চট্টগ্রামে ওসি হেনস্তায় মন্ত্রীর সাবেক বডিগার্ডের চাকরি গেল, তটস্থ থাকতেন বড় পুলিশও

শিক্ষা উপমন্ত্রীর সাবেক বডিগার্ড সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) সন্তু শীলকে অবশেষে চাকরিচ্যূত করা হয়েছে। চট্টগ্রামের তিন ওসির সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা ছাড়াও বিভিন্ন অপকর্মে এই এএসআইয়ের নাম জড়িয়ে ছিল। সর্বশেষ তিনি চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালী থানার সাবেক ওসি (বর্তমানে চান্দগাঁও থানায়) জাহিদুল কবিরকে ধাক্কা মেরে আহত করেন।

রোববার (২৩ জুন) বিষয়টি নিশ্চিত করে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের (সিএমপি) উপ-কমিশনার আবদুল ওয়ারীশ বলেন, ‘বিভাগীয় মামলায় অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় এএসআই সন্তুকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়েছে।’

প্রায় ৪ বছর ধরে এএসআই সন্তু শীল শিক্ষা উপমন্ত্রী (বর্তমানে শিক্ষামন্ত্রী) মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের দেহরক্ষী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল সাংসদ হয়ে উপমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই সন্তু শীল তার দেহরক্ষী কাজ করে আসছিলেন। এ সময় তিনি চট্টগ্রামের বিভিন্ন থানার ওসিদের কাছে তদবিরবাণিজ্য করতেন। তার চলাফেরা ছিল বেপরোয়া। পুলিশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। এ সময় তিনি নানা ধরনের অপকর্মে জড়িয়ে পড়লেও প্রভাব খাটিয়ে পার পেয়ে যেতেন। মন্ত্রীর দেহরক্ষী হওয়ায় সিএমপিতে অনেক উর্ধতন পুলিশ কর্মকর্তাও তাকে সমীহ করে চলতেন।

এর আগেও তার বিরুদ্ধে কোতোয়ালি থানার সাবেক ওসি নেজাম উদ্দিন, পটিয়া থানার ওসি প্রিটন সরকার, বন্দর থানার সাবেক ওসি জাহিদুল কবিরের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগ রয়েছে। ওসি নেজাম উদ্দিন তার বিরুদ্ধে ২০১৯ সালে জিডি করেছিলেন। এছাড়া বায়েজিদ থানার সাবেক ওসি (বর্তমানে সাতকানিয়া থানার ওসি) প্রিটন সরকারের সঙ্গেও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে সন্তু শীলের বিরুদ্ধে।

সন্তু শীলের বিরুদ্ধে সোনার বার ছিনতাইয়ে জড়িত থাকারও অভিযোগ ছিল। ২০১৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর নগরের হাজারীলেইনে সোনা ব্যবসায়ী দোলন বিশ্বাস তার কাছ থেকে ১০২ ভরি সোনা ছিনতাইয়ের অভিযোগ এনে চট্টগ্রামের কোতোয়ালী থানায় মামলা করেন। মামলা তদন্তের সময় বাদী দোলন বিশ্বাস এএসআই সন্তু শীলকে শনাক্ত করার পর তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল।

২০১৯ সালের ১৬ মে উপমন্ত্রী নওফেলের দেহরক্ষী থাকাকালে মাদক আইনের ছয়টি মামলার পরোয়ানাভুক্ত এক আসামিকে গ্রেফতার করায় ওই আসামির পক্ষ নিয়ে বাকলিয়া থানার তৎকালীন ওসি নেজামের সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহার করেন এএসআই সন্তু শীল। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে বাকলিয়া থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন ওসি নেজাম।

২০২৩ সালের ২০ এপ্রিল চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালী থানার পাথরঘাটা এলাকায় উপমন্ত্রী নওফেল নিজ সংসদীয় আসনে ঈদ সামগ্রী বিতরণ করতে গেলে ওসি জাহিদুল কবিরকে ধাক্কা দেন এএসআই সন্তু শীল। এ ঘটনায় নিজ থানায় জিডি করেন ওসি জাহিদুল। তদন্তে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। গত বছরের ২ মে পুলিশ সদর দপ্তরের এক আদেশে তাকে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের বিশেষ শাখা (সিটিএসবি) থেকে খুলনা রেঞ্জে বদলি করা হয়।

এএসআই সন্তু চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) থেকে প্রথমে খুলনা রেঞ্জে যোগ দেন। রেঞ্জ কার্যালয় থেকে তাকে বাগেরহাট জেলা পুলিশে যোগ দিতে বলা হয়। এরপর জেলা পুলিশের নির্দেশে তিনি ফকিরহাট মডেল থানায় যোগ দেন।

চট্টগ্রামের কোতোয়ালী থানার ওসিকে ধাক্কা দেওয়ার ঘটনায় পুলিশের বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায়। এরপর তাকে সাময়িক বরখাস্ত করার নির্দেশ দেয় সিএমপি কর্তৃপক্ষ। ১১ জুন সিএমপি থেকে চিঠি দিয়ে বাগেরহাট জেলা পুলিশকে বিষয়টি জানানো হয়। ওই চিঠি পাওয়ার তিন দিনের মাথায় ফকিরহাট থানা পুলিশ তাকে ছাড়পত্র দিয়ে বাগেরহাট জেলা পুলিশ লাইনসে যোগ দিতে বলে।

তবে ফকিরহাট থানা পুলিশের ছাড়পত্র নিলেও পুলিশ লাইনসে আর যোগ দেননি এএসআই সন্তু। ১৫ জুন তিনি এক লিখিত আবেদনে জানান, থানা থেকে ছাড়পত্র নেওয়ার পর ‘অসুস্থ’ হয়ে ফকিরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তির পর সেখানকার চিকিৎসকরা তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনা অথবা ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হতে বলেছেন। সূত্র জানায়, সন্তু শীল এরপর চট্টগ্রামে চলে আসেন। সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র আবদুস সবুর লিটনের সঙ্গেও এ সময় তাকে দেখা গেছে।

সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!