চট্টগ্রামের ছেলে কাতার বিশ্বকাপের বড় ভূমিকায়, গিয়েছিলেন লেবার ভিসায়

কাতার বিশ্বকাপে বাংলাদেশ নেই, তবে বিশ্বকাপজুড়েই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকছেন চট্টগ্রামের সন্তান শিয়াকত আলী। বিশ্বকাপে ম্যাচ পরিচালনায় নিযুক্ত রেফারিদের কো-অর্ডিনেটর হিসেবে কাজ করবেন চট্টগ্রামের এই ছেলে।

চট্টগ্রামের ছেলে কাতার বিশ্বকাপের বড় ভূমিকায়, গিয়েছিলেন লেবার ভিসায় 1

কর্মসূত্রে ২০১৩ সালে কাতারে পাড়ি জমান শিয়াকত আলী। সেখানে বার্সেলোনার একটি রেফারি অন্বেষণ কার্যক্রমে অংশ নিয়েই কপাল খুলে যায় তার।

চট্টগ্রামের ছেলে কাতার বিশ্বকাপের বড় ভূমিকায়, গিয়েছিলেন লেবার ভিসায় 2

কাতার বিশ্বকাপে ম্যাচ পরিচালনায় নিয়োজিত থাকবেন সারা বিশ্বের ৩৬ জন রেফারি, ৬৯ জন সহকারী রেফারি ও ২৪ জন ভিডিও ম্যাচ অফিসিয়াল। তাদের সঙ্গে সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করবেন চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার মরিয়মনগরের ছেলে শিয়াকত আলী।

শিয়াকত আলী বলেন, ‘কাতার ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এবং ফিফা কর্তৃপক্ষ রেফারিদের কো-অর্ডিনেটর হিসেবে ১০ জনকে নিয়োগ দিয়েছে। এর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়া থেকে আমি যোগ হয়েছি। বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেয়ে আমি গর্বিত। সকলের কাছে দোয়া চাই। এখানে আমার দায়িত্ব পালন, আমার দেশকে প্রতিনিধিত্ব করবে। আমার পক্ষ থেকে আমি চেষ্টা করব যেন দায়িত্ব সুন্দর ও ভালোভাবে পালন করতে পারি।’

Yakub Group

খেলাধুলার প্রতি ভালোবাসাই পাল্টে দিয়েছে শিয়াকত আলীর জীবন। সাধারণ একজন শ্রমিকের বদলে তিনি এখন মাঠের মানুষ। কাতারই শুধু নয়, দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন অন্য আরব দেশও। খেলা পরিচালনার জন্য তিনি জর্ডান, কুয়েত, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান ও বাহরাইন সফর করেছেন। সাবেক রেফারি মরহুম মনিরুল ইসলামের অনুরোধে ২০১৬ সালে বাংলাদেশে গিয়ে দুটি ম্যাচও পরিচালনা করেছিলেন শিয়াকত।

কাতার ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনে শিয়াকতকে সবাই চেনে বাঙালি ‘কুরা হাকাম মোহাম্মদ শেখ আলী’ নামে। কুরা অর্থ ফুটবল, হাকাম অর্থ রেফারি। এই পরিচয়েই তিনি পরিচালনা করেছেন প্রায় দুই হাজার ফুটবল ম্যাচ। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক ম্যাচের সংখ্যা ১৫০টি।

চট্টগ্রামের ছেলে শিয়াকত স্কুল পর্যায়ে অ্যাথলেট এবং ভালো সাঁতারু ছিলেন। ২০১৩ সালে জীবিকার খোঁজে এক আত্মীয়ের মাধ্যমে শ্রমিক ভিসায় কাতারে আসেন। ওই সময় স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনার একটি ফুটবল প্রজেক্ট শুরু হয় কাতারে। ওই প্রজেক্টের জন্য স্কুলে স্কুলে গিয়ে খেলোয়াড় সংগ্রহের কাজ করতে তিনি আগ্রহ প্রকাশ করেন কাতারে বার্সেলোনা প্রজেক্টের সিইওর কাছে। বাংলাদেশে স্কুলে ক্রীড়া শিক্ষকতা ও রেফারিংয়ের কথা শুনে ওই সিইও সম্মতি জানান শিয়াকতকে।

শিয়াকত তখন খেলোয়াড় সংগ্রহের পাশাপাশি খেলাও পরিচালনা করেন কয়েক ম্যাচে। বার্সেলোনার সেই প্রজেক্ট শেষে তিনি কাজের সুযোগের জন্য আবেদন করেন কাতার ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনে। সেখানেও মেলে সবুজ সংকেত। প্রথমে কাতার ফুটবলে ১৬ দিনের রেফারি প্রশিক্ষণ শেষ করেন। এরপর কাতারের স্পায়ার একাডেমি থেকে রেফারিং অ্যান্ড স্পোর্টস সাইকোলজিতে স্নাতক সম্পন্ন করেন। এরইমধ্যে রেফারিংয়ের ওপর সি ও ডি ডিপ্লোমা কোর্স শেষ করেছেন। কাতার ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনে বর্তমানে তিনি কাজ করছেন সহকারী রেফারি হিসেবে।

কাতার ফুটবলে বর্তমান এশিয়া চ্যাম্পিয়ন। ২০২২ বিশ্বকাপের এই স্বাগতিক দেশটিতে রেফারিদেরও পারিশ্রমিক ভালো। ফুটবল রেফারি হয়ে শিয়াকতও বেশ ভালোই অর্থ পাচ্ছেন। প্রতি মাসে প্রায় আড়াই হাজার ডলার পান খেলা চালিয়ে।

শিয়াকত জানান, ‘কাতারে রেফারিদের ম্যাচপ্রতি সর্বনিম্ন পারিশ্রমিক ২০০ ডলার। আর সর্বোচ্চ এক হাজার ডলার। রেফারি উন্নয়নে কাতারের বাজেট ৭০০ কোটি টাকা। তাদের ফিফা ও পেশাদারি রেফারি ১২০ জন। ভার (ভিডিও অ্যাসিসটেন্ট রেফারি) প্রজেক্টের জন্য কাতারের বাজেট ২০০ কোটি টাকার মতো।’

শিয়াকত এখন কাতারের ন্যাশনাল রেফারি। এখন অপেক্ষায় আছেন ফিফা ব্যাজধারী রেফারি হওয়ার। শিয়াকতের দেওয়া তথ্যমতে, কাতার ফুটবলে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে তিনিই একমাত্র বাংলাদেশি রেফারি। কাতারে বসেই বাংলাদেশ দলের দুটি খেলায় সহকারী রেফারির ভূমিকা পালন করেছেন। এবার বাংলাদেশ যে দুটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলেছে উভয় ম্যাচেই তিনি ছিলেন পতাকা হাতে। ২০১৭ সালে কাতারে অনুষ্ঠিত এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ ফুটবলে কাতার-বাংলাদেশের ম্যাচে রেফারির প্যানেলে ছিলেন। পরে অবশ্য তাকে আর দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।

তুর্কমেনিস্তান-কাতার, লেবানন-পাকিস্তান সিনিয়র জাতীয় দলের ফিফা প্রীতি ম্যাচ ছাড়াও বয়সভিত্তিক বিভিন্ন দেশের ম্যাচের খেলা পরিচালনা করেছেন শিয়াকত। ক্লাবের বয়সভিত্তিক দলের মধ্যে এসি মিলান, রিয়াল ও অ্যাথলেটিকো মাদ্রিদ, বায়ার্ন মিউনিখ, বোকা জুনিয়র্স, এফসি ফ্রাঙ্কফুটের খেলা পরিচালনা করেছেন আলকাস আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে।

শিয়াকত বলেন, ‘আমার জানা মতে, কাতারই বিশ্বের একমাত্র দেশ যেখানে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন থেকে ক্রীড়া বিজ্ঞানে উচ্চতর ডিগ্রি দেওয়া হয়। নিয়মিত ফিটনেস ট্রেনিং হয় রেফারিদের। তা সপ্তাহে ছয় দিন। প্রতি সপ্তাহে মঙ্গলবার ও বুধবার খেলার আইন-কানুনের ক্লাস হয়।’

সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ksrm