চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর নতুন দুশ্চিন্তা ‘শক সিনড্রোম’, এক মাসে ৬ মৃত্যু

ছয় মাসে আক্রান্ত ৫৭৯, মৃত ৯

চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের দেখা দিচ্ছে ‘শক সিনড্রোম’। শুধুমাত্র চলতি বছরের জুনে ২৪৮ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। এছাড়া গত ছয় মাসে মারা গেছেন ৯ জন। এরমধ্যে ৬ জনই গত জুন মাসে মারা গেছেন শক সিনড্রোমে আক্রান্ত। বাকি ৩ জনের মৃত্যু হয় জানুয়ারিতে।

চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতিদিন বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে ২৪ জন। চলতি বছরের শুরু থেকে সোমবার (৩ জুলাই) পর্যন্ত সরকারি ও প্রাইভেট ক্লিনিকে ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিয়েছে ৫৭৯ জন।

চলতি বছর চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত শক সিনড্রোমের ধরন মিলেছিল চলতি বছরের ৭ জুন পার্কভিউ হাসপাতালে। সেখানে মারা যান ৪০ বছর বয়সী সাকিবুল হাসান। তার বাবা মোসাদ্দেক হাসান চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমার ছেলে জ্বরের শুরু থেকেই খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছিল। পানিও খেতে পারত না, বমি করতো সারাদিন। আমরা জ্বরের দ্বিতীয়দিনেই পার্কভিউ হাসপাতালে ভর্তি করি। কিন্তু ছেলেকে বাঁচানো যায়নি।’

ডাক্তারের বরাত দিয়ে সাবিকুলের বাবা জানান, তার ছেলে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে শক সিনড্রোমে মারা গেছে। মৃত্যুর কারণ হিসেবে এটাই মৃত্যু সনদে উল্লেখ ছিল।

ডেঙ্গু ও শক সিনড্রোমের বিষয়ে ডাক্তাররা জানান, ডেঙ্গুর চারটি ধরন রয়েছে। যারা আগে একবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন এবং দ্বিতীয়বার এই চারটি ধরনের অন্য একটিতে আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের ঝুঁকি অনেক বেশি। তারাই মূলত শক সিনড্রোমে চলে যান বেশি।

জানা গেছে, ডেঙ্গু শক সিনড্রোম হলে শ্বাস-প্রশ্বাসে অসুবিধা কিংবা গতি বেড়ে যায়। ত্বক শীতল হয়ে যায়, ত্বকের ভেতরের অংশে রক্তক্ষরণের কারণে ত্বকের ওপর লাল ছোপ হয়। বমি, মল কিংবা প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত যাওয়া, প্রচণ্ড পেটব্যথা ও অনবরত বমি হওয়া, নাক ও দাঁতের মাড়ি থেকে রক্তক্ষরণ, অবসাদ দেখা দেয়। দ্বিতীয়বার ডেঙ্গুর অন্য ধরনে আক্রান্ত হলে শরীরে এক ধরনের প্রতিক্রিয়া হয়। এতে পালস, রক্তচাপ কমে যায়, শরীরে বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে রক্ত চলাচল কমে যায়; বিভিন্ন অঙ্গের কোষে যে অক্সিজেন দরকার, সেই অক্সিজেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এমন অবস্থায় ব্রেইন, হার্ট, কিডনিতে রক্ত ও অক্সিজেন পৌঁছাতে না পেরে ধীরে ধীরে কাজ বন্ধ হয়ে যেতে থাকে।

Yakub Group

ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী শক সিনড্রোম হলে তাকে বাঁচানো কঠিন বলেও জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। যারা আগে থেকেই বড় কোন অসুখে ভুগছেন, যাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম তাদেরও শক সিনড্রোমের ঝুঁকি বেশি।

এই বিষয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেলের মেডিসিন বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. সূযত পাল বলেন, ‘একজন সুস্থ মানুষের শরীরে দেড় লাখ থেকে চার লাখ প্লাটিলেট থাকে। শরীরে রক্তজমাট বাধার ক্ষেত্রে প্লাটিলেট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্লাটিলেট যখন ২০ হাজারের নিচে নেমে যাবে, তখন রক্তজমাট বাধার প্রক্রিয়া নিষ্ক্রিয় হয়ে শরীরের বিভিন্ন জায়গা থেকে রক্ত বের হতে থাকে।’

চট্টগ্রাম মেডিকেলের মেডিসেন বিভাগের অধ্যাপক ডা. অনিরুদ্ধ ঘোষ জয় চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘ডেঙ্গুর চারটি ধরন রয়েছে। যারা আগে একবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন এবং দ্বিতীয়বার এই চারটি ধরনের অন্য আরেকটিতে আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের ঝুঁকি অনেক বেশি। তারাই মূলত শক সিনড্রোমে চলে যান বেশি।’

চট্টগ্রাম মেডিকেলের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম আহসান বলেন, ‘ডেঙ্গু পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে পর্যাপ্ত কিট আছে। চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসা নির্দেশিকা সরবরাহ করা হয়েছে চিকিৎসকদের। সরকারি প্রতিষ্ঠানে ডেঙ্গু পরীক্ষার ফি ১০০ টাকা, বেসরকারি হাসপাতালে ৩০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে।’

এদিকে গত বছরের তুলনায় চলতি বছরের ডেঙ্গু রোগীর বাড়তি চিত্র উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন কার্যালয়ের জেলা কীটতত্ত্ববিদ এনতেজার ফেরদাউছ। তিনি বলেন, ‘গত বছর এমন সময়ে কিছু ডেঙ্গু রোগী থাকলেও তখন এবারের মতো আক্রান্ত হয়নি। কিছুদিন আগে বৃষ্টিতে বাসা-বাড়িতে যে পানি জমে ছিল তাতেই এডিস জমা জন্ম নিয়েছে। মশা নিধন ব্যবস্থা আগের মত থাকায় পরিস্থিতির উন্নতিই হয়নি। থেমে থেমে যে বৃষ্টি হচ্ছে, এতে ডেঙ্গু আরও মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। এই অবস্থায় মশারি টাঙানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।’

ডিজে

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!