চট্টগ্রামে চিরকুটে চাঁদাবাজি, নেপথ্যে শিবির ক্যাডার সাজ্জাদের সহযোগী

অন্যের নাম ব্যবহার করে অভিনব কায়দা চাঁদাবাজি চলছে চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ এলাকায়। এই ধরনের চিরকুট বিভিন্ন ব্যক্তি থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠানে পৌঁছে যাচ্ছে। এসবের পেছনে রয়েছেন আলী আকবর নামের এক ব্যক্তি। নিজেকে তিনি ঢাকাইয়া আকবর হিসেবে পরিচয় দেন। এছাড়া শিবির ক্যাডার সাজ্জাদের সহযোগী ছিলেন তিনি। আগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন চাঁদাবাজি মামলায়। চিরকুট দেওয়ার পর টাকা না পেলে দেওয়া হয় মুঠোফোনে হুমকিও।

চট্টগ্রাম প্রতিদিনের অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে এমন কিছু চিরকুট। এর মধ্যে একটি চিরকুটে লেখা আছে, ‘আমি সরোয়ার বাবলা আমাকে ৫,০০,০০০ টাকা না দিলে আমি সব জ্বালিয়ে দিব।’ এতে যুক্ত করা হয়েছে মো. সরোয়ার হোসেন বাবলার পূর্বের ব্যবহৃত অচল ফোন নম্বর। এমনকি ফোন কলেও ব্যবহার করছেন সরোয়ারের নাম।

এসব বিষয়ে ভুক্তভোগী বাবলা অভিযোগ দিয়েছেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনারের কাছে। গত সোমবার (১১ সেপ্টেম্বর) এই অভিযোগ করেন তিনি।

মো. সরোয়ার হোসেন বাবলা অভিযোগে উল্লেখ করেন, একাধিক মিথ্যা মামলায় দীর্ঘদিন কারাভোগ করে আদালত বিবেচনায় ১০টি মামলায় খালাস পেয়ে পাঁচ মাস আগে জামিনে মুক্তি পান তিনি। বর্তমানে তিনি সমাজ ও জনহীতকর কার্যকলাপে নিয়োজিত রয়েছেন। এছাড়া সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ থেকে শুরু করে স্থানীয় কাউন্সিলর ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা করছেন। তার এমন ভাল কার্যলাপ দেখে বায়েজিদ থানার চালিতাতলী পূর্ব মসজিদ জব্বার সওদাগরের বাড়ির মঞ্জু মিয়ার ছেলে আলী আকবর ওরফে ঢাকাইয়া আকবর ওরফে টোকাই আকবর তার নাম ও ফোন নম্বর ব্যবহার করে চিরকুটের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদা দাবি করছেন। ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে এসব বিষয় জানার পর তিনি সমাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হন। এর ফলে আইনি প্রতিকারের জন্য সিএমপি কমিশনারের দ্বারস্থ হয়েছেন।

অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০২২ সালের ৪ সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর চট্টগ্রাম নগরসহ জেলার বিভিন্ন থানায় সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি ও অস্ত্র মামলায় দীর্ঘ দু’বছর কারাবাস করে জামিনে বেরিয়ে আসেন। মুক্ত হয়ে তিনি আগের মতই অপরাধকর্মে জড়িয়ে পড়েছেন।

জানা গেছে, ২০২০ সালের ২০ এপ্রিল চট্টগ্রাম নগরের বিবিরহাট এলাকার দুবাই প্রবাসী নূরুল আবছার ও নুরুল আক্কাসের চান্দগাঁও থানা এলাকায় একটি বাড়ি করছিলেন। সেই নির্মাণাধীন বাড়ির জন্য আন্তর্জাতিক রেড নোটিশ খাওয়া সন্ত্রাসী সাজ্জাদ খান চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা না পেয়ে ওই বছরের ২১ এপ্রিল রাতে আলী আক্কাসদের বাসায় পেট্রোল বোমা মারে সন্ত্রাসীরা। এই ঘটনায় থানায় একটি মামলা দায়ের হয়। এই মামলায় সেই আকবর ও ফিরোজকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। নগরীর বায়েজিদ বোস্তামি, চান্দগাঁও ও পাঁচলাইশ থানায় আকবরের নামে রয়েছে একাধিক মামলা। এর আগে ২০১৭ সালের ২ আগস্ট বায়েজিদ থানা পুলিশ দুটি এলজি ও ৬ রাউন্ড কার্তুজসহ আকবরকে গ্রেপ্তার করে। এসময় এক পুলিশ সদস্যকে কামড়ে আহত করেন আকবর।

এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে নগরের বায়েজিদ থানার চালিতাতলী এলাকায় সরেজমিনে পরিদর্শন করে জানা গেছে, এলাকাবাসী থেকে শুরু করে চায়ের দোকানির অভিযোগের তীর আকবরের দিকে। তার বাবা মঞ্জু মিয়ার বাড়ি রাজধানী ঢাকায় হওয়ায় তাকে ঢাকাইয়া বলে সম্বোধন করতেন এলাকাবাসী। পরবর্তীতে এই টাইটেল যুক্ত হয় আকবরের নামে। এছাড়া ছিঁচকে চাঁদাবাজির কারণে অনেকে তাকে টোকাই আকবর বলেও সম্বোধন করেন। তবে ভুক্তভোগীরা জানান, আওয়ামী লীগের এক নেতার ছত্রছায়ায় দাপটে চলছেন আকবর। সাধারণ মানুষ ভয়ে কিছু বলতে চান না তার বিরুদ্ধে।

চান্দগাঁও থানা এলাকার এক শিক্ষক জানান, সরোয়ারের নাম ব্যবহার করে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন ফোন কলে। পরে এই বিষয়ে সরোয়ারকে জানানো হলে তিনি থানায় অভিযোগ করতে বলেন। তবে আমরা অভিযোগ করিনি। সরোয়ার ভাই এখন আছেন, কিছুদিন পর তিনি না থাকলে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে পারে। আমি শিক্ষক মানুষ, কোনো ঝামেলায় জড়াতে চাই না।

মোহাম্মদ সিদ্দিক মিয়া নামের এক ভাঙারি ব্যবসায়ীর কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে এক লাখ ৭০ হাজার টাকা চাঁদা নিয়েছেন আকবর। এসব হিসেব তার কাছে লিখিত রয়েছে। তিনি বলেন, ‘করোনার সময় লকডাউনের তিনদিন পর আমার কাছ থেকে ২৫ হাজার টাকা চাঁদা নিয়ে গেছেন আকবর। এছাড়া চাঁদার দাবিতে আমার প্রতিষ্ঠানে তালা ঝুলিয়ে দেন। পরে ২০ হাজার টাকা দিয়ে সেই তালা খুলতে হয়েছে। গত তিন মাস আগে সরোয়ার বাবলার নামে নিয়ে গেছে ৫০ হাজার টাকা। আবারও চাঁদা দাবি করলে টাকা দিতে নারাজি জানালে পায়ে গুলি করবে বলেও হুমকি দেয়।’

অন্য এক ভুক্তভোগী নিজাম নামের এক ঠিকাদার বলেন, ‘একটি ঠিকাদারি কাজ করতে গিয়ে আকবরের রোষানলে পড়েছি। সে ফোন করে জানায়, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে কিছু করতে গেলে তাকে চাঁদা দিতে হবে। অন্যথায় কাজ বন্ধ করে দিবেন। এসময় আমার কাছ থেকে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন কথিত স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা আকবর। এছাড়া সেইসময় আকবর বলেন, ‘সামনে নির্বাচন, সরকারের প্রচুর টাকা প্রয়োজন। তাই টাকা দিতে হবে।’

নগরীর বায়েজিদ থানার হাজী পোল এলাকায় রড-সিমেন্টের দোকান মক্কা এন্ট্রপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. আলাউদ্দিন বলেন, ‘দোকানের পাশে একটি জমির সীমানা প্রাচীর তৈরির একটি কাজ করছিলাম। এসময় এই কাজের জন্য চাঁদা দাবি করেন আকবর। লাখ টাকার নিচে সমাধান করা হবে না বলেও জানান। পরে চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি কর্মরত শ্রমিকদের মারধর করে কাজের সরঞ্জাম নিয়ে যান তিনি। এই ঘটনায় ২৪ জানুয়ারি একটি সাধারণ ডায়েরিও করা হয়েছে।’

এদিকে নগরীর চান্দগাঁও থানার বেপারিপাড়া এলাকায় সাবরিনা এগ্রোতে একটি চিরকুট দেন আকবর। এসময় তার পাঠানো দু’জনকে দেখা যায় সিসিটিভি ফুটেজে। এগ্রোর কর্মচারী নূর মোহাম্মদ জানান, দুপুরে তিনি ঘুমাচ্ছিলেন। এসময় এক ছেলে এসে তাকে বলেন, এই চিরকুট যেন তার মালিককে দেন। তিনি এটি না নিতে চাইলে তাকে হুমকি দিয়ে চিরকুটটি রেখে যায় সে। সেই চিরকুটেও ব্যবহার করা হয়েছে সরোয়ার বাবলার নাম।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে আলী আকবরের মুঠোফোনে একাধিকার বার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

আরএস

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!