চট্টগ্রামের স্কুল ডিজে আড্ডা থেকে ফেসবুক—সবখানেই কিশোর গ্যাং!

0

চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন পাড়ায়-বাড়িতে, অফিসে ও সরকারি স্থাপনার দেয়াল লক্ষ্য করলেই কিশোর গ্যাং গ্রুপের অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়। দেয়ালে দেয়ালে বিশেষ কায়দায় বিভিন্ন গ্যাং গ্রুপের নাম লেখা থাকে। ফেসবুকেও তাদের পেইজ ও ম্যাসেঞ্জার গ্রুপ রয়েছে। ওই সব পেজে গ্রুপের সদস্যরা সারাদিন অশ্লীল ভাষায় তথ্য আদান-প্রদান করে। একপর্যায়ে কেউ কেউ জড়িয়ে পড়ে হত্যার মতো অপরাধে—জানিয়েছে পুলিশ।

সূত্রে জানা গেছে, সিএমপির পশ্চিম বিভাগের চার থানায় কিশোর গ্যাং গ্রুপের সংখ্যা ১৪টি ও সদস্য সংখ্যা ৯৩ জন। এর মধ্যে ডবলমুরিং থানায় গ্রুপের সংখ্যা ৭টি ও সদস্য সংখ্যা ৪৫ জন। পাহাড়তলী থানায় সদস্য সংখ্যা ২২ জন ও গ্রুপের সংখ্যা ৩টি। হালিশহর থানায় গ্রুপের সংখ্যা ২টি আর সদস্য সংখ্যা ১৩ জন। আকবর শাহ থানায় সদস্য সংখ্যা ১৩ জন আর গ্রুপ হচ্ছে ২টি।

সর্বশেষ সিএমপির বন্দর বিভাগের দুই থানায় কিশোর গ্যাংয়ের নাম পুলিশের তালিকায় থাকলেও কর্ণফুলী ও পতেঙ্গায় কোনও কিশোর গ্যাং নেই বলে দাবি করেছে পুলিশ। ইপিজেড থানায় গ্রুপের সংখ্যা একটি আর সদস্য সংখ্যা ৮ জন। অন্যদিকে বন্দর থানায় গ্রুপের সংখ্যা ৩টি এবং সদস্য সংখ্যা ৩০ জন।

সিএমপির পশ্চিম ও বন্দর বিভাগের ৮ থানায় কিশোর গ্যাংয়ের চালচিত্র
সিএমপির পশ্চিম ও বন্দর বিভাগের ৮ থানায় কিশোর গ্যাংয়ের চালচিত্র

প্রসঙ্গত, সিএমপির দক্ষিণ বিভাগের চার থানায় গ্যাং গ্রুপের মোট সংখ্যা ১৬টি আর সদস্যসংখ্যা ৩১৬ জন। অন্যদিকে সিএমপির উত্তর বিভাগের চার থানায় কিশোর গ্যাং গ্রুপের সংখ্যা ১৩টি ও সদস্য সংখ্যা ৮৮ জন।

নগরীর বড় বড় এলাকা ছাড়াও সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন স্কুলে বিভিন্ন নামে বিভিন্ন কিশোর গ্যাং গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন উচ্চ বিদ্যালয়, কলেজিয়েট স্কুল, কাজেম আলী স্কুল এন্ড কলেজ, বাকলিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, হাজেরা তজু উচ্চ বিদ্যালয়, নাসিরাবাদ সরকারি হাই স্কুল। পাশাপাশি এসব কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা সক্রিয় নগরীর স্টেশন রোড, বিআরটিসি মোড়, কদমতলী, চকবাজার, মেডিকেল হোস্টেল, শিল্পকলা একাডেমি, সিআরবি, খুলশি, ফয়েস লেক, ডেবারপার, চান্দগাঁও শমসের পাড়া, ফরিদের পাড়া, আমিন জুট মিল কলোনি, বাংলাবাজার, আগ্রাবাদ সিজিএস কলোনি, সিডিএ, ছোটপুল, হালিশহর, বন্দর কলোনি, কালুরঘাট পতেঙ্গার বেশ কয়েকটি এলাকায় মাদক বেচাকেনাসহ মোটরসাইকেল ও সাইকেল ছিনতাই, গান-বাজনা, খেলার মাঠ, ডান্স ও ডিজে পার্টি, ক্লাবের আড্ডার নিয়ন্ত্রণে মরিয়া এসব কিশোর গ্যাং গ্রুপ।

পুলিশ ও অপরাধবিজ্ঞানীরা বলছেন, পারিবারিক অনুশাসনের অভাবে খুনসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে এসব শিশু-কিশোর। তুচ্ছ বিষয়ে কথা কাটাকাটি, ফেসবুক-মোবাইল, প্রেম, চুরি-ছিনতাইসহ নানা ইস্যুতে সামান্য মতানৈক্য হলেই এদের মাথায় খুনের নেশা আসে। আবার মাদক বিক্রেতা থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ পর্যন্ত অনেকেই নিজেদের স্বার্থে কিশোরদের অপরাধ জগতে টানছে। ফলে এই কিশোররা পরিবারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। যারা শুধু পাড়া-পড়শি নয়, নিজের পরিবারের জন্যও মারাত্মক বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও সমাজ বিজ্ঞানী প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের সমাজে নানা অসঙ্গতি রয়েছে। চাওয়ার সঙ্গে পাওয়ার মিল পাচ্ছে না অনেকে। নিজেদের সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে কিশোররা। তাদের আচরণে পরিবর্তন হচ্ছে। কিশোর বয়সে হিরোইজম ভাব থাকে। এই হিরোইজমকে সঠিক পথের অনুসারী করে তুলতে হবে। আবার কিশোরদের রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার কারণে তাদের মধ্যে এক ধরনের গ্যাং কালচার গড়ে উঠছে। এর দায় আমাদের সবার। সমাজের শিক্ষক, অভিভাবক, জনপ্রতিনিধি বা যাদের কথা শুনবে এমন ব্যক্তিদের নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগে এই গ্যাং কালচার থেকে বিপদগামী কিশোরদের সুপথে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।’

আগের পর্বে
চট্টগ্রাম দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ৫৩৫ কিশোরের ৪৭ গ্যাং

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

আরও পড়ুন