চট্টগ্রামে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় ঝরে পড়েছে সাড়ে ২৯ হাজার শিক্ষার্থী

সিলেবাস পরিবর্তনে প্রস্তুতিতে ঘাটতি

এবারের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষায় চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ড থেকে ২৯ হাজার ৫৪২ জন শিক্ষার্থীর পরীক্ষার হলে বসা হচ্ছে না। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে এসব শিক্ষার্থী রেজিস্ট্রেশন করলেও, পরীক্ষার আগেই তারা ঝরে পড়েছে।

২১ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এবারের পরীক্ষায় চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ড থেকে নিয়মিত ও অনিয়মিত মিলে অংশ নিচ্ছে ১ লাখ ৩০ হাজার ৬৬৮ পরীক্ষার্থী। এর মধ্যে নিয়মিত পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ১ লাখ ৪ হাজার ৩৩৮ জন। কিন্তু নবম শ্রেণিতে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে রেজিস্ট্রেশন করেছিল ১ লাখ ৩৩ হাজার ৮৮০ জন। এসব শিক্ষার্থীদের মধ্যে ফরম ফিলাপ করেনি ২৯ হাজার ৫৪২ জন।

ছাত্রের চেয়ে এবার ছাত্রী বেশি

এবারের এসএসসি পরীক্ষায় গতবছরের তুলনায় পরীক্ষার্থী কম। তবে ছাত্রের চেয়ে এবার ছাত্রী বেশি।

চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ড সূত্রে জানা গেছে, এবারের পরীক্ষায় নিয়মিত ও অনিয়মিত মিলে অংশ নিচ্ছে ১ লাখ ৩০ হাজার ৬৬৮ জন। এর মধ্যে ছাত্র ৫৬ হাজার ৩২৫ জন, ছাত্রী ৭৪ হাজার ৩৪৩ জন। বিজ্ঞানে ছাত্র ১৫ হাজার ৪৩৪ জন, ছাত্রী ১৯ হাজার ৫৪৬ জন। মানবিকে ছাত্র ১৩ হাজার ৭৩১ জন ও ছাত্রী ৩০ হাজার ২২৭ জন। ব্যবসায় শিক্ষায় ছাত্র ২৭ হাজার ১৬০ জন ও ছাত্রী ২৪ হাজার ৫৭০ জন। হিসেবে মোট ছাত্র ৫৬ হাজার ৩২৫ জন ও ছাত্রী ৭৪ হাজার ৩৪৩ জন। এছাড়া পরীক্ষায় এবার অংশগ্রহণ করছে ১ হাজার ২১৮ বিদ্যালয়।

জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম জেলা (মহানগরসহ) ছাত্র ৪০ হাজার ১৮৪ জন ও ছাত্রী ৫২ হাজার ১১২ জন।

কক্সবাজার জেলায় ছাত্র ৭ হাজার ৭৭৬ জন, ছাত্রী ১১ হাজার ১৩৮ জন। রাঙামাটিতে ছাত্র ৩ হাজার ৩৩৭ জন ও ছাত্রী ৪ হাজার ৭৯ জন। খাগড়াছড়িতে ছাত্র ৩ হাজার ৪৩৮ জন ও ছাত্রী ৪ হাজার ৬৩১ জন এবং বান্দরবানে ছাত্র ১ হাজার ৫৯০ জন ও ছাত্রী ২ হাজার ৩৮৩ জন। এবার একটি কেন্দ্র কমে দাঁড়িয়েছে ২১৮টি।

তবে ২০২৫ সালে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি ছিল। সেবার নিয়মিত ও অনিয়মিত মিলে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৪০ হাজার ৬৭৩ জন। এর মধ্যে ছাত্র ছিল ৬১ হাজার ৬৫২ জন ও ছাত্রী ৭৯ হাজার ২১ জন।

সিলেবাস বদলে পরীক্ষার্থীরা বিপাকে

এবারের এসএসসি পরীক্ষায় এতবেশি পরীক্ষার্থী ‘ঝরে পড়া’র পেছনে আগের শিক্ষাক্রমে ফিরে যাওয়াকে দুষছে অনেক পরীক্ষার্থী।

একাধিক পরীক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের বাস্তবায়ন করা ‘নতুন’ শিক্ষাক্রমের অধীনে নবম শ্রেণিতে পড়েছে তারা। কিন্তু ২০২৫ সালে আবারও তাদের শিক্ষাক্রমের সিলেবাস আগেরটিতে ফিরে যায়। ফলে দুই রকম শিক্ষাক্রমে পড়ালেখার কারণে পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি সম্ভব হয়নি।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক বোর্ড কর্মকর্তা চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণের পরপর শিক্ষর্থীরা অনেক দিন স্কুলে অনুপস্থিত ছিল। তারা তখন নবম শ্রেণিতে। নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেনি। মূলত ক্লাসবিমুখ হওয়ায় একটি বড় অংশ টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়।

স্কুল পরিদর্শনে অনিয়ম

প্রতিমাসে ১০টি স্কুল পরিদর্শনের কথা থাকলেও ঠিকমতো বিদ্যালয় পরিদর্শনে যান না দায়িত্বরত কর্মকর্তারা।

শিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ঝরে পড়ার তালিকায় পাহাড়ি প্রত্যন্ত এলাকার পরীক্ষার্থী বেশি। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত উপস্থিতি হতে পারে না শিক্ষার্থীরা। পায় না দক্ষ শিক্ষকের সাহচর্য। ইংরেজি ও গণিতের মত কঠিন বিষয় তারা পারদর্শী হয়ে উঠতে পারে না। চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের অধীনে যেসব বিদ্যালয় পরিদর্শক রয়েছেন, তাদের প্রতিমাসে ১০টি বিদ্যালয় পরিদর্শনে যাওয়ার নিয়ম থাকলেও তারা তা করেন না।

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের প্রধান স্কুল পরিদর্শক অধ্যাপক আবুল কাশেম বলেন, ‘শিক্ষাবোর্ডে প্রধান স্কুল পরিদর্শক একজন, উপ স্কুল পরিদর্শক একজন ও সহকারী স্কুল পরিদর্শক একজন। কিন্তু অফিসিয়াল কাজের চাপে পরিদর্শনে যেতে পারেন না।’

যা বলছেন বোর্ড কর্মকর্তারা

চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. মো. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী বলেন, ‘ঝরে পড়ার পেছনে দারিদ্র্য, বাল্যবিয়ে, কর্মে প্রবেশ, পড়ালেখায় অনাগ্রহ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তি, কিশোর গ্যাংয়ে জড়িয়ে পড়া অন্যতম কারণ। এ অবস্থা চলতে থাকলে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’

তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রামে অনেক মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারও তাদের মেয়েরা অষ্টম থেকে নবম শ্রেণিতে উঠতেই বিয়ের জন্য তোড়জোড় শুরু করেন। আরও দেখা যায়, অনেকে প্রবাসী ছেলের হাতে মেয়ে তুলে দেন। সেই ছেলে বিয়ের পর বউকে রেখে প্রবাসে চলে যায়। এরপর আর পড়ালেখা করা হয় না মেয়েদের। ছেলেদের ক্ষেত্রে পরিবারের চাপে লেখাপড়ার ইতি টেনে উপার্জনের পথে নামে অনেকে।’

ডিজে

ksrm