চট্টগ্রামের শিপিং ব্যবসায়ীরা এক ছাত্রলীগ নেতার কাছে জিম্মি, হুমকি-গালাগাল নিত্যদিনের ঘটনা (ভিডিও)

‘ফোন ধরতেনা (ধর না) কেন? আমি যদি (অফিসে) এসেই না আজিজছেরে (আজিজকে) পাইলে (পেলে) মারতেছি।’ ‘চোদানির (গালি) পুলারে (তাকে) ফোন দিচ্ছে ধরতেছে না।’ ইতিরে (তাকে) তোহিদ ভাই ফোন দেয়ার পরই নাটক করছে।’

এভাবে মুঠোফোনে কল দিয়ে ভেন্ডরের চিঠি (জাহাজে পণ্য সরবরাহের কাজ) দিতে হুমকি দেন এহেসান আহম্মেদ নামে এক যুবক। পরবর্তীতে তার কথামতো জাহাজের চিঠি না দেওয়ায় দলবল নিয়ে অফিসের গিয়ে প্রকাশ্যে গিয়ে হুমকিও দেন এই যুবক।

এদিকে মুঠোফোনে হুমকি দেওয়ার পাশপাশি কথা বলার একপর্যায়ে তৌহিদ নামের ব্যক্তিও কোম্পানির চেয়ারম্যানকে কল করেছিল। মুঠোফোনে দেওয়া কল রেকর্ড ও সিসিটিভির ফুটেজটি প্রতিবেদকের কাছে হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, শুধু ভুক্তভোগী ওই শিপিং অফিস নয়, চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ হচ্ছে শিপিং এজেন্টদের কেন্দ্রবিন্দু। এই এলাকায় রয়েছে অন্তত শতাধিক শিপিং এজেন্টের অফিস। সরকারি দলের নেতা ও ছাত্রনেতারা ব্যবসায়িদের বিভিন্নভাবে নির্যাতন করে আসছেন এই এলাকার শিপিং এজেন্টদের। তাদের ভয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়িরা মুখ খুলছেন না। অথচ এই শিপিং এজেন্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারে ক্রান্তিকালে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। দেশের একশ্রেণীর যুবকরা কর্মসংস্থান হিসেবে শিপিং এজেন্টের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কাজ করছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হুমকিদাতা ওই যুবক হলেন সরকারি কমার্স কলেজের ভিপি ও সাবেক নগর ছাত্রলীগ নেতা। মুঠোফোনে যে তৌহিদের নাম উল্লেখ করেছেন তিনি চট্টগ্রাম নগর যুবলীগ নেতা তৌহিদুল আনোয়ার। তিনি হুমকি দাতা এহেসান আহম্মেদের গ্রুপের অনুসারি। তৌহিদুল আনোয়ার শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের অনুসারি হিসেবে প্রচার রয়েছে।

Yakub Group

সিসিটিভি ফুটেজের দেখা যায়, ১৭ জানুয়ারি দুপুর দেড়টায় অন্তত ১৪ জনের একটি দল নিয়ে অফিসে যান এহেসান আহম্মেদ। ওই সময় ইউনিওশান শিপিং লাইন্স লিমিটেডের অফিসে প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালককে না পেয়ে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে তাদেরকে দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়ে যায় ওই যুবকের দল।

গত ১৭ জানুয়ারি নগরের ভুক্তভোগীর পক্ষে সাধারণ ডায়েরি করেছেন ইউনিওশান শিপিং লাইন্স লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার মো. আব্দুস সাত্তার। জিডির বিবরণে বলা হয়েছে, গত ২ জানুয়ারি বেলা সোয়া ১১টার দিকে ০১৬১৬-১৬১৬৫৬ নম্বরে কল দিয়ে ভুক্তভোগী অফিস ইউনিওশান শিপিং লাইন্স লিমিটেডে এসেই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক অঞ্জন মজুমদারকে খুঁজেন এহেসান আহম্মেদ ও তার দলবল। তারা দুইজনই অফিসে না থাকায় ওই এহেসান তাদেরকে ভেন্ডরের চিঠি দিতে বলে যান।

জিডিতে আরও হয়, ১৬ জুনয়ারি সন্ধ্যা সাতটার দিকে মুঠোফোনে কল দিয়ে চেয়ারম্যান ও এমডিকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন ০১৬১৬-১৬১৬৫৬ নম্বর থেকে। সর্বশেষ গত ১৭ জানুয়ারি দুপুর দেড়টার দিকে দলবল নিয়ে অফিসের আসে কিছু লোক। সেখানে চেয়ারম্যান ও এমডি না থাকায় প্রকাশ্যে হুমকি দিয়ে চলে যায়।

জানতে চাইলে লিন্ডমন্ড শিপিংয়ের চেয়ারম্যান মো. বেলায়েত হোসেন চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমার অফিসেও এসে এহেসানসহ তার দলবল নিয়ে বিভিন্ন সময়ে হুমকি দিয়েছিল। বলা হতো, তাদেরকে ভেন্ডরের চিঠি দিতে হবে। এহেসান ও তৌহিদুল আনোয়ার একই গ্রুপ করেন।’

জানতে চাইলে ইউনিওশান শিপিং লাইন্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অঞ্জন মজুমদার চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমাদের দুটি প্রতিষ্ঠানই শুধু নয়। দলীয় নেতা ও ছাত্রনেতাদের খবরদারিতে এখানকার প্রায় ব্যবসায়ি অতিষ্ঠ। তাদের কথা মতো কাজ দিতে হবে। না দিলে হুমকি ও বিভিন্নভাবে হয়রানি ও নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হবে। অথচ এই শিপিং এজেন্ট বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে প্রতিনিয়ত। একশ্রেনীর বেকার যুবকদের এখানে কর্মসংস্থান হচ্ছে।’

বেশ কয়েকজন ভূক্তভোগীরা জানায়, শুধুমাত্র একটি হুমকি সামনে আসছে। আগ্রাবাদ এলাকায় অন্তত ১০০টির মতো শিপিং এজেন্ট অফিস রয়েছে। প্রতিনিয়ত তারাসহ আরও কয়েকটি গ্রুপের এভাবে চিঠি দিতে হুমকি-ধামকি নিয়মিত ব্যাপারে হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের কথা মতো জাহাজের কাজের চিঠি দিতে হবে। তাদের অত্যাচারের কারণে অনেক ব্যবসায়ি ব্যবসা ছেড়েও দিয়েছেন। অনেকেই চলে গেছেন এই এলাকায় অফিস ছেড়ে।

এই জানতে চাইলে নগর যুবলীগ নেতা তৌহিদুল আনোয়ারকে মুঠোফোন করা হয়। ওই সময় তিনি কল ধরে কেটে দেন। পরবর্তীতে আবার কল করা হলে তিনি কল রিসিভ করেননি।

বিষয়টি নিশ্চিত করে ডবলমুরিং থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ মাহাবুব রব্বানী অপু চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘গতকাল জিডির কাজ শেষ করতে রাত হয়ে গিয়েছিল। তাই খবর নিতে পারিনি। এখন যাব, সিসিটিভি ফুটেজ ও কল রেকর্ডের তথ্যের খোঁজ খবর নিব। সত্যতা পাওয়া গেলে পরবর্তীতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এমএ/এমএফও

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ksrm