চট্টগ্রামের লালদিয়ায় সাড়ে ৯ হাজার কোটির টার্মিনাল নির্মাণ শুরু, ভিড়বে ৬ হাজার কনটেইনারের জাহাজ
বদলে যাবে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা
চট্টগ্রামের পতেঙ্গার লালদিয়ার চরে দেশের কনটেইনার পরিবহন খাতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগে নির্মিত দেশের প্রথম কনটেইনার টার্মিনাল হিসেবে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হল রোববার (৩০ আগস্ট)। ডেনমার্কের মায়ের্সক গ্রুপের প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস প্রায় ৯ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা বিনিয়োগে টার্মিনালটি নির্মাণ করছে।

চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় লালদিয়ার ৪৯ দশমিক ১৫ একর জমিতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় গড়ে উঠবে টার্মিনালটি। রোববার (৩০ আগস্ট) সকালে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম টার্মিনাল অপারেটর এপিএম টার্মিনালস অন্যতম বড় কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান। লয়েডস লিস্টের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, কনটেইনার ওঠানো-নামানোর হিসাবে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান বিশ্বে চতুর্থ। ২০২৪ সালে এপিএম টার্মিনালস ৫ কোটি ৩২ লাখ একক কনটেইনার ওঠানো-নামানো করেছে, যা বিশ্বের মোট কনটেইনার পরিবহনের ৫ দশমিক ৭ শতাংশ।
অর্থনীতির লক্ষ্যে মাইলফলক
অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সরকারের এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্যে চট্টগ্রামের লালদিয়ায় এপিএম টার্মিনাল নির্মাণ বড় মাইলফলক। চট্টগ্রাম শুধু বাংলাদেশের নয়, পুরো অঞ্চলের জন্য একটি লজিস্টিক হাব হয়ে উঠবে।
মন্ত্রী বলেন, ‘লালদিয়া প্রকল্প ছাড়াও আমরা বঙ্গোপসাগরের উপকূলরেখাজুড়ে আরও বেশ কয়েকটি বড় বন্দরসুবিধা, প্রকল্প ও লজিস্টিক সেন্টার স্থাপনের বিষয়ে আলোচনা করছি।’
নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, ‘আজ নতুন অধ্যায় রচিত হতে যাচ্ছে। আমাদের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য আন্তর্জাতিক মানের হতে চলেছে। এপিএম টার্মিনাল লালদিয়া পিপিপি পদ্ধতিতে বড় বিনিয়োগ। অনেক ফ্যাসিলিটিজ থাকবে। নিশ্চয়ই এটি জাতির জন্য সুসংবাদ।’
অনুষ্ঠানে এপিএম টার্মিনালসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রমেশ ডেভিড বলেন, পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে লালদিয়া টার্মিনাল বছরে প্রায় ১০ লাখ (১ মিলিয়ন) টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করতে পারবে। এতে বাংলাদেশের কনটেইনার পরিবহনসক্ষমতায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি যোগ হবে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন এপিএম টার্মিনালস বিভির গ্লোবাল হেড অব বিজনেস ইমপ্লিমেন্টেশন জেক ক্রেইগ, ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়া। উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এসএম মনিরুজ্জামান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতসহ অনেকে।
২০২৯ সালের মধ্যে নির্মাণ
গত বছরের ১৭ নভেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এপিএম টার্মিনালসের এ সংক্রান্ত চুক্তি হওয়ার পর গত ২২ এপ্রিল লালদিয়ার ৪৯ দশমিক ১৫ একর জমি এপিএম টার্মিনালসকে বুঝিয়ে দেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ। পিপিপির আওতায় ২০২৯ সালের শেষ নাগাদ টার্মিনালটির নির্মাণকাজ শেষ করার কথা রয়েছে। ২০৩০ সালে এটি চালু হওয়ার কথা। একটানা ৩০ বছর টার্মিনালটি পরিচালনা করবে এপিএম টার্মিনালস। চুক্তির শর্ত পূরণ সাপেক্ষে পরিচালনার মেয়াদ আরও ১৫ বছর বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। প্রকল্পে এপিএম টার্মিনালসের স্থানীয় অংশীদার হিসেবে আছে দেশীয় কিউএনএস কনটেইনার সার্ভিসেস লিমিটেড।
প্রায় ৬১৩ মিটার দীর্ঘ টার্মিনালে ৭টি আধুনিক গ্যান্ট্রি ক্রেনসহ প্রায় ৮০ ধরনের যন্ত্রপাতি থাকবে। এসব যন্ত্রপাতির বড় অংশ জ্বালানির পরিবর্তে বিদ্যুতে পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।
সক্ষমতা বাড়বে ৯ লাখ কনটেইনার
জার্মানভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হামবুর্গ পোর্ট কনসাল্টিংয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের চারটি কনটেইনার টার্মিনালে বছরে প্রায় ৩৫ লাখ একক কনটেইনার ওঠানো-নামানোর সক্ষমতা রয়েছে। লালদিয়া টার্মিনাল চালু হলে আরও ৯ লাখ একক কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা যুক্ত হবে। এতে বন্দরের মোট সক্ষমতা বেড়ে বছরে প্রায় ৪৪ লাখ একক কনটেইনারে দাঁড়াবে।
বর্তমানে বন্দরের মূল টার্মিনালগুলোতে সর্বোচ্চ প্রায় সাড়ে ৯ মিটার ড্রাফট এবং ২ হাজার ৮০০ একক কনটেইনার ধারণক্ষমতার জাহাজ ভেড়ানো যায়। এপিএম টার্মিনালসের তথ্য অনুযায়ী, লালদিয়ায় সাড়ে ১০ মিটার ড্রাফটের প্রায় ৬ হাজার একক কনটেইনার ধারণক্ষমতার জাহাজ ভেড়ানো যাবে। ৬১৩ মিটার দীর্ঘ জেটিতে একসঙ্গে তিনটি তুলনামূলক ছোট জাহাজ অথবা দুটি বড় জাহাজ ভেড়ানোর সুযোগ থাকবে।
বন্দরের আয়, সেবায় প্রতিযোগিতা
বছরে প্রথম ৮ লাখ একক কনটেইনার ওঠানো-নামানো পর্যন্ত প্রতিটির জন্য এপিএম টার্মিনালসের কাছ থেকে ২১ ডলার করে পাবে বন্দর কর্তৃপক্ষ। ৮ লাখের বেশি থেকে ৯ লাখ পর্যন্ত প্রতিটি কনটেইনারের জন্য পাওয়া যাবে ২৩ ডলার। টার্মিনাল চালুর আগে এককালীন ফি হিসেবে বন্দর কর্তৃপক্ষ পাবে ২৫০ কোটি টাকা।




