চট্টগ্রামের জামায়াত ‘ডোনার’ও পেলেন প্রধানমন্ত্রীর অনুদান!

4

সাত বছর আগে ফেসবুকে তিনি লিখেছিলেন— ‘শেখ হাসিনার আছে পুলিশের শক্তি। আর আমাদের ঈমানের শক্তি। জীবন দিয়ে হলেও করবো আল্লামা সাইদীকে মুক্তি।’ যুদ্ধাপরাধের দায়ে যাবজ্জীবন পাওয়া সাঈদীকে মুক্ত করতে না পারলেও মাত্র সাত বছর পর সেই তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ঢুকে অনুদান নিয়ে এলেন খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে।

বৃহস্পতিবার (৭ নভেম্বর) চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চরম্বা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান, জামায়াতে ইসলামীর ‘ডোনার’ সাদাত উল্লাহ দুঃস্থ সাংবাদিক হিসেবে দুই লাখ টাকার অনুদান পান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার হাতে এ অনুদান তুলে দেন। সাদাত উল্লাহ দৈনিক ইনকিলাবের সাংবাদিক হিসেবে ওই অনুদান পেয়েছেন বলে জানা গেছে। এর কয়েক মাস আগেও প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত তহবিল থেকে জামায়াতে ইসলামী সক্রিয় সমর্থক সাদাত উল্লাহ আরও দুই লাখ টাকা অনুদান পেয়েছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

বৃহস্পতিবার (৭ নভেম্বর) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অসুস্থ, অসচ্ছল ও দুর্ঘটনায় আহত সাংবাদিক ও নিহত সাংবাদিক পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আর্থিক সহায়তা ভাতা ও চেক বিতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর পাশে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান এবং তথ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হাসানুল হক ইনু মঞ্চে উপবিষ্ট ছিলেন।

ওই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি সরকারে যখনি এসেছি তখনই চেষ্টা করি, যেহেতু প্রধানমন্ত্রী কল্যাণ ফান্ড আছে একটা। আবার সেটা দেই কেন? কাকে দেই? কেন দেই কোথা থেকে দেই? এই নীতিমালা কি? এই প্রশ্নেরও সম্মুখীন হতে হয়। যেমন আমাদের অফিসে একটা চিঠি এসে গেল। কোন নীতিমালায় প্রধানমন্ত্রী টাকা দেন, আমি বলেছি লিখে দেন, প্রধানমন্ত্রী ইচ্ছার নীতিমালায় দেন। এই ধরনের প্রশ্ন ওঠে। যাই হোক, মানুষকে সহযোগিতা করব, সেটা নিয়েও প্রশ্ন? তারপরে আবার তারাই বলবে, কথা বলার অধিকার নেই।”

ফেসবুকে সাদাত উল্লাহর স্ট্যাটাস
ফেসবুকে সাদাত উল্লাহর স্ট্যাটাস

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন পিআইবি চেয়ারম্যান আবেদ খান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাফর ওয়াজেদ, বিএফইউজের সভাপতি মোল্লা জালাল ও মহাসচিব শাবান মাহমুদ।

সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টে জামায়াত-শিবিরের নেতা কিংবা ডোনার কিংবা জামায়াত সমর্থিত ইউপি চেয়ারম্যান সাদাত উল্লাহকে অনুদান প্রদানসহ ইতিপূর্বে ঘটে যাওয়া আরো কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে বিস্ময় প্রকাশ করে ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি ও চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি রিয়াজ হায়দার চৌধুরী চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী যদি কল্যাণ ট্রাস্টে ঢাকার বাইরের অন্তত চট্টগ্রাম থেকে প্রতিনিধিত্ব থাকতো তাতে এমন করে আজ বিতর্ক হতো না। তাছাড়া বিভাগীয় পর্যায়ে থেকে নির্বাচিত নেতা হিসেবে এই ব্যাপারগুলোতে আমাদের মতামত গ্রহণ করলেও আজ এরকম বিতর্কের কোন সুযোগ তৈরি হতো না।’

তিনি বলেন, ‘কল্যাণ ট্রাস্টে পাঁচজন থাকলে পাঁচজনই ঢাকার। ঢাকার বাইরের কেউ নেই। বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি অনুধাবন করেই ঢাকার বাইরে প্রতিনিধিত্বের বিষয়ে আমার দাবির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। কিন্তু ঢাকার নেতৃত্বের সিন্ডিকেট সেটি হতে দেয়নি।’

অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা বাংলাদেশ ফেডারেশন সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) যুগ্ম মহাসচিব মহসীন কাজী চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘এই লোককে দেখেই আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি ইউপি চেয়ারম্যান এবং অন্য লাইনের লোক। আপনি কেন অসহায়দের তহবিল থেকে টাকা নিচ্ছেন? তখন লোকটি বলল, তার ছেলে নাকি অটিস্টিক, তাই তার চিকিৎসার জন্য সহায়তা নিয়েছেন। এসময় সেখানে উপস্থিত সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের এমডি জাফর ওয়াজেদ তাকে বললেন, স্যুটেট বুটেড হয়ে আপনি কেন অনুদানের টাকা নিতে এলেন?’

জানা গেছে, সাদাত উল্লাহ ২০১২ সালের ৩ মে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চরম্বা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। জামায়াতের প্রত্যক্ষ সমর্থনে তিনি সেবার নির্বাচিত হন।

চরম্বা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মাস্টার শফিকুর রহমান সাদাত উল্লাহকে জামায়াতে ইসলামীর একজন ডোনার (অনুদানদাতা) হিসেবে নিশ্চিত করেছেন।

এর আগে ২০১৩ সালের আগস্টে লোহাগাড়ার চরম্বা ইউপি চেয়ারম্যান থাকাকালে সাদত উল্লাহর বিরুদ্ধে সাতজন ইউপি সদস্য কালোবাজারে ভিজিএফের ৪-৫ হাজার কেজি চাল কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগ তোলেন। চরম্বা ইউপি চেয়ারম্যান চরম্বা ইউনিয়নের দুঃস্থ গরিব লোকজনের জন্য বরাদ্দকৃত ১২ হাজার ৪৬০ কেজি চাল সরকারি গুদাম থেকে তুলে কালোবাজারে বিক্রি করে দেন বলে ইউপি সদস্যরা অভিযোগ করেন।

২০১২ সালের ১১ জুলাই জামায়াতের ইসলামীর তৎকালীন সংসদ সদস্য ও বর্তমান কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর শামসুল ইসলাম কারাগার থেকে জামিনে ছাড়া পাওয়ার পর সাদাত উল্লাহসহ জামায়াত নেতারা তাকে বরণ করে নেন। এ সংক্রান্ত একটি খবর তিনি ফেসবুকে শেয়ার করেন ওই বছরের ১৪ জুলাই।

২০১২ সালের ৩ ডিসেম্বর সাদত উল্লাহর একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসে আহ্বান জানানো হয়— ‘আজ সারাদেশে সমাবেশে ১৪৪ ধারা জারি করার প্রতিবাদে জামায়াতের ডাকে আগামীকাল সারাদেশে সকাল সন্ধ্যা হরতাল সফল করুন।’

২০১২ সালের ৮ ডিসেম্বর নিজের ফেসবুক টাইমলাইনে সাদত উল্লাহ লিখেছেন, ‘হে আল্লাহ, আল্লামা সাঈদীকে আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দাও ..।’

এছাড়া তিনি একটি ছবি শেয়ার করেন, যাতে লেখা ছিল— ‘নিরপরাধ আল্লামা সাইদীর ১ দিনের সাজা হলেও গ্রাম বাংলার লক্ষ লক্ষ মানুষ বাঁশের লাঠি, বর্শা-বল্লম ও তীর-ধনুক হাতে রাস্তায় নেমে পড়বে।’

ওই একই দিনে ফেসবুকে তার আরেকটি স্ট্যাটাস ছিল এরকম— ‘শেখ হাসিনার আছে পুলিশের শক্তি। আর আমাদের ঈমানের শক্তি। জীবন দিয়ে হলেও করবো আল্লামা সাইদীকে মুক্তি। জাগো মুসলিম জাগো। আমরা সাইদী ভক্ত, পারলে ঠেকাও।’

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে জামাত-শিবিরের দায়িত্বশীল কোন পদে ছিলেন না বলে দাবি করে সাদাত উল্লাহ বলেন, ফেসবুকে দেওয়া স্ট্যাটাসগুলো মিথ্যা।

সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

4 মন্তব্য
  1. Nilnirjone বলেছেন

    এক‌টি গুরুতাবপূর্ণ বিষ‌য় আপনাদের সা‌থে শেয়ার কর‌তে চাই। সংবাদের অভিযুক্ত ব্যাক্তিকে আ‌মি চিনি। আমি একজন অ‌বিভাবক, সৈয়দাবাদ এমদাদুল উলুম দুদু ফ‌কির আ‌লিম মাদ্রাসায় আমার সন্তান পড়া‌লেখা ক‌রে। অধ্য‌ক্ষের প্রত্যক্ষ মদ‌দে ইসলা‌মের ই‌তিহাসের প্রভাষক সাদাত উল্লাহ মাদ্রাসায় অনুপ‌স্থিত থা‌কে। উ‌ল্লেখ্য যে অধ্যক্ষ নি‌জেও মাদ্রাসায় অ‌নিয়‌মিত থা‌কেন। কিন্তু নিয়‌মিত বেতন ভাতা উ‌ত্তোলন ক‌রেন। এ ব্যাপা‌রে এলাকাবাসী এবং প্র‌তিষ্ঠা‌নের ক‌য়েকজন শিক্ষক অ‌ভি‌যোগ কর‌লে তা‌তে অধ্যক্ষ কোন কর্ণপাত ক‌রেন‌নি বরং তা‌দের‌কে বি‌ভিন্নভা‌বে হয়রা‌নি কর‌তে থা‌কেন। আ‌মি এলাকার একজন স‌চেতন নাগ‌রিক হি‌সে‌বে আপনার কা‌ছে আ‌র্জি জানা‌চ্ছি যে একজন সাংবা‌দিক হি‌সে‌বে এই অ‌নিয়‌মের সত্যতা যাচাই পূর্বক এই ভন্ডদ্ব‌য়ের বিরু‌দ্ধে ক্ষুরধার লেখ‌নির মাধ্য‌মে তা‌দের ম‌ুখোশ উ‌ন্মোচন কর‌বেন।

  2. রাসেল বলেছেন

    রিয়াজ হায়দার,বেতনভুক্ত কর্মমচারীর মতো ব্যস্ত চট্টগ্রাম শহরে তার মালিক মেয়র হিসেবে কতোটা যোগ্য তা জাহিরে।চট্টগ্রামের কেউ নেই বলে,চামেচিকনে নিজের কপাল খুলার ধান্দায় আছে সে।সাদাত উল্লাহ এবং রিয়াজ হায়দারের মধ্যে খুব একটা তফাৎ নেই।
    6 & 9।

  3. নাজমা আক্তার বলেছেন

    উপরের তথ্য যথার্থ এবং সঠিক।

  4. uddinjihan বলেছেন

    আমি উক্ত মাদ্রাসার একজন অভিভাবক হই। অধ্যক্ষ ও দেলোয়ার নামক শিক্ষক দীর্ঘদিন জেলে ছিলেন। চার্জশিটভুক্ত আসামি হয়েছেন। সেই থেকে এখন পর্যন্ত পূর্ণ বেতন তুলতেছেন। এটা কতটুকু যুক্তিসঙ্গত। অধ্যক্ষ দীর্ঘদিন এতিমখানার টাকা উত্তলন করেছেন। ঐ টাকা প্রকৃত এতিমের জন্য ব্যবহার করেছেন নাকি অন্যখাতে ব্যবহার করেছেন তাহা তদন্তযোগ্য। কারণ তাহার উপর যে ছাত্রাবাস রয়েছে তাহাতে কোন এতিম ছিল না। এতিম আছে আলহাজ্ব মোজাফফর আহমদ চৌধুরীর পরিচালিত এতিম ও হেফজখানায় যেখানে অধ্যক্ষ্যের কোন হাত নেই। আজিজ নামক একজন শিক্ষক সহকারী মাওলানা পদে পদায়ন হয়েছে। সে নাকি ইউসুফ জালাল্কে টকাইয়ে উক্তপদ ভাগিয়ে নিয়েছেন। কারণ ইউসুফ জালালির বাড়ি অনেক দূরে। শাখাওয়াত নামক একজন শিক্ষক রিমা নামক অবৈধ প্রতিষ্ঠান হতে বি.এড গ্রহণ করে এম.পি.ও ভুক্ত হয়েছে। সিরাজ নামক শিক্ষক ৯ম ও ১০ম শ্রেণির দীর্ঘদিন যাবৎ গণিত ক্লাস নিচ্ছেন। সে নাকি উদ্বৃত্ত জুনিয়র শিক্ষক। আর সে সব সময় মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটিতে থাকে। একজন উদ্বৃত্ত শিক্ষক কমিটির মেম্বার থাকা কতটুকু যুক্তিসঙ্গত?

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

আরও পড়ুন