চট্টগ্রামের ফুলের রাজধানীতে প্রতিদিন ২০ লাখ টাকার ফুল বিক্রি, উৎসবে ছাড়ায় কোটি

চাহিদা বাড়ছে সূর্যমুখী-অর্কিডের

ফুল ভালোবাসে না এমন মানুষ বোধহয় পৃথিবীতে একজনও নেই। ফুল হলো শুভ্রতার প্রতীক, ভালোবাসার প্রতীক। কেউ বন্ধুর হাতে তুলে দেন ফুল, আবার কেউ কেউ একগুচ্ছ টুকটুকে লাল গোলাপ কিনে প্রেয়সীর হাতে দেন অভিমান ভাঙাতে। চট্টগ্রাম নগরীতে ফুলপ্রেমীদের জন্য চেরাগী পাহাড় যেন এক টুকরো ‘রঙিন পৃথিবী’।

চট্টগ্রামের ফুলের রাজধানীতে প্রতিদিন ২০ লাখ টাকার ফুল বিক্রি, উৎসবে ছাড়ায় কোটি 1

চেরাগী পাহাড় মোড় থেকে ডিসি হিলের নার্সারি গেট—এই আধ কিলোমিটার রাস্তা হেঁটে গেলে বাতাসে ভেসে আসে বাহারি ফুলের সুঘ্রাণ। প্রতিদিনই সরব থাকে এখানকার ফুলের বাজার। বিভিন্ন রংয়ের গোলাপ, রজনীগন্ধা, গাঁদা, জারবেরা, কার্নেশন, অর্কিড, লিলি, গিপসি, সূর্যমুখীসহ দেশি-বিদেশি নানা জাতের ফুলে সাজানো থাকে প্রতিটি দোকান। নগরের যে কোনো অনুষ্ঠানে ফুলের চাহিদা মেটাতে লোকজনের প্রথম পছন্দ এই জায়গা।

চট্টগ্রামের ফুলের রাজধানীতে প্রতিদিন ২০ লাখ টাকার ফুল বিক্রি, উৎসবে ছাড়ায় কোটি 2

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিদিনই কোনো না কোনো অনুষ্ঠানের জন্য মানুষ ফুলের অর্ডার দিয়ে যায়। চট্টগ্রামের চকরিয়াসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে ফুলে আসে এখানে। এছাড়া যশোর, চুয়াডাঙ্গা, সাতক্ষীরা ও রংপুর থেকে ফুল এনে বিক্রি করা। আগে গোলাপের চাহিদা বেশি থাকলেও এখন সূর্যমুখী, জারবেরা, কার্নেশন, অর্কিড ও লিলির চাহিদাও বেড়েছে। সাধারণ সূর্যমুখীর দাম ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত হয়। সাধারণ গোলাপ পিস ১৫ থেকে ৩০ টাকা, জারবেরা ৩০ থেকে ৬০ টাকা, কার্নেশন ৫০ থেকে ৮০ টাকা, রজনীগন্ধা ২০ থেকে ৩০ টাকা, গাজরা ৪০ থেকে ৬০ টাকা, অর্কিড ২০০ থেকে ৪০০ টাকা এবং লিলি ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়।

ব্যবসায়ীরা আরও জানান, শুক্রবার ও শনিবার এবং সরকারি ছুটির দিনে ক্রেতা তুলনামূলক বেশি থাকেন। আর বিয়ের মৌসুম এলেই বাড়ে ব্যস্ততা। বরের গাড়ি, বিয়ের মঞ্চ, গায়ে হলুদ, সংবর্ধনাসহ বিভিন্ন আয়োজনে তখন ফুলের চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। বিদেশি বিভিন্ন ধরনের ফুলও বিক্রি হয় এখানে। তবে বিশেষ দিবস ও বিয়ের মৌসুমে এসব ফুলের দাম কিছুটা বেড়ে যায়।

চেরাগীর ফুল ব্যবসায়ী মো. রাকিব বলেন, ‘আগে নির্দিষ্ট কয়েকটি দিবসে বিক্রি বেশি হতো। এখন প্রায় সারা বছরই মানুষ ফুল কিনছেন। অনেকেই কোনো উপলক্ষ ছাড়াই নিজের জন্যও ফুল নিয়ে যান। বিশেষ করে সূর্যমুখীর চাহিদা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে।’

মো. জসিম আরেক ব্যবসায়ী বলেন, ‘চেরাগীর দোকানগুলোতে বিক্রি হওয়া ফুলের বড় অংশ আসে যশোর থেকে। এছাড়া কক্সবাজারের চকরিয়া থেকেও বিভিন্ন ফুল সরবরাহ করা হয়। আমদানি করা কিছু ফুলও রাখা হয় ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী।’

ফুল কিনতে আসা বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমি কলেজ জীবন থেকে ফুল কিনতাম। টাকা জমিয়ে এখনও অনেক ফুল কিনি। এখন মন ভালো করতে, বান্ধবী কে দিই, মাকে দিই। আবার কাউকে ধন্যবাদ জানাতেও ফুল দিই। ফুলের মধ্যে একটা আলাদা আন্তরিকতা ভালোবাসা আছে।’

এ সময় কথা হয় পাশে থাকা অপর এক ক্রেতার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘অনেক কথা মুখে বলা যায় না। একটা ফুল অনেক সময় সেই না বলা অনুভূতিটুকু সহজেই প্রকাশ করে দেয়।’

চট্টগ্রাম ফুল ব্যবসায়ী ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ জসিম বলেন, ‘চট্টগ্রামে একটি বড় পাইকারি ফুলের ব্যবসায় বা দোকানের বার্ষিক বিক্রি প্রায় ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। সাধারণ সময়েও প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার ফুল বিক্রি হয়। ভালোবাসা দিবস, পহেলা ফাল্গুন ও পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে ফুলের চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এ সময় মৌসুমি বিক্রি ১ কোটি টাকারও বেশি ছাড়িয়ে যায়।’

তিনি বলেন, ‘বিয়ের গাড়ি ফুল দিয়ে সাজানোর খরচ ডিজাইন, ব্যবহৃত ফুলের ধরন এবং বিয়ের লগ্নের ওপর নির্ভর করে নির্ধারণ করা হয়। দেশি ফুল দিয়ে সাধারণ ডেকোরেশনের খরচ ২ হাজার টাকা থেকে শুরু হলেও, প্রিমিয়াম বা বিদেশি ফুল ব্যবহার করলে একটি গাড়ি সাজাতে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে।’

ইট-পাথরের এই ব্যস্ত শহরে মানুষের মন ভালো করার রসদ যেন এই চেরাগী পাহাড়ের ফুলের বাজারে। একগুচ্ছ ফুল হয়তো মানুষের মনের দুঃখ কিছুটা হলেও ভুলিয়ে দিতে পারে। তাইতো আমেরিকার বিখ্যাত দার্শনিক রালফ ওয়াল্ডো এমারসন বলেছেন—‘পৃথিবী ফুলে হাসে’।

ডিজে

ksrm