ঘুষের টাকা ফেরত চাইতেই থানায় মারধর, শেষে ইউএনওর কোর্টে মা–মেয়ের জেল

পৈতৃক সম্পত্তির লড়াই থেকে কারাগার

কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলায় পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে থানায় গিয়ে উল্টো ভ্রাম্যমাণ আদালতে এক মাসের সাজা পেয়ে কারাগারে যেতে হয়েছে এক কলেজছাত্রী ও তাঁর মাকে। গত মার্চ মাসে ঘটে যাওয়া এ ঘটনার খবর বৃহস্পতিবার রাতে এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে জেলায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। অভিযোগ উঠেছে, মামলার তদন্ত প্রতিবেদনে প্রভাব ফেলতে ঘুষ নেওয়ার ঘটনার জেরে থানায় বাকবিতণ্ডার পর পুলিশি মারধর এবং পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দেওয়া হয় তাঁদের। তবে পুলিশের দাবি, থানায় সরকারি কাজে বাধা ও হাতাহাতির ঘটনায় তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

পেকুয়া বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের নির্বাচনী আসন ও নিজ এলাকা।

কারাগারে থাকা দুজন হলেন পেকুয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের সাবেক গুলদি এলাকার বাসিন্দা কলেজছাত্রী জুবাইদা জন্নাত (২৩) ও তাঁর মা রেহেনা মোস্তফা রানু (৩৮)। জুবাইদা চকরিয়া সিটি কলেজের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। তাঁরা মৃত নুরুল আবছারের মেয়ে ও স্ত্রী বলে জানা গেছে।

শৈশব থেকে উত্তরাধিকার নিয়ে বিরোধ

জানা গেছে, জুবাইদা জন্নাতের বয়স তখন এক বছরের কাছাকাছি, এমন সময় তাঁর বাবা নুরুল আবছার ও মা রেহেনা মোস্তফা রানুর মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। অভিযোগ আছে, যৌতুক দাবিকে কেন্দ্র করে নির্যাতনের জেরে এ বিচ্ছেদ হয়। বিচ্ছেদের পর মা জুবাইদাকে নিয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে যান। পরে নুরুল আবছার দ্বিতীয় বিয়ে করে নতুন সংসার শুরু করেন। অন্যদিকে রেহেনা মোস্তফা রানুও নতুন সংসার গড়েন। সেই সংসারে জন্ম নেয় তাঁর ছেলে রুবেল। তবে দুই সন্তানকে পড়ালেখা করাতে সংগ্রাম চালিয়ে যান তিনি।

২০১৩ সালের ২৩ মে জুবাইদার বাবা নুরুল আবছারের মৃত্যু হলে উত্তরাধিকার সূত্রে তাঁর স্থাবর সম্পত্তিতে দাবি ওঠে জুবাইদার। কিন্তু অভিযোগ আছে, জুবাইদার চাচারা তাঁকে উত্তরাধিকার হিসেবে স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানান। তখন পৈতৃক সম্পত্তির অধিকার পেতে আইনি লড়াই শুরু করেন জুবাইদা ও তাঁর মা।

ওয়ারিশ সনদ না পাওয়া ও মামলা

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ইউনিয়ন পরিষদ সাধারণত নিজ নিজ ইউনিয়নের বাসিন্দাদের ওয়ারিশ সনদ দিয়ে থাকে। জুবাইদা পেকুয়া সদর ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে ওয়ারিশ সনদের আবেদন করেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দেওয়ার পরও ইউনিয়ন পরিষদ থেকে তাঁকে সনদ দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ। জুবাইদার দাবি, স্থানীয় নারী সদস্য বিজু, যিনি সম্পর্কে তাঁর ফুফু, এ ক্ষেত্রে প্রভাব খাটিয়েছেন।

পরে সম্পত্তি উদ্ধারের জন্য চকরিয়া সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি মামলা করেন জুবাইদা। আদালত তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ডকে নির্দেশ দেন। কিন্তু এক বছরেও তদন্ত প্রতিবেদন না আসায় জুবাইদা আদালতে আবেদন করে তদন্তভার এসিল্যান্ডের কাছ থেকে প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান। আদালত পরে পেকুয়া থানাকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন।

তদন্তে ঘুষের অভিযোগ

পেকুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খাইরুল আলম তদন্তের দায়িত্ব দেন থানার এসআই পল্লবকে। অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদন দিতে ২০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন তিনি। পরে জুবাইদার খালা নিজের স্বর্ণের আংটি বন্ধক রেখে ওই টাকা জোগাড় করেন এবং তা দেওয়া হয়। কিন্তু এরপরও মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জুবাইদার বিপক্ষে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে।

থানায় উত্তেজনা ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের সাজা

এ ঘটনায় জুবাইদা তাঁর মা রেহেনা মোস্তফা রানুকে নিয়ে থানায় গিয়ে এসআই পল্লবের কাছে জানতে চান কেন তাঁদের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁরা ঘুষ হিসেবে দেওয়া ২০ হাজার টাকা ফেরত চান। অভিযোগ আছে, টাকা ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে মা–মেয়ের ওপর পুলিশ চড়াও হয় এবং নারী পুলিশ সদস্যদের দিয়ে তাঁদের মারধর করা হয়।

পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুব আলমকে থানায় ডেকে এনে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসানো হয়। সেখানে মা–মেয়েকে এক মাস করে কারাদণ্ড দিয়ে জেলা কারাগারে পাঠানো হয় বলে জানা গেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী মনজিলা বেগম বলেন, তিনি জুবাইদা ও তাঁর মায়ের সঙ্গে মামলার তদন্তের বিষয়ে পেকুয়া থানায় গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি শুনেছেন, মামলার তদন্ত প্রতিবেদন পক্ষে দেওয়ার কথা বলে এসআই পল্লব বাদী জুবাইদার কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা নিয়েছেন। কিন্তু পরে বিপক্ষে প্রতিবেদন দেওয়ায় জুবাইদা টাকা ফেরত চাইলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে পুলিশ মা–মেয়েকে মারধর করে থানার গেটে নিয়ে যায় এবং সেখানে থাকা সেবাপ্রার্থীদের বের করে দেওয়া হয়। পরে ইউএনও এসে তাঁদের এক মাসের সাজা দেন।

পরিবারের অভিযোগ

ঘটনার খবর পেয়ে জুবাইদার ছোট ভাই রুবেল ও তাঁর খালা আমেনা মুন্নী থানায় গেলেও প্রথমে তাঁদের কাছে মা–মেয়ের বিষয়ে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তাঁরা। রুবেল বলেন, তাঁর বোনের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার পর বিপক্ষে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। পরে টাকা ফেরত চাইলে তাঁদের ওপর নির্যাতন করে ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজা দেওয়া হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, দুইজন নারী থানায় গিয়ে পুলিশের ওপর হামলা করার অভিযোগ কতটা যুক্তিযুক্ত। তাঁর দাবি, এ ঘটনার সঠিক বিচার হওয়া প্রয়োজন।

প্রশাসনের বক্তব্য

পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুব আলম বলেন, থানায় একটি ঘটনার সূত্র ধরে তিনি সেখানে যান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, থানায় গিয়ে দেখা যায় সরকারি কাজে বাধা দেওয়া হয়েছে এবং এক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। সে কারণেই তদন্ত করে তাঁদের সাজা দেওয়া হয়েছে।

এসআই পল্লবের সঙ্গে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইউএনও বলেন, বিষয়টি পরবর্তী তদন্তে বেরিয়ে আসবে। তিনি জানান, খারাপ আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁদের শাস্তি দেওয়া হয়েছে।

ঘটনার বিষয়ে জানতে এসআই পল্লবের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

পেকুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খাইরুল আলম বলেন, থানায় এসে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসআই পল্লবের সঙ্গে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ থেকে ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।

ksrm