অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির ব্যক্তিগত সফরে সরকারি ভিভিআইপি সুবিধা, জজ আদালতের চিঠি নিয়ে প্রশাসনে প্রশ্ন
এমন সুবিধার বিধান নেই ওয়ারেন্ট অফ প্রিসিডেন্সে
ব্যক্তিগত সফরে চট্টগ্রামে এসে সার্কিট হাউসে থাকার পাশাপাশি সার্বক্ষণিক সরকারি গাড়ি, চালক ও জ্বালানি এবং নিরাপত্তাসহ ভিভিআইপি সুবিধা চেয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বোরহান উদ্দিন। তাঁর ৬ থেকে ৮ আগস্টের চট্টগ্রাম সফরকে কেন্দ্র করে প্রথমে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার এবং পরে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের কাছে এসব সুবিধা চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়। তবে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, ওয়ারেন্ট অফ প্রিসিডেন্স বা পদমর্যাদা ক্রমে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির জন্য এ ধরনের রাষ্ট্রীয় প্রটোকল সুবিধার পৃথক কোনো অবস্থান নেই। একই সঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত একজন বিচারপতির ব্যক্তিগত সফরের জন্য বিচার বিভাগীয় দাপ্তরিক চ্যানেলে সরকারি সুবিধা চেয়ে চিঠি দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

যেভাবে চাওয়া হয় সুবিধা
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ২৮ জুলাই অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বোরহান উদ্দিনের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা পরিচয়ে আলমাস নামে এক ব্যক্তি সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার বরাবর একটি চিঠি দেন। ওই চিঠিতে বিচারপতি বোরহান উদ্দিনের চট্টগ্রাম সফরের সময়সূচি উল্লেখ করা হয়।

চিঠি অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) সকালে ঢাকার সেগুনবাগিচার নিজ বাসা থেকে রওনা হয়ে তিনি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হবেন। সেখান থেকে তিনি চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে যাবেন এবং রাতে সেখানে অবস্থান করবেন। শুক্রবার (৭ আগস্ট) চট্টগ্রামে একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে সার্কিট হাউসে রাতযাপন করবেন। শনিবার (৮ আগস্ট) সার্কিট হাউস থেকে চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরে গিয়ে বিমানযোগে ঢাকায় ফিরে নিজ বাসভবনে যাওয়ার কথা রয়েছে।
ওই চিঠিতে বিচারপতি বোরহান উদ্দিনের সফরকালে সার্কিট হাউসে একটি ভিভিআইপি কক্ষের ব্যবস্থা, চালক ও জ্বালানিসহ একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়ি এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার অনুরোধ করা হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৯ জুলাই চট্টগ্রাম জেলা জজ আদালতের নেজারত বিভাগ থেকে জেলা প্রশাসকের কাছে আরেকটি চিঠি পাঠানো হয়। যুগ্ম জেলা জজ (ভারপ্রাপ্ত জজ) আরফাতুল রাকিবের সই করা ওই চিঠিতে সার্কিট হাউসে একটি ভিভিআইপি কক্ষ এবং সার্বক্ষণিক যাতায়াতের জন্য চালক ও জ্বালানিসহ একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ভিআইপি গাড়ি বরাদ্দের অনুরোধ করা হয়। একই সঙ্গে বিচারপতির অবস্থানকালীন ও যাতায়াতের সময় প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়।
জেলা প্রশাসনের আপত্তি
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার ও নেজারত ডেপুটি কালেক্টর (এনডিসি) তামজীদুর রহমান চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে ভিভিআইপি কক্ষ এবং জ্বালানিসহ গাড়ি দিতে চট্টগ্রাম আদালত থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রীর চট্টগ্রাম সফরকে কেন্দ্র করে সার্কিট হাউসে কক্ষের সংকট তৈরি হয়েছে। এ কারণে তাঁকে বাইরে একটি জায়গায় থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছা জানিয়ে জেলা প্রশাসনের অপর এক কর্মকর্তা বলেন, ওয়ারেন্ট অফ প্রিসিডেন্স অনুযায়ী একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এসব সুবিধার আওতাভুক্ত নন। অবসরপ্রাপ্ত একজন বিচারপতির জন্য কিভাবে বিচার বিভাগের চ্যানেলে এ ধরনের চিঠি দেওয়া হয়েছে, সেটিও স্পষ্ট নয়। এর মাধ্যমে প্রশাসনকে বিব্রত করা হচ্ছে।
আইনে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির সুবিধা
আইনগতভাবে বিষয়টি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের বিচারক (ছুটি, পেনশন ও বিশেষাধিকার) আইন, ২০২৩-এ অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদের পেনশন, আনুতোষিক, ছুটি নগদায়নসহ অবসরকালীন বিভিন্ন সুবিধা নির্ধারণ করা হয়েছে। আইনের ২০ ধারায় অবসর গ্রহণের সময় ছুটির প্রাপ্যতা সাপেক্ষে ১৮ মাসের ছুটি নগদায়নের বিধান রয়েছে।
তবে এই আইনে অবসরপ্রাপ্ত সাধারণ বিচারপতির ব্যক্তিগত সফরের জন্য সরকারি গাড়ি, চালক ও জ্বালানি ব্যবহারের কোনো স্থায়ী সুবিধার কথা উল্লেখ নেই। অন্যদিকে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির জন্য আইনে আলাদা বিশেষ সুবিধার বিধান রয়েছে। ফলে অবসরপ্রাপ্ত আপিল বিভাগের একজন বিচারপতির ক্ষেত্রে অবসরকালীন বিশেষ সুবিধা এবং কর্মরত অবস্থার সরকারি লজিস্টিক সুবিধাকে একইভাবে দেখার সুযোগ নেই।
আর বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের বিচারক (ভ্রমণ ভাতা) আইন, ২০২১-এ দায়িত্বকালীন ভ্রমণের জন্য বিচারকদের ভ্রমণ ভাতা ও সুবিধার বিধান রয়েছে। একই আইনের ৬ ধারায় ছুটিতে যাওয়া বা ছুটি থেকে ফেরা এবং অবসর-পরবর্তীকালে নিজ বাসস্থানে ফেরার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ভ্রমণ সুবিধার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু অবসরের পর কোনো বিচারপতির ব্যক্তিগত সফরে সার্বক্ষণিক সরকারি গাড়ি, চালক ও জ্বালানি দেওয়ার বিধান সেখানে নেই।
ওয়ারেন্ট অফ প্রিসিডেন্সে কী আছে
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দায়িত্বে থাকা বিচারপতি এবং অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের অবস্থান এক নয়। ওয়ারেন্ট অফ প্রিসিডেন্স মূলত রাষ্ট্রীয় ও সরকারি অনুষ্ঠানে পদমর্যাদা ও প্রটোকলের ক্রম নির্ধারণ করে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের কর্মরত বিচারপতিদের সেখানে নির্দিষ্ট অবস্থান রয়েছে। কিন্তু অবসরপ্রাপ্ত আপিল বিভাগের বিচারপতির জন্য পৃথক কোনো অবস্থান উল্লেখ নেই।
এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ওয়ারেন্ট অফ প্রিসিডেন্সকে শুধু আনুষ্ঠানিক আসনবিন্যাসের তালিকা হিসেবে দেখার সুযোগও নেই। ২০১৫ সালের একটি রায়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ বলেছে, ওয়ারেন্ট অফ প্রিসিডেন্সের সঙ্গে মর্যাদা, সুবিধা ও অন্যান্য প্রাপ্যতার সম্পর্ক রয়েছে। একই রায়ে আদালত উল্লেখ করেছে, নির্দিষ্ট মর্যাদা অর্জন না করা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা গাড়ি বা আবাসনের মতো সুবিধা পাওয়ার অধিকারী নন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই যুক্তিতে কর্মরত আপিল বিভাগের বিচারপতির পদমর্যাদাকে অবসরের পর ব্যক্তিগত সফরে একইভাবে প্রয়োগ করার সুযোগ সীমিত। কারণ অবসরপ্রাপ্ত আপিল বিভাগের বিচারপতির জন্য ওয়ারেন্ট অফ প্রিসিডেন্সে আলাদা কোনো পদ বা অবস্থান নেই।
সার্কিট হাউসে থাকা আর ভিভিআইপি কক্ষ এক নয়
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সার্কিট হাউসে থাকার বিষয়টি নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। সরকারি জেলা প্রশাসনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত ভ্রমণেও সার্কিট হাউসে কক্ষ বরাদ্দের বিধান রয়েছে। যশোর ও সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসনের সরকারি ওয়েবসাইটেও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত সফরে সার্কিট হাউসে কক্ষ বরাদ্দের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তাই সার্কিট হাউসে কক্ষ পাওয়া এবং ভিআইপি কক্ষ পাওয়ার বিষয়টি এক নয়। অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে সাধারণ কক্ষ বরাদ্দের সুযোগ থাকতে পারে। কিন্তু ওয়ারেন্ট অফ প্রিসিডেন্সের ভিত্তিতে একজন অবসরপ্রাপ্ত আপিল বিভাগের বিচারপতির জন্য ভিআইপি কক্ষ অগ্রাধিকার হিসেবে বরাদ্দের পৃথক কোনো বিধান পাওয়া যাচ্ছে না। সরকারি তথ্যেও সরকারি কর্মকর্তা ও ভিআইপি অতিথিদের জন্য ওয়ারেন্ট অফ প্রিসিডেন্সভিত্তিক কক্ষ বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে, পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত সফরে কক্ষ বরাদ্দের বিষয়টি আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
গাড়ি-জ্বালানি ও নিরাপত্তার যৌক্তিকতা
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যক্তিগত সফরে সরকারি গাড়ি, চালক ও জ্বালানি ব্যবহারের প্রশ্নটি আরও স্পষ্ট। ২০২১ সালের ভ্রমণ ভাতা আইনে অবসর-পরবর্তী নিজ বাসস্থানে ফেরার ক্ষেত্রে ভ্রমণ সুবিধার কথা থাকলেও চট্টগ্রামে পারিবারিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার মতো ব্যক্তিগত সফরে সার্বক্ষণিক সরকারি গাড়ি ও জ্বালানি ব্যবহারের বিধান নেই।
তাঁদের মতে, কোনো বিশেষ প্রশাসনিক আদেশ বা নির্বাহী সিদ্ধান্ত থাকলে বিষয়টি ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু এমন কোনো নির্দিষ্ট আদেশ বা বিধানের ভিত্তি ছাড়া একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির ব্যক্তিগত সফরে সরকারি গাড়ি, চালক ও জ্বালানি ব্যবহারের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। কোনো ব্যক্তির নিরাপত্তাঝুঁকি থাকলে সরকার বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রয়োজন অনুযায়ী নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে পারে। কিন্তু শুধু অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি হওয়ার কারণে ব্যক্তিগত সফরে নিয়মিত রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা পাওয়ার স্বয়ংক্রিয় অধিকার রয়েছে, এমন বিধান প্রকাশ্য আইনে পাওয়া যাচ্ছে না।
চিঠি দেওয়ার এখতিয়ার নিয়েও প্রশ্ন
সুবিধাগুলোর আইনগত প্রাপ্যতার প্রশ্নের পাশাপাশি চিঠি দেওয়ার প্রক্রিয়াটিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তির ব্যক্তিগত সফরের জন্য জেলা জজ আদালতের নেজারত বিভাগ কোন কর্তৃত্ববলে জেলা প্রশাসনের কাছে সরকারি গাড়ি, জ্বালানি, ভিআইপি কক্ষ ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা চেয়েছে, সেটি স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
চিঠি দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো প্রশাসনিক আদেশ, অনুমোদন বা বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা ছিল কি না, সেটিও যাচাই করা দরকার বলে মনে করছেন তাঁরা। তবে এ পর্যায়ে এটিকে অনিয়ম বলা যাচ্ছে না। কারণ চিঠিটি কোনো সুবিধা মঞ্জুর করার আদেশ নয়, বরং সুবিধা দেওয়ার জন্য একটি অনুরোধপত্র। তাই চিঠি ইস্যুর এখতিয়ার, অনুমোদনের ভিত্তি এবং পরে জেলা প্রশাসন কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটিই এখানে মূল প্রশ্ন।
বিচারপতি বোরহান উদ্দিনের অবসর
চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার বাসিন্দা বোরহান উদ্দিন ২০০৮ সালের ১৬ নভেম্বর হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান। ২০১০ সালের ১১ নভেম্বর তিনি হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী বিচারক হন। ২০২২ সালের ৯ জানুয়ারি তাঁকে আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ৬৭ বছর পূর্ণ হওয়ায় ২০২৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি তিনি অবসরে যান।
জানা গেছে, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বোরহান উদ্দিনের বাবা অ্যাডভোকেট আবদুস সবুর ছিলেন বাঁশখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। কলকাতা ইসলামীয়া কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রুমমেট ছিলেন। বিচারপতি বোরহান উদ্দিনের ভাই অ্যাডভোকেট এইচএম জিয়াউদ্দিন চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির একাধিকবার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল স্বেচ্ছাসেবক লীগ চট্টগ্রাম মহানগর শাখার আহ্বায়কও ছিলেন।
সিপি




