চট্টগ্রামের দুই ঋণখেলাপি প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণ ৯ জুন, আগেই ‘এমপি’ সেজে মাঠে আসলাম-সরওয়ার

ফলাফল ঘোষণা ও শপথ গ্রহণের সুযোগ চেয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের দুই আসনে বেসরকারিভাবে বিজয়ী বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরী ও সারোয়ার আলমগীরের আবেদন নথিভুক্ত করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। একই সঙ্গে পৃথক দুই আবেদনের শুনানির জন্য আগামী ৯ জুন দিন নির্ধারণ করেছেন আদালত।

বৃহস্পতিবার (১৪ মে) প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন পাঁচ বিচারপতির আপিল বেঞ্চ এ আদেশ দেন। আদালতে আংশিক শুনানি শেষে আবেদন দুটি নথিভুক্ত করা হয়।

এদিকে সংসদ সদস্য হিসেবে গেজেট প্রকাশ না হলেও আসলাম চৌধুরী ও সরওয়ার আলমগীর সীতাকুণ্ড ও ফটিকছড়িতে এমপির মতো কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সরকারি অনুষ্ঠান, উন্নয়ন প্রকল্প উদ্বোধন ও প্রশাসনিক আয়োজনে অংশ নিয়ে কোথাও কোথাও প্রধান অতিথির ভূমিকাতেও দেখা গেছে তাদের। ‘সংসদ সদস্য’ হিসেবে এ ধরনের কার্যক্রম চালানো আদালতের আদেশকে অকার্যকর করে দেওয়ার শামিল বলে মনে করছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা এবং এটি আদালত অবমাননার আওতায় পড়তে পারে।

চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে ঋণখেলাপির অভিযোগ ওঠার পর নির্বাচন কমিশনে শুনানি শেষে গত ১৮ জানুয়ারি তাঁর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়। ইসির সেই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্তৃপক্ষ রিট করলে হাইকোর্ট তা খারিজ করে দেন। পরে হাইকোর্টের ওই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। একই আদেশের বিরুদ্ধে জামায়াতের প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকী লিভ টু আপিল করেন।

এরপর সোমবার (৩ ফেব্রুয়ারি) আপিল বিভাগ আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বহালের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল মঞ্জুর করেন। তবে আদালত তাঁকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দিলেও আদেশে বলা হয়, তিনি নির্বাচনে সফল হলে আপিলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট আসনের ফলাফল প্রকাশ স্থগিত থাকবে।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আসলাম চৌধুরী সর্বাধিক ভোট পান। কিন্তু আদালতের নির্দেশনার কারণে তাঁর ফলাফল প্রকাশ করা হয়নি। এ অবস্থায় ফলাফল ঘোষণা ও শপথ গ্রহণের সুযোগ চেয়ে তিনি আপিল বিভাগে আবেদন করেন।

একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয় চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনের বিএনপি প্রার্থী সারোয়ার আলমগীরের ক্ষেত্রেও। তাঁর প্রার্থিতা বহালের বিরুদ্ধে করা লিভ টু আপিলও গত ৩ ফেব্রুয়ারি মঞ্জুর করেন আপিল বিভাগ। তবে তাঁকেও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়, শর্ত ছিল আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিজয়ী হলেও ফলাফল প্রকাশ করা যাবে না।

পরবর্তীতে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে সারোয়ার আলমগীরও সর্বাধিক ভোট পান। কিন্তু আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে তাঁর ফলাফলও প্রকাশিত হয়নি। পরে ফলাফল ঘোষণা ও শপথের সুযোগ চেয়ে তিনিও পৃথক আবেদন করেন।

জামায়াত প্রার্থীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মনির সাংবাদিকদের বলেন, ‘আজ আংশিক শুনানি হয়েছে। আবেদন দুটি নথিভুক্ত করেছেন সুপ্রিম কোর্ট। আগামী ৯ জুন শুনানির জন্য দিন ঠিক করা হয়েছে। ওইদিন শুনানি শেষে আদালত আদেশ দেবেন।’

তবু ‘এমপি’ সেজে মাঠে আসলাম-সরওয়ার

সংসদ সদস্য হিসেবে গেজেট প্রকাশ না হলেও আসলাম চৌধুরী ও সরওয়ার আলমগীর সীতাকুণ্ড ও ফটিকছড়িতে এমপির মতো কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সরকারি অনুষ্ঠান, উন্নয়ন প্রকল্প উদ্বোধন ও প্রশাসনিক আয়োজনে অংশ নিয়ে কোথাও কোথাও প্রধান অতিথির ভূমিকাতেও দেখা গেছে তাদের।

চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনের প্রার্থী আসলাম চৌধুরী এবং চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনের প্রার্থী সরওয়ার আলমগীরকে নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এমন চিত্র দেখা গেছে। অনেক অনুষ্ঠানের ব্যানারে তাঁদের নাম না থাকলেও বক্তব্যের সময় সংসদ সদস্য হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস ও ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখসহ বিভিন্ন সরকারি অনুষ্ঠানে সীতাকুণ্ডে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আসলাম চৌধুরী। ১৭ এপ্রিল মহালঙ্কা এলাকার জিন্নাত আলী চৌধুরী নুরানি মাদ্রাসায় নবনির্মিত মসজিদ ভবনের উদ্বোধনও করেন তিনি। সেই উদ্বোধনী ফলকে লেখা ছিল, ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের চট্টগ্রাম-৪ আসনের সংসদ সদস্য আসলাম চৌধুরী’। পরে এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হলে উপজেলা বিএনপির সভাপতি কমল কদর ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মোরছালীন ফেসবুক থেকে ছবিগুলো সরিয়ে ফেলেন বলে জানা গেছে।

গত ১৯ এপ্রিল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় থেকে টিআর কর্মসূচির জন্য ৩০ লাখ টাকা, কাবিটা কর্মসূচির জন্য ২৫ লাখ টাকা এবং কাবিখা কর্মসূচির জন্য ২০ টন চাল ও ২০ টন গম বরাদ্দ দেওয়া হয়। এসব বরাদ্দ এখনও বিতরণ হয়নি। তবে রোজার ঈদের আগে আসা ভিজিএফের ১০ লাখ টাকা উপজেলা বিএনপির নেতাদের সমন্বয়ে বণ্টন করা হয়েছে। বর্তমানে আসলাম চৌধুরীর পক্ষে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্প দেখাশোনা করছেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মোরছালীন।

অন্যদিকে ফটিকছড়িতেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। গত ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে উপজেলা পরিষদের পক্ষে ‘সংসদ সদস্য’ হিসেবে সরওয়ার আলমগীরকে সঙ্গে নিয়ে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানান ইউএনও সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহিম। এ সময় অন্য সরকারি কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। সেদিন তিনি সরকারি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির আসনেও বসেন।

পহেলা বৈশাখে উপজেলা প্রশাসনের শোভাযাত্রার উদ্বোধনও করেন সরওয়ার আলমগীর। ২৫ এপ্রিল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষি পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় কৃষকদের মধ্যে বিনা মূল্যে সার ও আউশ ধানের বীজ বিতরণ অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন তিনি। একই দিন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তৌহিদুল আলমসহ অন্য কর্মকর্তারা তাঁর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এর আগে ২১ ফেব্রুয়ারি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তারা তাঁকে নিয়ে শহীদ মিনারে ফুল দেন।

প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের স্থগিতাদেশ উপেক্ষা করে ‘সংসদ সদস্য’ হিসেবে কার্যক্রম চালানো আদালতের আদেশকে অকার্যকর করে দেওয়ার শামিল বলে মনে করছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা এবং এটি আদালত অবমাননার আওতায় পড়তে পারে। আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আসলাম চৌধুরী ও সরওয়ার আলমগীর রাষ্ট্রের কাছে ‘স্থগিত’ অবস্থায় রয়েছেন। মামলার চূড়ান্ত রায়ে ঋণখেলাপি প্রমাণিত হলে তাঁকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার সম্ভাবনাও রয়েছে বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা।

সিপি

ksrm