চট্টগ্রামের ডাক্তার প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে দুর্ধর্ষ পর্বত আমা-দাবলামের চূড়োয়

‘আঁরা চাটগাইয়া নওজোয়ান, দইজ্জার কুলত বসত গরি, সিনা-দি ঠেকাই ঝড় তুফান’— চট্টগ্রামের ভাষায় গাওয়া গানটিতে সুরে সুরে উঠে এসেছে চট্টগ্রামের মানুষের দুর্দমনীয় সাহসের কথা। এবার সেই দইজ্জারকূলের সন্তান বাবরই অভাবনীয় সাহস দেখালেন হিমালয়ের সবচেয়ে ভয়ংকর শৃঙ্গ ‘আমা-দাবলাম’ জয় করে। প্রথম বাংলাদেশি পর্বতারোহী হিসেবে বাবর উঠলেন হিমালয়ের প্রায় সাড়ে ২২ হাজার ফুটের ভয়ংকর এই পর্বতটির চূড়োয়। যুগপৎ পাথর ও বরফে আরোহণের বিশেষ দক্ষতা প্রয়োজন হয় বলে আমা-দাবলাম পর্বত যেকোনো অভিযাত্রীর জন্যই খুবই কঠিন ও বিপজ্জনক।

চট্টগ্রামের ডাক্তার প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে দুর্ধর্ষ পর্বত আমা-দাবলামের চূড়োয় 1

মঙ্গলবার (২৫ অক্টোবর) নেপালের সময় সকাল ৯টায় আমা-দাবলাম পর্বতটির শৃঙ্গে পৌঁছে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে লালসবুজ পতাকা উড়িয়ে পর্বতটির চূড়ায় পা রাখেন চট্টগ্রামের সন্তান ডা. বাবর আলী। এর আগে এভারেস্টজয়ী বাংলাদেশি পর্বতারোহী এমএ মুহিত ২০১৮ সালের অক্টোবরে এই পর্বতটি জয় করার চেষ্টা করলেও তাতে সফল হতে পারেননি।

চট্টগ্রামের ডাক্তার প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে দুর্ধর্ষ পর্বত আমা-দাবলামের চূড়োয় 2

চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার নজুমিয়া হাট এলাকার সন্তান বাবরের পেশা ডাক্তারি হলেও নেশা সবসময়ই পর্বত আরোহন। সেই নেশায় তিনি এর আগেও দেশে ও দেশের বাইরে জয় করেছেন নানান উচ্চতার বিভিন্ন পর্বত। পর্বত আরোহনের কায়দা আরও নিপুণভাবে শিখতে ভারতের নেহেরু ইন্সটিটিউট অব মাউন্টেনিয়ারিং থেকেও বাবর করেছেন বিশেষ কোর্সও। শুধু তাই নয়, পর্বতারোহীদের নিয়ে চট্টগ্রামভিত্তিক সংগঠন ‘ভার্টিকাল ড্রিমারসে’র প্রতিষ্ঠাকালীন সাংগঠনিক সম্পাদকও তিনি।

হিমালয় পর্বতশৃঙ্গের অন্যতম সুন্দর ও ভয়ংকর পর্বতের নাম ‘আমা-দাবলাম’। নেপালিরা মনে করে ‘আমা-দাবলাম’ সৌন্দর্যের রানি। নেপালি ভাষায় ‘আমা’ শব্দের অর্থ ‘মা’ আর ‘দাবলাম’ বাংলা অর্থ ‘নেকলেস’ বা গলার হার। সুন্দর হার পরে এক মা তার দুই বাহু দিয়ে দুই সন্তানকে আগলে রেখেছেন। উচ্চতায় এটি ২২ হাজার ৩৪৯ ফুট— যা হিমালয়ের সর্বোচ্চ পর্বত এভারেস্টের তুলনায় কিছুটা ছোট, কিন্তু এভারেস্টের চেয়ে অনেক বেশি ভয়ংকর। এ কারণে ‘আমা-দাবলাম’ জয় করতে পেরেছেন খুব কম মানুষই। খাড়া পর্বত, আবহাওয়া ও অমসৃণ রাস্তাই এই পর্বতটির বিশেষত্ব— যা এভারেস্টের তুলনায় বেশি ভয়ংকর করে তুলেছে ‘আমা-দাবলাম’কে। এমন অধরা পর্বতের ছবি তাই স্থান করে নিয়েছে নেপালে প্রচলিত এক টাকার নোটেও।

Yakub Group

ডা. বাবর আলী একটি বেসরকারি এনজিওতে কর্মরত আছেন মেডিকেল অফিসার হিসেবে। ২০১৪ সালে নিজেদের ক্লাব ‘ভার্টিকাল ড্রিমারস’ থেকে আয়োজিত হিমালয় অভিযানে বাবর সামিট করেন এক পাঁচ হাজার মিটার উচ্চতার পর্বত।

সেই তার হিমালয়ে পথচলা শুরু। এরপর পর্বতারোহণের বিশুদ্ধতম ধরন বলে পরিচিত আলপাইন স্টাইলে ২০১৬ সালে ক্লাব থেকে সামিট হয় ভারতের মাউন্ট ইয়ানাম, যা ছিল বাংলাদেশ থেকে প্রথমবার কোন ২০০০০ ফুট উচ্চতার পর্বত সামিট, সেই দলের সদস্য ছিলেন তিনি। পর্বতারোহণকে ধ্যানজ্ঞান মেনে তিনি বেসিক মাউন্টেনিয়ারিং কোর্স করেন ভারতের নেহেরু ইন্সটিটিউট অফ মাউন্টেনিয়ারিং থেকে। ২০১৪ সাল থেকে প্রায় প্রতিবছর করেছেন এক বা একাধিক হিমালয় অভিযান। এছাড়াও নিজেকে উপযুক্ত করে তুলতে বাবর নিয়মিত দৌড়ান, করেছেন ক্রস কান্ট্রি সাইক্লিং, করেন কায়াকিং, পায়ে হেঁটে পথ চলেছেন টানা ৬৪ দিন। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি লক্ষ্য হিসেবে স্থির করেন অধরা ‘আমা-দাবলাম’কে।

লক্ষ্য পূরণ করতে ৯ অক্টোবর অভিযানের জন্য নেপালের পথে উড়াল দেন বাবর। ১১ অক্টোবর প্রয়োজনীয় অনুমতি ও প্রস্তুতি থাকার পরও পর্বত আরোহনে বাঁধা হয়ে দাড়ায় আবহাওয়া। কাঠমুন্ডু থেকে লুকলার বিমান চলাচল বন্ধ থাকে বৈরী আবহাওয়ার জন্য। কিন্তু অদম্য ইচ্ছের কাছে বাঁধা হয়ে দাড়াতে পারেনি আবহাওয়া। বিমানপথে  না গিয়ে সড়ক ও পায়ে হেঁটেই ১৯ অক্টোবর গন্তব্যস্থান আমা-দাবলামের বেস ক্যাম্পে পৌঁছান বাবর।

গত রোববার (২৩ অক্টোবর) ভোরে বেসক্যাম্প থেকে যাত্রা শুরু করে বাবর উঠে যান ক্যাম্প-১ এ এবং পর দিন উঠেন ক্যাম্প-২ এ। ২৫ অক্টোবর মধ্যরাত ১২টা ১৫ মিনিটে শুরু হয় চূড়ার লক্ষ্যে তার চূড়ান্ত চেষ্টা। ভোরে তিনি এই পর্বতের শীর্ষে পৌঁছতেই বাংলাদেশের পর্বতারোহনে রচিত হয় নতুন এক ইতিহাস। ওইদিন বিকেলেই তিনি বেসক্যাম্পে নেমে আসেন সুস্থ অবস্থায়।

বাবরের এই দুর্গম পর্বতজয়ের যাত্রায় সঙ্গী ছিলেন বাবরের বন্ধু ও গাইড বীরে তামাং।
 
বলে রাখা ভালো, ‘আমা-দাবলাম’ জয়ের পুরো অভিযানটিই হয়েছে ডা. বাবরের নিজের টাকায়। তবে এই অসাধ্য সাধনে ছিল নিজেদের ক্লাব ভার্টিক্যাল ড্রিমার্সের অকুণ্ঠ সহযোগিতা।

নেপালের খুম্বু রিজিওনে অবস্থিত আমা-দাবলাম পৃথিবীর অন্যতম চ্যালেঞ্জিং চূড়া। ৬ হাজার ৮১২ মিটার এ পর্বতকে সম্মানের চোখে দেখেন পৃথিবীর বাঘা বাঘা পর্বতারোহীরা। ১৯৬১ সালে স্যার এডমন্ড হিলারী নেতৃত্বে এ পর্বতের চূড়ায় প্রথমবারের মতো পৌছাতে পারেন মাইক গিল, গ্যারি বিশপ ও মাইক ওয়ার্ড। অভিযাত্রী দলের দলনেতা হয়েও এডমন্ড হিলারী আমা দাবলাম সামিট করতে পারেননি মূলত নেপাল সরকারের অনুমতি লাভের জটিলতায়।

দুর্গম আমা-দাবলাম জয়ের বিষয়ে পর্বতারোহীদের নিয়ে চট্টগ্রামভিত্তিক সংগঠন ‘ভার্টিকাল ড্রিমারসে’র সাবেক সভাপতি ব্যাংকার ফরহান জামান চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘ক্লাইম্বিংয়ের এক চরম নেশা পেয়ে বসে বাবরকে। নিয়মিত তিনি দেশের সীতাকুণ্ড ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন পাহাড়ে চড়ে বেড়িয়েছেন। এমনকি এই ‘আমা-দাবলাম’ জয়ের নেশায় ছেড়েছেন চাকরিও। তবে এত ত্যাগের পরও যে বাবর শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছেন, তাতেই আমরা খুশি।’

ফরহান বলেন, ‘মানুষ হিমালয় বলতে শুধু এভারেস্টকেই বোঝে। আসলে এভারেস্ট ছাড়াও হিমালয়ে অবস্থিত প্রায় সব পর্বতের মধ্যে এই আমা-দাবলাম হলো সবচেয়ে ভয়ংকর। কারণ এই পর্বতটি এত বেশিই খাড়া যে খুব কম মানুষই এই পর্বতটিতে ওঠার চেষ্টা করেছে। এর তুলনায় মাউন্ট এভারেস্টের পথ অনেক সোজা।’

সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ksrm