চট্টগ্রামের এলবিয়ন গ্রুপের ৯১ কোটি ‘রাজস্ব ফাঁকি’ ৫ বছরে, অভিযোগ গেল দুদকে

চট্টগ্রামভিত্তিক ওষুধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ লিমিটেড ও তার সহযোগী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ জমা পড়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)। গত পাঁচ করবর্ষে তারা অন্তত ৯০ কোটি ৪৮ লাখ ৮৫ হাজার ৪১২ টাকা আয়কর ও ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে বলে অভিযোগে তুলে উল্লেখ করা হয়েছে, পণ্য আমদানি ও বিক্রির তথ্যও গোপন করে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে এই শিল্প গ্রুপ। বিভিন্ন ডিলারদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা আদায় করলেও প্রদর্শিত বিক্রি তারা কম দেখিয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয় ওই অভিযোগে।

গত ৫ জানুয়ারি এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ লিমিটেড এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো আমদানি ও বিক্রয় তথ্য গোপন করে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে—এমন একটি অভিযোগ জমা পড়েছে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে।

জানা গেছে, ১৯৯১ সালে চট্টগ্রাম নগরীর চান্দগাঁও আবাসিকে একটি ভাড়া ভবনে এলবিয়ন গ্রুপ লিমিটেডের যাত্রা শুরু হয়। এই প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন মো. রাইসুল উদ্দীন সৈকত। বর্তমানে তাদের ১০টির মতো সহযোগী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ লিমিটেড, এলবিয়ন অ্যানিমেল হেলথ লিমিটেড, ব্লু একোয়া ড্রিংকিং ওয়াটার, ফেভারিট লিমিটেড, ক্লিনজি ফরমুলেশন লিমিটেড, এলবিয়ন ট্রেডিং কর্পোরেশন, এলবিয়ন ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেড, সেগাফ্রেডো জেনেতি এসপ্রেসো (ইতালি) নামের রেষ্টুরেন্ট এবং এলবিয়ন স্পেসালাইজড ফার্মা লিমিটেড।

দীর্ঘ সময়ে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক সফলতা বেড়েছে বহুগুণ। তবে ব্যবসার পরিধি বাড়লেও আমদানিকৃত মালামাল ও বিক্রির তথ্য গোপন করে বেশ কয়েক বছর ধরে সরকারকে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আসছে তাদের ওষুধ শিল্প প্রতিষ্ঠানটি— অভিযোগ উঠেছে এমনই।

অভিযোগসূত্রে জানা গেছে, এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ লিমিটেড ওষুধের জন্য প্রয়োজনীয় বোতল প্লাস্টিক কৌটা, রেপিংসহ বিভিন্ন মালামাল কেনার ক্ষেত্রেও সরকারের উৎসে কর কর্তন, ভ্যাট কর্তন না করে বিপুল পরিমাণ আয়কর ও ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে আসছে। ডিলারদের কাছ থেকে ব্যাংক মারফত মাসে অন্তত ২০ কোটি টাকা কালেকশন করা হয়। অথচ সেই হিসেবে প্রদর্শিত বিক্রি অনেক কম দেখিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ডিলারদের দেওয়া কমিশন থেকেও কোনো ধরনের কর কাটে না তারা।

একইসঙ্গে ডাক্তারদের চেক ও নগদে যেসব পেমেন্ট করা হয়, তা থেকে ১৫ শতাংশ ভ্যাট পরিশোধ হয় না। এমনকি ১০ শতাংশ উৎসে আয়করও কর্তন করা হয় না। এমনকি কর্মচারীদের প্রদত্ত বেতন থেকেও উৎসে আয়কর কর্তন করা হয় না।

Yakub Group

এছাড়া এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ লিমিটেডের কাঁচামাল আমদানির প্রায় সকল এলসি খোলা হয় বেসিক ব্যাংক, যমুনা ব্যাংকসহ আরও কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে। এসব হিসাব তদন্ত করলে রাজস্ব ফাঁকির বিষয় বেরিয়ে আসবে বলে দাবি করা হয় অভিযোগে।

যেভাবে ফাঁকি দেওয়া হয় রাজস্ব

এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ লিমিটেডের গত পাঁচ বছরে প্রকৃত আমদানি এবং প্রদর্শিত তথ্যে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি ২০১৭-১৮ করবর্ষে আমদানি দেখিয়েছে ৬৫ কোটি ৩২ লাখ ২৫ হাজার ৯২৭ টাকা। এর মধ্যে কাগজে-কলমে আমদানি প্রদর্শন করেছে ৫১ কোটি ৩৬ লাখ ৩৬ হাজার ৯৭১ টাকা। এর বিপরীতে গোপন আমদানি হয়েছে ১৩ কোটি ৯৫ লাখ ৮৮ হাজার ৯৫৬ টাকা।

২০১৮-১৯ করবর্ষে এলবিয়ন আমদানি দেখিয়েছে ৮৫ কোটি ৭৯ লাখ ৯৫ হাজার ৯৫৭ টাকা। এর মধ্যে কাগজে-কলমে তা প্রদর্শন করেছে ৭০ কোটি ৮২ লাখ ৪১ হাজার ৯৫৬ টাকা। এর বিপরীতে গোপন আমদানি হয়েছে ১৪ কোটি ৯৭ লাখ ৫৪ হাজার ১ টাকা।

২০১৯-২০ করবর্ষে আমদানি দেখানো হয়েছে ৯১ কোটি ৭২ লাখ ৬৯ হাজার ৮৬৫ টাকা। এর মধ্যে কাগজে-কলমে প্রদর্শন করা হয়েছে ৬৫ কোটি ৯৪ লাখ ৬০ হাজার ৪৬ টাকা। বিপরীতে গোপন করা হয়েছে ২৫ কোটি ৭৮ লাখ ৯ হাজার ৮১৯ টাকা।

২০২০-২১ করবর্ষে আমদানি দেখানো হয়েছে ৮০ কোটি ৬৮ লাখ ৫৮ হাজার ৩৯৮ টাকা। এর মধ্যে কাগজে-কলমে আমদানি প্রদর্শন করা হয়েছে ৫৯ কোটি ১৯ লাখ ৩২ হাজার ৭০ টাকা। এর বিপরীতে গোপন করা হয়েছে ২১ কোটি ৪৯ লাখ ২৬ হাজার ৩২৮ টাকা।

২০২১-২২ করবর্ষে আমদানি দেখানো হয়েছে ১১৫ কোটি ২৯ লাখ ২৭ হাজার ৬৪৭ টাকা। এর মধ্যে কাগজে-কলমে আমদানি প্রদর্শন করা হয়েছে ১০১ কোটি ১ লাখ ২১ হাজার ৩৩৯ টাকা। বিপরীতে গোপন করা হয়েছে ১৪ কোটি ২৮ লাখ ৬ হাজার ৩০৮ টাকা।

এছাড়া ২০২২-২৩ করবর্ষে প্রতিষ্ঠানটি আমদানি দেখিয়েছে ১১৫ কোটি ৬২ লাখ ২৩ হাজার ৯৭৪ টাকা। তবে কাগজে-কলমে কতো দেখানো হয়েছে, সেটা অভিযোগে উল্লেখ করা হয়নি।

নিজেদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস, আইসিডি কমলাপুর ও বেনাপোল কাস্টমস দিয়ে আমদানি করেছে এলবিয়ন গ্রুপ। সংশ্লিষ্ট কাস্টমস হাউস থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হলে এর সত্যতা পাওয়া যাবে বলে উল্লেখ করা হয় অভিযোগে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, এলবিয়ন গ্রুপ ও এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ লিমিটেড কেনাবেচার তথ্য গোপন করে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) ও আয়কর খাতে দীর্ঘদিন যাবৎ শত শত কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আসছে। এমনকি এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব তল্লাশি, ডিলার-এজেন্টদের কোম্পানিতে রক্ষিত হিসাব ও ব্যাংক হিসাব তল্লাশি, কাস্টমস শাখার কর্মকর্তা ও সিঅ্যান্ডএফ, বিক্রয় কর্মকর্তাদের হিসেব তদন্ত করলে এসব তথ্য বেরিয়ে আসবে।

রাইসুলের দাবি, তথ্য গোপন হয়নি

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে এলবিয়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. রাইসুল উদ্দীন সৈকত চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমার প্রতিষ্ঠানের পক্ষে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অডিট রিপোর্ট দেখতে পারেন। প্রদর্শিত ও অপ্রদর্শিত কোনো তথ্য গোপন করা হয়নি। নিয়মমাফিক সরকারকে রাজস্ব দিয়ে আসছি প্রতি বছর।’

তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে যে কেউ অভিযোগ দিতে পারে। অভিযোগটি কতটা সত্য, তা নির্ভর করবে তদন্তের মাধ্যমে।’

এমএ/ডিজে

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ksrm