চট্টগ্রামের ৫০ গার্মেন্টসের ১ হাজার কোটি টাকার অর্ডার বাতিল হয়ে গেল

2

করোনাভাইরাসের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এখন পর্যন্ত বড় আঘাতটি এসেছে তৈরি পোশাক খাতের ওপর। ঘরে-বাইরে দুদিকেই করুণ অবস্থায় পড়ে গেছে দেশের প্রধান এই রপ্তানি খাত। অবস্থা এখন এমন যে, ঘন্টায় ঘন্টায় বাতিল কিংবা স্থগিত হচ্ছে রপ্তানি আদেশ। সারাদেশে ৫ হাজার গার্মেন্টসের প্রায় ৩৫ কোটি ডলারের ক্রয় আদেশ ইতিমধ্যে বাতিল বা স্থগিত হয়ে গেছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামের ৫০টি গার্মেন্টেসের ১০ কোটি ডলারেরও বেশি পণ্য রয়েছে। এদিকে আগামী মৌসুমের নতুন কোনো কার্যাদেশও আসছে না। ফলে গার্মেন্টস শিল্প কঠিন অবস্থার মধ্যে পড়ে গেছে হঠাৎ করেই।

তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামের গার্মেন্টস কারখানাগুলোর ১০ কোটি ডলারেরও বেশি ক্রয় আদেশ স্থগিত কিংবা বাতিল করা হয়েছে। চট্টগ্রামের বিজিএমইএ তালিকাভুক্ত ৫০টি কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে ২৭টি গার্মেন্টসের অর্ডার স্থগিত হয়েছে, বাতিল করা হয়েছে ২০টি গার্মেন্টসের অর্ডার। এছাড়াও বেশ কিছু কোম্পানির কাটিং স্থগিত করা হয়েছে। চারটি প্রতিষ্ঠান আবার ফেব্রিক্স স্বল্পতার কারণে কাজ করতে পারছে না। অর্ডার বাতিল ও স্থগিতের কারণে চট্টগ্রামের গার্মেন্টসগুলোর ক্ষতির পরিমাণ ১০ কোটি ডলারেরও বেশি হবে বলে জানিয়েছেন মালিকরা।

বিজিএমইএ চট্টগ্রামের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্থ গার্মেন্টসের বিস্তারিত তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। রোববার (২২ মার্চ) পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্থ ৫০টি গার্মেন্টসের তালিকা পাওয়া গেছে।

অর্ডার বাতিল ও স্থগিত হয়েছে— চট্টগ্রামের এমন পোশাক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে প্যাসিফিক জিন্স, কেডিএস, ফ্যাশন ওয়াচ লিমিটেড, গ্লোবাল শার্টস লিমিটেড, এটিএস পার্ল লিমিটেড, চিটাগং এশিয়ান অ্যাপারেলস, এইচ আই অ্যাপারেলস লিমিটেড, সেকশন সেভেন লিমিটেড, এপারেল প্রমোটারস লিমিটেড, স্মার্ট জ্যাকেট বিডি লিমিটেড, স্মার্ট জিন্স বিডি লিমিটেড, ইউনিটি ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেডসহ অন্তত ৫০টি গার্মেন্টসের নাম।

অন্যদিকে অর্ডার বাতিল বা স্থগিত করা বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে বড় বড় ব্র্যান্ড ও ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের নাম— এইচএন্ডএম, আইএফজি, প্রাইমার্ক, সিঅ্যান্ডএ, জারা, পুল অ্যান্ড বেয়ার, বেবি শপ, ব্ল্যাকবেরিসহ আরও কিছু ক্রেতা প্রতিষ্ঠান।

তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) পরিচালক মোহাম্মদ আতিক চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, আমেরিকা, ইউরোপ ও কানাডা করোনাভাইরাসের কারণে লকডাউন হয়ে আছে। ফলে প্রত্যেক দেশের ক্রয় আদেশগুলো স্থগিত করে বার্তা পাঠানো হচ্ছে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোতে। এতে বড় ঝুঁকিতে আছি আমরা।’

তিনি বলেন, ‘এছাড়াও আমাদের দেশের করোনাভাইরাস পরিস্থিতি নিয়েও গার্মেন্টস শিল্প বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এর ফলে আমরাও আগামী ২৫ মার্চ থেকে প্রতিষ্ঠান দুই সপ্তাহ বন্ধের জন্য মতপ্রকাশ করেছি। কারণ ঝুঁকি নিতে চাই না।’

চট্টগ্রাম চেম্বারের পরিচালক এসএম আবু তৈয়ব বলেন, ‘আমার কোম্পানির সাড়ে আট লাখ ডলারসহ চট্টগ্রামের গার্মেন্ট শিল্পের প্রায় ১০ কোটি ডলার ক্রয় আদেশ বাতিল ও স্থগিত করা হয়েছে। চরম সংকটের মধ্যে সময় পার করতে হচ্ছে আমাদের। স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতেও প্রায় পাঁচ হাজার শিল্প-কারখানাকে বিশেষ সতর্কতা গ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর।’

আরডিএম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, ‘আমার মোট ১৮ লাখ ডলার পণ্য স্থগিত করার ম্যাসেজ দিয়েছে ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্ট। এতে ফ্যাক্টরি বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া কোন উপায় দেখছি না।’

সূত্রে জানা যায়, বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে গত ২০ ঘণ্টায় বাংলাদেশের পোশাক শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে দেওয়া ১৮ কোটি ৪০ লাখ ডলারের কার্যাদেশ স্থগিত করেছে ক্রেতারা। এর আগে গত এক সপ্তাহে কার্যাদেশ স্থগিত হয়েছে অন্তত ৫০ কোটি ডলারের। স্থানীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। এ অবস্থায় কারখানা চালু রাখা না রাখা নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। তবে বেশিরভাগ নেতাই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরকারের সঙ্গে দর-কষাকষির পক্ষে মতামত তুলে ধরেন।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিপদে পড়া পোশাক শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো কোনোটি কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার চিন্তাভাবনাও করছে। ব্যবসার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে সরকারের সঙ্গে দরকষাকষি করে বিশেষ তহবিলও নিশ্চিত করতে চাইছে। তবে কারখানা বন্ধ হলে বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের কী হবে— তা নিয়ে উদ্যোক্তাদের মাথাব্যথা নেই।

বৈঠকে উপস্থিত বিজিএমইএর একাধিক নেতা জানান, করোনাভাইরাস সংক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে ক্রেতারা একে একে আগের সব কার্যাদেশ স্থগিত করছে। আগামী মৌসুমের নতুন কোনো কার্যাদেশও আসছে না। ফলে আগামী অন্তত ছয় মাস তৈরি পোশাক খাতের জন্য এক অশনিসংকেত তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে তাদের কারখানাই বন্ধ রাখতে হবে।

বিজিএমইএ নেতারা বলছেন, আপৎকালীন এই সময়ের জন্য তারা সরকারের কাছে অনুদান হিসেবে বিশেষ তহবিল চাইবেন। তা তৈরি পোশাক খাতের কেন্দ্রীয় তহবিল থেকেও হতে পারে। এই অনুদানের পরিমাণ নির্ধারণ হবে রপ্তানিকারকদের রপ্তানি অঙ্কের ভিত্তিতে। ব্যাক টু ব্যাক এলসি দায় পরিশোধ হবে সুদমুক্ত। দায় পরিশোধ শুরু হবে এক বছর পর থেকে এবং ঋণের সুদ হবে তিন বছর মেয়াদি।

বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক এ ব্যাপারে বলেন, ‘আমরা যারা ব্যবসা করি, যাদের কারখানা রয়েছে তাদের সবারই দায়িত্ব শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সে হিসেবে ছোট-বড় সব উদ্যোক্তাই সামর্থ্য অনুযায়ী নিজ নিজ কারখানায় প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবেলায় উদ্যোগ নিয়েছেন। প্রতিটি কারখানায় অকুপেশনাল হেলথ অ্যান্ড সেফটি কমিটি রয়েছে। ওই কমিটি প্রতিদিন প্রতিবেদন দিচ্ছে এবং সচেতনতামূলক কাজ করছে। এরপরও পরিস্থিতি অনুসারে যেকোনো উদ্যোগ নিতে আমরা প্রস্তুত রয়েছি।’

এক প্রশ্নের জবাবে রুবানা হক বলেন, ‘এ পর্যন্ত একটি কারখানার দুজনকে আইসোলেশনে নেওয়া হয়েছে। তবে তারা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কিনা জানা সম্ভব হয়নি। কোনো শ্রমিক অসুস্থ হলে বা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে তার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নেবে বিজিএমইএ। সরকারি নির্দেশনা মানা হচ্ছে কিনা, তা-ও তদারকি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে একটি হটলাইন নম্বর (১৬৩৫৭) চালু করা হয়েছে।’

সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

2 মন্তব্য
  1. জিসান সুমন বলেছেন

    দেশের ক্ষতি হলে আমরা বন্দ চাই না

  2. জনি তালুকদার বলেছেন

    শ্রমিকদের বেতন সহ বন্ধ দেওয়া হোক।না হলে অনেক শ্রমিক খেতে পাবে না।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

আরও পড়ুন