চট্টগ্রামে নিরবে বিদ্যুৎ চুরি করছে বড় সব শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ১৭ ভাগ বিদ্যুৎ ‘হাওয়া’ এক বছরে

অফিসে বসেই ‘কাজ’ সেরে নেয় পিডিবির অডিটিং ইউনিট

চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) অডিটিং ইউনিটের কর্মকর্তারা অডিটের কাজ করেন অফিসে বসেই। তাদের দায়সারা ভাবের কারণে বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো নীরবে বিদ্যুৎ চুরি করে যাচ্ছে। গত এক বছরে মাত্র চারটি প্রতিষ্ঠানে অডিট করেছে পিডিবির অডিটিং কর্মকর্তারা। এর ফলে ২০২২ সালে পিডিবির সিস্টেম লসের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৭ শতাংশ। এরমধ্যে ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠানের সিস্টেম লসের পরিমাণ ছিল এর দ্বিগুণ। এসব অনিয়ম ঠিক না করেই সম্প্রতি বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুতের দাম।

তবে পিডিবি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, পর্যাপ্ত কারিগরি লোকবলের অভাবেই এনার্জি অডিটিং ঠিকভাবে হয় না। রিমোর্ট মিটারিং সিস্টেম চালু হলে অফিসে বসেই শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসেব জানা যাবে।

সর্বশেষ অর্থনৈতিক সমীক্ষার দেওয়া বিদ্যুৎ বিভাগের পরিসংখ্যান মতে, দেশে বছরে মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ১৪ দশমিক ১৩ শতাংশই সিস্টেম লসের কবলে পড়ছে। এরমধ্যে বিতরণের সময় ১১ দশমিক ৯৬ শতাংশ এবং সঞ্চালনের সময় নষ্ট হয় ২ দশমিক ১৭ শতাংশ। গত অর্থবছরে দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছিল ৪২ হাজার ১৯৫ মিলিয়ন কিলোওয়াট। এর ১৪ দশমিক ১৩ শতাংশ হিসেবে সিস্টেম লসের কবলে পড়েছে ৫ হাজার ৯৬২ কিলোওয়াট আওয়ার।

মূলত এনার্জি অডিটিং ইউনিটের নিষ্ক্রিয়তার জন্যই চট্টগ্রামের ১১ হাজার ভোল্টেজ ব্যবহারকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ চুরি বেড়েই চলেছে। গত বছরের জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সিস্টেম লসের পরিমাণ ছিল গড়ে ১৭ শতাংশ। শুধুমাত্র ডিসেম্বরেই ইউনিট-১ এর ৭টি ডিভিশনে সিস্টেম লস ছিল ২৫ থেকে ২৭ শতাংশ।

চট্টগ্রাম পিডিবির এনার্জি অডিটিং বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম জোনের ১৬টি ডিভিশনের বিদ্যুতের ব্যবহার তদারকি, মনিটরিংয়ের জন্য এনার্জি অডিটিংয়ের তিনটি ইউনিট রয়েছে। কোথায় এনার্জি কত যাচ্ছে, কি পরিমাণ আমদানি-রপ্তানি হচ্ছে, তা নিরূপণ করার কথা এই বিভাগের। মিটারের যেকোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি এবং মেরামত এই বিভাগের কাজ।

২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এনার্জি অডিটিং কর্মকর্তারা মাত্র চারটি প্রতিষ্ঠানে অডিট করতে গিয়েছেন।

Yakub Group

চট্টগ্রামের এনার্জি অডিটিং ইউনিট-১ এর মধ্যে রয়েছে ফৌজদারহাট, পাহাড়তলী, রামপুর, খুলশী, আগ্রাবাদ ও হালিশহর। এনার্জি অডিটিং ইউনিট-১ প্রতিমাসে জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করছে ১১ কোটি ইউনিট। ইউনিট-২ আমদানি করছে ৮ কোটি ইউনিট এবং ইউনিট-৩ করছে ৫ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ।

জানা গেছে, সবচেয়ে বেশি ভোল্টেজের বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী গ্রাহক আছে ইউনিট-১-এ। এখানে ১৩২ কিলোবাইটের (কেবি) গ্রাহক তিন শিল্প প্রতিষ্ঠান। যারা সরাসরি জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ নেয়। শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে বিএসআরএম, আবুল খায়ের ও শীতলপুর স্টিল। তবে প্রতিষ্ঠানগুলোর অডিট কার্যক্রম পরিচালনাও অডিটিং বিভাগের দায়িত্ব। এসব শিল্প প্রতিষ্ঠান ১১ হাজার ভেল্টেজের বিদ্যুৎ ব্যবহার করে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নত দেশে সিস্টেম লস ৫ থেকে ৬ শতাংশ, বাংলাদেশে ৭ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে তা সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব। শুধু সিস্টেম লসই নয়, বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ অবৈধ সংযোগে ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে বিদ্যুতের উৎপাদন ও বিতরণ ব্যয়ও বাড়ছে। আর তা সমন্বয় করতে গ্রাহক পর্যায়ে দাম বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। গ্রাহক কম দামের বিদ্যুৎ বেশি দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছে।

অভিযোগ আছে, বড় গ্রাহকের আঙিনায় গিয়ে তারা কত বিদ্যুৎ ব্যবহার ও চুরি করছে; তা যাচাই করতে যান না এনার্জি অডিটিং ইউনিটের কর্মকর্তারা।

এরমধ্যে উৎকোচের বিনিময়ে মিটার রিডিংয়ে কারচুপি, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগও সিস্টেম লসের খাতায় ফেলার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া বিদ্যুতের ট্রান্সফরমার ও পাওয়ার স্টেশনে যান্ত্রিক ত্রুটি, দুর্বল সঞ্চালন লাইনের কারণে বিদ্যুতের অপচয়কেও ধরা হয় সিস্টেম লস হিসেবে।

আরও জানা গেছে, বিদ্যুতের মিটার চেক করার জন্য এই বিভাগের নিজস্ব কোনো কারিগরি লোক নেই। এনার্জি অডিটিং ইউনিটে সহকারী প্রকৌশলী ৪ জনের জায়গায় ১ জন ও উপ সহকারী প্রকৌশলী ৫ জনের মধ্যে রয়েছে ১ জন।

এদিকে ২০২২ সালের ৪ অক্টোবর জাতীয় গ্রিড বিপর্যয়ের প্রধান কারণ হিসেবে ন্যাশনাল লোড ডেসপ্যাচ সেন্টারের (এনএলডিসি) নির্দেশনা না মানার কথা উল্লেখ করেছিল পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তদন্ত কমিটি। এটিসহ গ্রিড বিপর্যয়ের পেছনে তারা ৩ কারণের কথা জানায়। তাদের মতে, এনএলডিসির নির্দেশনা অনুযায়ী বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো লোড না কমানো সেদিনের গ্রিড বিপর্যয়ের মূল কারণ।

অন্যান্য কারণগুলো হলো—ঘোড়াশাল গ্রিড সাবস্টেশনের সক্ষমতার বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করা ও চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি স্টিল কারখানা সরাসরি জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ ব্যবহার করায় চাহিদা বেড়ে যাওয়া।

চট্টগ্রাম পিডিবি’র প্রধান প্রকৌশলী রেজাউল করিম চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘কারিগরি সহায়তার অভাব ও লোকবল স্বল্পতার জন্যই এনার্জি অডিটিং সম্ভব হয় না। বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান অহরহ বিদ্যুৎ চুরি করলেও আমরা তা ধরতে পারছি না। এজন্য রিমোর্ট মিটারিং সিস্টেম চালুর কথা ভাবা হচ্ছে। তাহলে অফিসে বসেই এই যন্ত্রের সাহায্যে এসব শিল্প প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসেব জানা যাবে। এটা না হলে কোনোভাবেই বিদ্যুৎ চুরি ঠেকানো সম্ভব না।’

এর আগে গত ১২ জানুয়ারি থেকে দেশে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের খুচরা দাম ইউনিট প্রতি ১৯ পয়সা বাড়ানো হয়েছে। গত ৮ জানুয়ারি বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ওপর গণশুনানির আয়োজন করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। তাতে বিদ্যুৎ বিতরণকারী ছয় প্রতিষ্ঠান দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব উত্থাপন করে। ওই শুনানিতে বিদ্যুতের দাম ১৫.৪৩ শতাংশ বৃদ্ধির সুপারিশ করেছিল বিইআরসির কারিগরি কমিটি।

ডিজে

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ksrm