্র এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান পিপলস লিজিং এন্ড ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেসের পক্ষে সগীর হোসেন নির্বাচন কমিশনে তার বিরুদ্ধে আপিল করেছেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, হুম্মাম ওই প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে আর পরিশোধ করেননি। একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম প্রথমবারের মতো ভোটে দাঁড়িয়েই এই আইনি জটিলতায় পড়লেন। গত ৩ নভেম্বর দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পর গত ২৯ ডিসেম্বর তিনি মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন।
যদিও প্রাথমিক বাছাইয়ে এটি বৈধ হয়েছিল, তবে ঋণের তথ্য গোপনের বিষয়টি এখন সামনে চলে এসেছে। হলফনামায় তিনি বার্ষিক আয় প্রায় সাড়ে ১২ লাখ টাকা এবং ব্যক্তিগত অস্থাবর সম্পদ ৮৪ লাখ ২০ হাজার টাকা দেখালেও তার স্ত্রীর নামে পৌনে ৪১ কোটি টাকার সম্পদের পাহাড় রয়েছে বলে জানা গেছে। ধানমন্ডি ও চট্টগ্রামের রহমতগঞ্জে যৌথ মালিকানাধীন বিপুল সম্পত্তির কথা উল্লেখ থাকলেও ঋণের ঘরে তিনি কোনো তথ্য দেননি।
ঋণের ভারে জর্জরিত আসলাম চৌধুরীর ভাগ্য পরীক্ষা
সীতাকুণ্ড বা চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী মো. আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বাতিল চেয়ে আপিল করেছে ব্যাংক এশিয়া ও ট্রাস্ট ব্যাংক। এমনকি ওই আসনের জামায়াত প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিক চৌধুরীও তার বিরুদ্ধে পৃথক আপিল করেছেন। আনোয়ার সিদ্দিকের দাবি, আসলাম চৌধুরীকে ঋণখেলাপি ঘোষণা থেকে বিরত থাকতে আদালতের নির্দেশ থাকলেও শর্ত হিসেবে আগামী ৩১ জানুয়ারির মধ্যে ১৩টি ব্যাংকে ৫০ কোটি টাকা জমা দেওয়ার কথা ছিল, যা তিনি পালন করেননি। গত ৩ জানুয়ারি রিটার্নিং কর্মকর্তা তার মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করলেও এখন ব্যাংকগুলোর আপিলের কারণে তা হুমকির মুখে। আসলাম চৌধুরীর ৪শ ৫৭ কোটি টাকার সম্পদ থাকলেও ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ৭শ কোটি টাকা। তার বিরুদ্ধে এনআই অ্যাক্ট ও অর্থঋণসহ মোট ১৩২টি মামলা রয়েছে, যার মধ্যে ৮০টি এখনও বিচারাধীন।
মামলার তথ্য আড়াল করেছেন গিয়াস কাদের চৌধুরী
রাউজান বা চট্টগ্রাম-৬ আসনে বিএনপির প্রার্থী গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর পথও কণ্টকাকীর্ণ হয়ে উঠেছে। তার বিরুদ্ধে একটি হত্যাচেষ্টা মামলার তথ্য গোপনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। গত ১০ ডিসেম্বর ঢাকার গুলশান থানায় ফারজানা আন্না ইসলামকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলায় তিনি প্রধান আসামি। ওই মামলায় তার দুই ছেলে সামির কাদের চৌধুরী ও শাকির কাদের চৌধুরীও আসামি হিসেবে রয়েছেন। হলফনামায় এই মামলার তথ্য না থাকায় তার মনোনয়ন বাতিলের সম্ভাবনা জোরালো হয়েছে।
এর আগে গত ৩০ জুলাই দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বিএনপির প্রাথমিক সদস্যসহ সব পদ থেকে তাকে স্থগিত করা হয়েছিল। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে ২২টি মামলার মধ্যে ১৭টিতে খালাস পেলেও ৫টি মামলা বিচারাধীন। তার ২৫ কোটি ৭৯ লাখ টাকার সম্পদ থাকলেও মামলার তথ্য গোপন করা নির্বাচনী আইনের দৃষ্টিতে বড় অপরাধ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জসীম উদ্দিনের হলফনামায় অসঙ্গতি ও হত্যা মামলার ছায়া
চন্দনাইশ বা চট্টগ্রাম-১৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী জসীম উদ্দিন আহমেদের মনোনয়নপত্র চ্যালেঞ্জ করেছেন এলডিপির প্রার্থী ওমর ফারুক। তার অভিযোগ অনুযায়ী, জসীম উদ্দিন সোনালী ব্যাংকের ঋণখেলাপির তথ্য গোপন করেছেন এবং হলফনামায় আয়ের উৎসের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ বিপুল নগদ অর্থ প্রদর্শন করেছেন। এমনকি ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত একটি হত্যা মামলার তথ্যও তিনি যথাযথভাবে উপস্থাপন করেননি।
সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীর আহমেদের ঘনিষ্ঠ ক্যাশিয়ার হিসেবে আলোচিত জসীম উদ্দিনের বিরুদ্ধে সোনালী ব্যাংকের মতিঝিল শাখা থেকে তড়িঘড়ি করে আনা আংশিক নথির মাধ্যমে ঋণখেলাপির অবস্থা বৈধ করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে আপিলে উল্লেখ করা হয়। এই চার প্রার্থীর ভাগ্য এখন নির্বাচন কমিশনের আপিল বেঞ্চের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।




