চট্টগ্রামে ‘ফটোকপি’ ছাত্রলীগে অলিগলি ভরা, বিবাহিত-চা দোকানিও কেন্দ্রের পদে

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ৩০তম সম্মেলনের আগে ‘ফটোকপি’ কমিটি নিয়ে তোপের মুখে পড়তে হয়েছে সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে। রাজধানীতে তাদের অবরুদ্ধও করে রাখা হয়েছে। স্কুলের গণ্ডি পেরোনো কিশোর থেকে শুরু করে সদ্য বিবাহিত, গার্মেন্টস শ্রমিক, চায়ের দোকানদারও রয়েছেন এই কমিটিতে।

অথচ একসময় যেখানে প্রতিটি জেলা থেকে হাতেগোনা দু-একজন কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা হতে পারতেন, সেখানে এবার ফটোকপির বদৌলতে অলিগলি থেকে হয়েছেন কেন্দ্রীয় নেতা।

সৌরভ পাল, বর্তমানে ছাত্রলীগের কোনো পদ-পদবি না থাকলেও তিনিও হয়েছেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক। ধুমধাম করে তিনি বিয়েও করেছেন মাস ছয়েক আগে। অথচ গঠনতন্ত্রে উল্লেখ আছে, বিবাহিতরা হতে পারবে না ছাত্রলীগ নেতা।

বিয়ের পরও কিভাবে নেতা হলেন—জানতে সৌরভকে ফোন করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন তিনি। তবে সৌরভের বিয়ের দাওয়াত খেয়েছেন, এমন অনেক ছাত্রলীগ নেতাও তার এমন প্রাপ্তিতে ফেসবুকে অভিনন্দন জানাতে ভুল করেননি।

এদিকে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে চট্টগ্রাম নগরীর ২ নম্বর ওয়ার্ডের দু’জন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতারা ব্যানারে। তাদের একজন সদ্য স্কুলের গণ্ডি পেরোনো, আরেকজন গার্মেন্টসের চাকরিজীবী। তারা হলেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের কার্যনির্বাহী সদস্য সাব্বির আহম্মদ তামিম এবং সহ-সম্পাদক শফিউল আলম রিয়াদ।

জানা গেছে, মাত্র দুই টাকায় ফটোকপি করে ছাত্রলীগের খালি প্যাডে নিজেদের নাম ও পদবি লিখে ফেসবুকে প্রচার করে তারা হয়েছেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা।

Yakub Group

এমনকি প্রধানমন্ত্রীর চট্টগ্রাম আগমন উপলক্ষে এই দু’জন ছাত্রলীগের ‘ফটোকপি পদ’ লাগিয়ে টাঙিয়েছেন বিশাল ব্যানারও।

সৌরভ, রিয়াদ বা সাব্বির নন—এমন ভুয়া পদবিতে সয়লাব নগরীর অলিগলি। ফটোকপি করে নিজেদের নেতা দাবি করা এসব নেতাদের জন্য বিপাকে পড়ছেন কেন্দ্রীয় সভাপতি জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখকের ‘অরিজিনাল’ সুপারিশকৃত নেতারা।

এদিকে নেতা হওয়ার প্রতিযোগিতায় বাদ পড়েননি চায়ের দোকানি মো. জুয়েল হোসেন। নিজেকে ছাত্রলীগের ‘সহ-সম্পাদক’ দাবি করলেও তিনি মুরাদপুর এলাকায় করেন চায়ের দোকান।

তবে এসব নেতা অরিজিনাল হোক বা ফটোকপি, সবার দাবি একটাই—তারা সংগঠনের জন্য শ্রম দিয়েছেন। তাই শ্রমের বিনিময়ে কেন্দ্রীয় নেতা হয়েছেন।

এদিকে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের স্বাক্ষরে যে চিঠির মাধ্যমে তাদের কেন্দ্রীয় কমিটিতে অন্তর্ভুক্তির কথা জানানো হচ্ছে, সেই স্বাক্ষরের তারিখটি হলো ‘৩১-৭-২০২২’। তাই তৃণমূল নেতাকর্মীদের দাবি, এতদিন এরা কোথায় ছিল? পাঁচ মাস আগে নেতা হলেও তারা কেন এখন আত্মপ্রকাশ করছেন?

কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক ও চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত তিন নেতার একজন নবী আলম। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে জানতে আপনি জয়-লেখককে ফোন দেন। আমাকে ফোন দিচ্ছেন কেন, কমিটি কি আমি দিছি?’

নগর ছাত্রলীগের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার পর তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম মহানগরের দায়িত্বে ছিলাম, কিন্তু কি করতে পেরেছি? আমরা কি একটা সম্মেলন করতে পেরেছি? থানার সম্মেলন করার মতোও যোগ্যতা নেই ওদের। আমি নিজের ফেসবুকেও লিখেছি যে, নগর ছাত্রলীগের কমিটি দরকার, কিন্তু তারাতো কেউ আমাদের কথা শুনেনি।’

এরপর অনেকটা জয়-লেখকের ওপর বিব্রত ও ক্ষোভ দেখিয়ে সংযোগ কেটে দেন কেন্দ্রীয় এই ছাত্রনেতা।

চট্টগ্রামের কেন্দ্রীয় নেতার সংখ্যা জানতে যোগাযোগ করা হয় নগর ছাত্রলীগের আরেক দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা সোহেল রানা শান্তের সঙ্গে। তিনিও কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সম্পাদক। নবী আলমের সঙ্গে সুর মিলিয়ে তিনি বলেন, ‘জয়-লেখক জানে, ওরা কতজনকে নেতা বানিয়েছে।’

এ বিষয়ে আরও জানতে চাইলে নিজেকে ‘সাবেক নেতা’ পরিচয় দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি ২২-১০-২২ তারিখে পদ থেকে অব্যাহতি নিয়েছি, তাই এ বিষয়ে কথা বলা ঠিক হবে না।’

সাবেক হিসেবে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের ‘ফটোকপি নেতা’ হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপনার মত এ রকম অনেক সাংবাদিক আমার থেকে বিষয়টি জানতে চান, কিন্তু এমন প্রশ্নে আমি বিব্রত ও লজ্জিত। কারণ সংগঠন চলবে নিয়ম মেনে। কিন্তু ওরা যা করছে তা দুদিন ছাত্রলীগ করা কর্মীও বলবে, ঠিক হয়নি।’ তিনি এ বিষয়ে নগরের দায়িত্বে থাকা আরেক নেতা প্রদীপ চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।

কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ চৌধুরীও ‘এ বিষয়ে জয়-লেখক জানেন’ বলে জানান।

কতজন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের পদ পেয়েছেন—জানতে চাইলে নগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া দস্তগীর বলেন, ‘আমি মাত্র তিনজনের বিষয়ে কনফার্ম হয়েছি। বাকিদের বিষয়ে জানি না, আমি কেন্দ্রে কথা বলছি, তারা আমাকে মহসিন কলেজের একজন এবং এমইএস কলেজের দু’জনের কথা জানিয়েছেন।’

তিনি বলেন, ‘যারা নেতা হয়েছেন, তাদের একটা তালিকা যদি প্রকাশ হয় তবে ভুয়া যারা, তারা সংগঠনের সম্মান নষ্ট করতে পারবে না।’

ডিজে

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ksrm