ঘরছাড়া শিশুর পা কেটে নিয়ে নামানো হয় ভিক্ষাবৃত্তিতে, যেভাবে ফিরলো পরিবারে

চুল কাটার কথা বলে বাবার কাছ থেকে টাকা নেয় ১২ বছরের শিশু রায়হান। এরপর সে সেলুনে না গিয়ে চলে যায় কক্সবাজারে। কিন্তু সেখানে গিয়ে সে পড়ে ভিক্ষাবৃত্তি পরিচালনা করা একটি চক্রের হাতে। তারা তাকে ট্রেনে করে ঢাকায় নিয়ে যায়। সেখানে গিয়ে রেলস্টেশনে ঘুমিয়ে পড়ে রায়হান। কিন্তু ঘুম থেকে উঠে দেখে, তার ডান পা নেই। এরপর সে কান্নায় ভেঙে পড়ে।

তখন ভিক্ষাবৃত্তি চক্রের সদস্যরা জানায়, ট্রেনে আসার সময় হঠাৎ তার পা কাটা পড়ে।

রায়হানও তাদের কথা বিশ্বাস করে নেয়। পরে চক্রের সদস্যরা তাকে ভিক্ষাবৃত্তি করতে উৎসাহিত করে এবং টাকা জমানোর জন্য মাটির ব্যাংকও কিনে দেয়। এভাবে সাত মাস রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় ভিক্ষা করে আসছিল রায়হান।

এর মধ্যে চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় সীরাতুন্নবী (সা.) মাহফিলে রায়হানকে ভিক্ষাবৃত্তির জন্য নিয়ে আসে ওই চক্রের সদস্যরা। রায়হান মাহফিলে ভিক্ষা করতে থাকে। কিন্তু এর এক পর্যায়ে হঠাৎ ছেলে রায়হানকে দেখতে পান বাবা নাজিম উদ্দিন। সঙ্গে সঙ্গে বুকের ধনকে জড়িয়ে ধরেন, নিয়ে যান ঘরে।

শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) রাতে উপজেলার চুনতিতে সীরাতুন্নবীর (সা.) মাহফিল মাঠের ঘটনা এটি।

রায়হান চুনতি ইউনিয়নের দক্ষিণ সাতগড় নোয়াপাড়ার অটোরিকশাচালক নাজিম উদ্দিনের ছেলে।

জানা গেছে, রায়হানকে একটি মাদ্রাসার হেফজ বিভাগে ভর্তি করান নাজিম। তবে পড়াশোনায় অনিয়মিত ছিল সে। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সৎমায়ের সংসারেও কমবেশি অবহেলার শিকার ছিল রায়হান।

রায়হানের বাবা নাজিম উদ্দিন জানান, প্রায় সাত মাস আগে সেলুনে চুল কাটার জন্য ছেলেকে টাকা দিয়েছিলেন তিনি। সেই টাকা নিয়ে বাড়ি থেকে চলে যায় রায়হান।

রায়হান জানায়, ওই টাকা নিয়ে সে কক্সবাজারে চলে যায়। সেখানেই তার সঙ্গে দালাল চক্রের সদস্যদের পরিচয় হয়। দালালরা ট্রেনের ছাদে করে তাকে ঢাকার কমলাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে রাতে ঘুমিয়ে পড়ে সে। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখতে পায়, তার ডান পা নেই। তখন হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে সে।

সে আরও জানায়, দালাল চক্রের সদস্যরা তাকে বলে, ট্রেন থেকে পড়ে গিয়ে সে গুরুতর আহত হয়েছিল। পরে তার পা কেটে ফেলতে হয়েছে। এরপর তাকে ভিক্ষাবৃত্তিতে নামতে উৎসাহ দেওয়া হয়। ভিক্ষা করে আয় করা টাকা জমিয়ে রাখার জন্য তাকে একটি ব্যাংকও কিনে দেওয়া হয়।

এভাবেই গত সাত মাস রাজধানীর কমলাপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় ভিক্ষা করে রায়হান।

লোহাগাড়ার চুনতিতে ১৯ দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক মাহফিলে সীরাতুন্নবীর (সা.) মাঠে ছেলেকে দেখতে পান বাবা। এক পা হারানো ছেলেকে দেখেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি এবং জড়িয়ে ধরেন রায়হানকে।

রায়হানের বাবা নাজিম উদ্দিন বলেন, শনিবার রাতে চুনতি সীরাতুন্নবীর মাঠে তাকে দেখতে পাই। পরে দেখি তার ডান পা হাঁটু পর্যন্ত কাটা। আমার ছেলে দালাল চক্রের হাতে পড়েছিল এবং তাকে দিয়ে ভিক্ষা করানো হয়েছে। এক পা হারিয়ে সে আজ আমার বুকে ফিরেছে।

তিনি এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত দালাল চক্রের সদস্যদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

এ বিষয়ে লোহাগাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল্লাহ বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছু শুনিনি। পরিবারের লোকজন আইনি সহায়তা চাইলে আইনিভাবে সহায়তা করা হবে।

এএইচ/ডিজে

ksrm