ঘুষ নিয়ে গ্যাস সংযোগ চট্টগ্রামের ৮ প্রতিষ্ঠানে, কর্ণফুলী গ্যাসের সাবেক এমডি দুদকের নজরে

প্রায় চার বছর ধরে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও পেট্রোবাংলার পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন আলী মোহাম্মদ আল মামুন। ছিলেন কেজিডিসিএলের বোর্ড সদস্যও। এসব দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি জড়িয়ে পড়েন নানা অনিয়ম ও দুর্নীতিতে।

সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকার পরও ঘুষ নিয়ে দুটি সিএনজি ফিলিং স্টেশনের গ্যাস সংযোগ দেন সাবেক এই কর্মকর্তা। তার বিরুদ্ধে এসব অনিয়ম ও জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদের তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

সম্প্রতি আলী মোহাম্মদ আল মামুনের বিরুদ্ধে চারটি কার্যক্রমে ঘুষ নেওয়ার তথ্য চেয়ে কেজিডিসিএল বরাবরে চিঠি দিয়েছে দুদক।

অভিযোগ রয়েছে, মোটা অংকের ঘুষ নিয়ে চট্টগ্রাম নগরীর ছয়টি বড় রেস্টুরেন্ট ও বেকারিকে গ্যাস সংযোগ দেন সাবেক এই কর্মকর্তা।

২০২২ সালের ৯ নভেম্বর সাবেক পেট্রোবাংলার পরিচালক আলী মোহাম্মদ আল মামুনের বিরুদ্ধে ওঠা নানা অভিযোগের তথ্য চেয়ে কেজিডিসিএলকে চিঠি দেয় দুদক।

দুদকের চিঠির দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কেজিডিসিএলের এক কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করে ওই কর্মকর্তা চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘গত ৯ নভেম্বর দুদকের চিঠি পেয়েছি। দুদক যেসব তথ্য চেয়েছে সেগুলো দেওয়ার চেষ্টা করছি আমরা।’

Yakub Group

কেজিডিসিএলের সাবেক এমডি আলী মোহাম্মদ আল মামুনের বিরুদ্ধে চারটি কার্যক্রমে যেসব অভিযোগ উঠেছে, তার মধ্যে রয়েছে— স্বজনপ্রীতি ও ঘুষ গ্রহণের মাধ্যমে নামে-বেনামে নিলামে গাড়ি বিক্রি, ঘুষ গ্রহণ করে প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম ও সহকারী প্রকৌশলীর কোয়ার্টারের মেয়াদ বাড়ানো, সরকারি গেজেট না মেনে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইন্স) ও কর্ণফুলী গ্যাসের বোর্ড মেম্বার হওয়ার সুযোগে ঘুষ নিয়ে অবৈধভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস সংযোগ প্রদান এবং সরকারি নির্দেশ উপেক্ষা করে উৎকোচ গ্রহণ করে দুটি সিএনজি স্টেশনে গ্যাস সংযোগ দেওয়া।

জানা গেছে, ২০১৯ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর সাবেক পেট্রোবাংলার পরিচালক ও কর্ণফুলী গ্যাসের বোর্ড মেম্বার থাকাকালীন সময়ে সরকারি প্রজ্ঞাপন অমান্য করে ঘুষ গ্রহণ মাধ্যমে বেশ কিছু খাবারের দোকান ও বেকারিতে গ্যাস সংযোগ দেওয়ার অভিযোগ উঠে সাবেক পেট্রোবাংলার পরিচালক আলী মোহাম্মদ আল মামুনের বিরুদ্ধে।

প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানার ওআর নিজাম রোডের মেসার্স হোটেল নিরিবিলি অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট, মের্সাস এমরান হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট, মাস্টার বেকারী, মেসার্স মাস্টার বেকারী, মেসার্স মালঞ্চ ও মের্সাস আম্মান ফুড প্রোডাক্টস।

কেজিডিসিএল সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালের ১৫ মে সরকারি গ্যাস সংযোগ বন্ধ রাখতে বলা হলেও তা অমান্য করে চট্টগ্রামের দৌলতপুর পিএবি রোডে মেসার্স ফোর স্টার সিন্ডিকেট ও হাটহাজারীর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ২ নম্বর গেট এলাকায় মেসার্স আলাওল ফিলিং স্টেশনে গ্যাস সংযোগ দেন সাবেক কেজিডিসিএলের বোর্ড সদস্য আলী মোহাম্মদ আল মামুন।

২০১৮ সালের শুরুর দিকে কেজিডিসিএলে যোগ দেন আলী মোহাম্মদ আল মামুন। সেখানে দায়িত্ব পালন করেন মাত্র সাড়ে চার মাস।

২০২০ সালের ২৩ নভেম্বর দায়িত্ব পান পেট্রোবাংলা পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইন্স) হিসেবে। সেখানে প্রায় দেড় বছর কর্মরত ছিলেন। অবসর গ্রহণের আগে তিনি কেজিডিসিএলের বোর্ড সদস্য ছিলেন।

চলতি বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর আবুল খায়ের গ্রুপের ১২ কোটি টাকার গ্যাস বিল বকেয়া রেখে ‘হট টেপিং’য়ের মাধ্যমে নতুন সংযোগের অনুমোদনের অভিযোগের বিষয়ে সংবাদ প্রচার হওয়ায় ১৯ সেপ্টম্বর বিকেলে চট্টগ্রামের কেজিডিসিএলর বোর্ড সদস্য থেকে বাদ পড়েন আলী মোহাম্মদ আল মামুনকে।

২০১৮ সালের কেজিডিসিএলে যোগদানের একমাসের মাথায় ডাটা এন্ট্রি অপারেটর হিসেবে কর্মরত থাকা মো. সেলিম উদ্দীন নামে একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে চাকরিচ্যূত করে তাকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ ওঠে আলী মোহাম্মদ আল মামুনের বিরুদ্ধে।

শুধু তাই নয়, সেলিম উদ্দীন যাতে দপ্তরে প্রবেশ করতে না পারেন, সেজন্য মূল ফটকে তার ছবি টাঙিয়ে সতর্কতা জারি করারও নির্দেশ দেওয়া হয়। ২০১৭ সালের ৮ নভেম্বর মো. সেলিম উদ্দীনকে চাকরিচ্যূত করে কেজিডিসিএল।

অভিযোগের বিষয়ে সাবেক কেজিডিসিএলের এমডি ও পেট্রোবাংলার পরিচালক আলী মোহাম্মদ আল মামুন চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘দুদকে আমার বিরুদ্ধে যে চারটি অভিযোগ তদন্ত করছে, তার মধ্যে দুটি বিষয়ের সময় আমি এমডির দায়িত্বে ছিলাম না, অন্যজন একজন ছিল। বাকি দুটি অভিযোগকে আমি ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছি। আমি এখন অবসরে। আমাকে দুর্নীতিতে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।’

চট্টগ্রামে ছয় দোকান ও বেকারিকে গ্যাস সংযোগ প্রদানের বিষয়ে তিনি চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘এসব অভিযোগ সত্য না। ওই ছয়টি সংযোগগুলো আমি স্থানান্তরিত করেছি মাত্র। এগুলো নতুন সংযোগ ছিল না।’

এমএফও

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ksrm