চট্টগ্রামের সরকারি স্কুল যেন কমিউনিটি সেন্টার, পরীক্ষা ও অনুষ্ঠান চলে একসঙ্গে (ভিডিওসহ)

শিক্ষার্থীদের বেঞ্চে বসে অতিথিদের খাওয়া-দাওয়া

ভাত খাওয়ার পর কাপড় দিয়ে মুখ পরিষ্কার করতে করতে নিচে নামছিলেন ৫০ বছর বয়সী এক নারী। ওনার পিছু পিছু নিচ থেকে নামছিলেন অন্তত আরও ২০ জন। সবাই সবে খেয়ে উঠেছেন। তিন তলায় খাবারের আয়োজন থাকলেও নিচতলায় রয়েছে হাত-মুখ ধোয়ার ও ব্যবস্থা।

এটা কোনো কমিউনিটি সেন্টার না, চট্টগ্রাম নগরীর পূর্ব মাদারবাড়ি ইউনুস মিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্র।

পরীক্ষা চলার সময়েই স্কুলটিতে চলছিল এলাকার এক মৃত ব্যক্তির শ্রাদ্ধের খাবারের আয়োজন। প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় পরীক্ষা এবং ক্লাস চললেও তৃতীয় তলায় চলছিল খাবারের পর্ব। এ সময় স্কুলের পাঠদানে সমস্যা হচ্ছিল। লুঙ্গি পরা ব্যক্তি এক ব্যক্তিকে দেখা গেছে, খাবার খেতে ভুলবশত দ্বিতীয় তলায় পরীক্ষার হলে ঢুকে গেছেন। এ সময় দায়িত্বরত শিক্ষিকা উত্তেজিত হয়ে বলেন, ‘খাবার এখানে না, এখানে পরীক্ষা চলছে। ওপরে যান।’

বুধবার (১৫ মে) দুপুর ২টায় সরেজমিন স্কুলটিতে গিয়ে এই চিত্র দেখা গেছে।

এমন ঘটনা প্রথম নয়, এই স্কুল প্রায়ই বিয়ে-বৌভাতের মতো বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠানের জন্য ভাড়া দেওয়া হয়।

প্রধান শিক্ষকের দাবি, ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও অভিভাবক কমিটির সভাপতির অনুরোধে তিনি স্কুলের জায়গা অনুষ্ঠানের জন্য ভাড়া দেন।

তবে স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির দাবি, গরিব মানুষদের ক্লাব ভাড়া নেওয়ার সামর্থ্য না থাকায় মানবিক দিক বিবেচনা করে স্কুলের জায়গা অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য দেওয়া হয়।

এই প্রতিবেদক যখন স্কুলে উপস্থিত হন, সেই সময় কেউ খেয়ে নামছেন, আবার অনেকেই খাওয়ার জন্য স্কুলের নিচ তলায় অপেক্ষা করছেন। অপেক্ষমাণ মেহমানদের পাশেই চলছিল শিশুদের পাঠদান। অনুষ্ঠানে আগত অতিথিদের হট্টগোলে শিশুদের পাঠদানে বিরক্ত হতে দেখা গেছে ক্লাসের শিক্ষককেও।

খাবারের কেমন আয়োজন হয়েছে—তা দেখতে যাওয়ার সময় দেখা গেছে দ্বিতীয় তলায় চলছে পঞ্চম শ্রেণীর পরীক্ষা। পরীক্ষার হলরুমে দায়িত্বরত এক শিক্ষিকা উত্তেজিত হয়ে কথা বলছেন লুঙ্গি পরা এক ব্যক্তির সঙ্গে। ওই ব্যক্তি ভুলবশত তৃতীয় তলার পরিবর্তে দ্বিতীয় তলার ক্লাসরুমে ঢুকে পড়ছিলেন।

তৃতীয় তলায় গিয়ে দেখা গেছে, বিশাল এক হল রুমের সব ফ্যান চলছে। আর স্কুলের শিক্ষার্থীদের বেঞ্চে বসেই মেহমানদের খাওয়া-দাওয়া হচ্ছে। বারান্দার পাশে বড় তিনটি ড্রাম সাজানো, ফ্লোরে বসে একজন থালা-বাসন পরিষ্কার করছেন।

এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে স্কুলের প্রধান শিক্ষক রাম প্রসাদ সিংহ বলেন, ‘এলাকার বাসিন্দারা খুবই গরিব। তাই তাদের আলাদা করে কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া করে অনুষ্ঠান করার সামর্থ্য নেই। মূলত ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও অভিভাবক কমিটির সভাপতির অনুরোধেই স্কুলের তৃতীয় তালা অনুষ্ঠানের জন্য দিই।’

এতে স্কুলের পাঠদান ও পরীক্ষার কোনো ধরনের অসুবিধা হচ্ছে না বলে জানান প্রধান শিক্ষক। এমনকি এসব অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য কোনো ভাড়াও দেওয়া হয় না বলে জানান তিনি।

তবে প্রধান শিক্ষক স্কুলে এটি প্রথম অনুষ্ঠান বলে জানালেও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান হয়ে থাকে এখানে—কখনও বৌভাত, কখনও বিয়ে আবার কখনও শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান।

এই বিষয়ে স্কুলটির ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি শাহীন চৌধুরী বলেন, ‘সম্পূর্ণ মানবিক দিক বিবেচনা করেই এমন সুযোগ দেওয়া হয় এলাকাবাসীদের।’ কিন্তু আজকের শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান সম্পর্কে তিনি অবগত নন বলে জানান।

এদিকে প্রধান শিক্ষক ও স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি স্কুলের জায়গায় অনুষ্ঠান করতে দেওয়াকে সম্পূর্ণ ‘মানবিক’ এবং এজন্য ভাড়া নেওয়া হয় না বলে জানালেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন।

কিছুদিন আগেও এই স্কুল প্রাঙ্গণে মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান করেন এলাকার এক নারী। পরিচয় গোপন রেখে তার সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, মেয়ের বিয়ের জন্য স্কুলের জায়গাটি ৩ হাজার টাকায় ভাড়া নিয়েছিলেন। ওই টাকা প্রধান শিক্ষককে দিয়েছিলেন।

বোনের বিয়ের জন্য জায়গাটি ভাড়া নিতে হলে কী করতে হবে—প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিয়ের জন্য ভাড়া নিতে চাইলে কাউন্সিলর অফিসে যেতে হবে, সেখানে এক ব্যক্তি আছে তার সঙ্গে কথা বলতে হবে।

প্রতিবদেককে বিয়ের দিন ঠিক করে যোগাযোগ করতে বলেন ওই নারী। এরপর তিনি কাউন্সিলর অফিসের ওই ব্যক্তির সঙ্গে স্কুলের জায়গা ভাড়া নেওয়ার বিষয়ে কথা বলবেন বলেও জানান।

এর আগে ২০২২ সালে জামা-জুতা-ব্যাগ কিনতে কিট অ্যালাউন্স হিসেবে সরকার কর্তৃক প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের দেওয়া এক হাজার টাকা থেকে ১০০ টাকা করে কেটে রাখার অভিযোগ উঠেছিল স্কুলটির কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে।

ডিজে

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!