গ্রাম থেকে প্রতিদিন চট্টগ্রাম শহরে ঢোকে ১০ হাজার অবৈধ ট্যাক্সি-টেম্পো, বহদ্দারহাট-কাপ্তাই রাস্তায় গাড়ির নৈরাজ্য

পুলিশের টোকেনে ১৫ স্ট্যান্ড, গ্রামের সিএনজি চলে শহরেও

0

উত্তর ও দক্ষিণ চট্টগ্রামসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের কাপ্তাই থেকে প্রতিদিন চট্টগ্রাম নগরীতে ঢুকছে কমপক্ষে ১০ হাজার অবৈধ সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ টেম্পো-টমটম-ইজিবাইক। গ্রাম থেকে নগরে আসা এসব গাড়িকে কেন্দ্র করে নগরীর ভেতরেই গড়ে উঠেছে অন্তত ১৫টি অবৈধ পরিবহন স্ট্যান্ড। চট্টগ্রাম নগর পুলিশের (সিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের বিশেষ ‘টোকেন’ নিয়ে গ্রাম থেকে আসা অবৈধ এই গাড়িগুলো অবাধে চলে শহরেও।

উত্তর চট্টগ্রামের রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, হাটহাজারী আংশিক ও কাপ্তাই এলাকা থেকে আসা অবৈধ গাড়িগুলো ঢোকে চান্দগাঁও থানাধীন কাপ্তাই রাস্তার মাথা মোড় দিয়ে। দক্ষিণ চট্টগ্রামের অবৈধ গাড়িগুলো ঢোকে বহদ্দারহাট হয়ে। প্রতিদিন এসব পথ দিয়ে চট্টগ্রাম নগরীতে ঢোকা গাড়ির মধ্যে রয়েছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত মোটর রিক্সা ও টমটম এবং ইজিবাইক।

গ্রাম থেকে প্রতিদিন চট্টগ্রাম শহরে ঢোকে ১০ হাজার অবৈধ ট্যাক্সি-টেম্পো, বহদ্দারহাট-কাপ্তাই রাস্তায় গাড়ির নৈরাজ্য 1

অবৈধ এসব গাড়ি নিয়ে চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট মোড়, কাপ্তাই রাস্তার মাথা, নতুন ব্রিজ মোড়, নিউ মার্কেট ও কোতোয়ালী মোড়, টাইগারপাস মোড়, বায়েজিদ মোড়, অলংকার মোড়সহ নগরীর ব্যস্ততম মোড়গুলোতে চলছে রীতিমতো নৈরাজ্য। এর মধ্যে বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ দুটি মোড় বহদ্দারহাট ও কাপ্তাই রাস্তার মাথায় যাত্রীর জন্য বাস দাঁড়ালেই চালকদের মারধর করা হয়, কখনও ভাঙচুর করা হয় বাস। এছাড়া চাঁদা দাবি করাও হয়ে উঠেছে নিত্যদিনের ঘটনা।

গ্রাম থেকে প্রতিদিন চট্টগ্রাম শহরে ঢোকে ১০ হাজার অবৈধ ট্যাক্সি-টেম্পো, বহদ্দারহাট-কাপ্তাই রাস্তায় গাড়ির নৈরাজ্য 2

দিনের পর দিন এমন সব ঘটনায় অতিষ্ট হয়ে রোববার (২ জানুয়ারি) সকাল থেকে চট্টগ্রাম নগরীর বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল থেকে উত্তর চট্টগ্রামের কাপ্তাই সড়কে বাস চলাচল বন্ধ রাখে চালক ও মালিকরা। আর এতে চরম দুর্ভোগে পড়েন ওই পথে চলাচলকারী মানুষ। এ সড়কের কয়েকটি উপজেলায় দিনে লাখো মানুষের যাতায়াত রয়েছে। বাস চালক ও মালিকদের অভিযোগ, চাঁদাবাজি ও হয়রানির কারণে তারা বাস চলাচল বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন। তারা দাবি তুলেছেন, কাপ্তাই রাস্তার মাথা মোড়ে গ্রাম থেকে আসা সিএনজি অটোরিকশার অবৈধ স্ট্যান্ড উচ্ছেদ করতে হবে প্রশাসনকে।

জানা গেছে, গ্রাম থেকে প্রতিদিন চট্টগ্রাম নগরে আসা সিএনজি অটোরিকশার সবচেয়ে বড় স্ট্যান্ডটি কাপ্তাই রাস্তার মাথায় অবস্থিত। শহরে চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও পুলিশকে ম্যানেজ করে গড়ে উঠেছে স্ট্যান্ডটি। এখান থেকে অন্তত দুই হাজার ট্যাক্সি জেলার কাপ্তাই সড়কে চলাচল করে। এর নিয়ন্ত্রণ নিয়েও বিভিন্ন সময় হয়েছে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ।

কক্সবাজারসহ দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও উত্তর চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি উপজেলা থেকে চট্টগ্রাম নগরীতে প্রবেশের প্রধান স্পট চান্দগাঁও থানার আওতাধীন এলাকাটির গুরুত্বপূর্ণ দুটি মোড় বহদ্দারহাট ও কাপ্তাই রাস্তার মাথা ঘিরে চলছে চরম নৈরাজ্য। প্রতিদিন অন্তত ১০ হাজার নিষিদ্ধ গাড়ি নগরের বাইরে থেকে এসে এসব স্পটে ঢুকছে। অন্যদিকে ভাসমান দোকানের পাশাপাশি সড়ক দখল করে গজিয়ে ওঠা বিভিন্ন পরিবহন স্ট্যান্ডও যাত্রীদের দুর্ভোগের বড় কারণ হয়ে উঠেছে।

বিভিন্ন সূত্রে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গ্রাম থেকে আসা এসব অবৈধ পরিবহনকে কেন্দ্র করে নগরীর ভেতরেই অন্তত ১৫টি পরিবহন স্ট্যান্ড গজিয়ে উঠেছে। চট্টগ্রাম নগর পুলিশের (সিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ ও থানা পুলিশের যোগসাজশে একাধিক চক্র সড়কে এসব নৈরাজ্যে মদদ দিয়ে যাচ্ছে। দখলবাজিতে করে যাচ্ছে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা। চাঁদাবাজিতেও তাদের থাকে বড় একটি অংশ। অন্যদিকে শুধু এই অবৈধ গাড়িগুলোর কারণে আরাকান সড়কের যানজট ও ভোগান্তি যেন অভিশাপে পরিণত হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, নগরীর চান্দগাঁও থানার ৫০ গজের মধ্যেও গড়ে উঠেছে গ্রাম থেকে আসা ট্যাক্সির অবৈধ স্ট্যান্ড। সেখান থেকে প্রতিদিন অন্তত ৪০০ গাড়ি খাজা রোড হয়ে বলিরহাট পর্যন্ত চলাচল করে। সম্প্রতি সেখানে ট্রাফিক পুলিশের নামমাত্র অভিযান হলেও গ্রাম থেকে আসা ট্যাক্সির চলাচলে সামান্যতমও বিঘ্ন ঘটেনি। অথচ এসব গাড়ির প্রায় কোনোটিরই নম্বর পর্যন্ত নেই। এর মধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা চুরির গাড়িও চলাচল করে। ছিনতাইসহ নানা অপরাধেও ব্যবহার হচ্ছে এসব সিএনজি অটোরিকশা— এমন অভিযোগও মিলেছে।

বহদ্দারহাট মোড়ে রয়েছে নগর পুলিশের একটি ফাঁড়ি। আর এটির সামনেই সড়কের একপাশ দখলে নিয়ে গড়ে উঠেছে টেম্পো স্ট্যান্ড। মহাসড়কে যানজট ও বিশৃঙ্খলার অন্যতম কারণ এটি। এখান থেকে দেড়শো গাড়ি নগরীর কোতোয়ালী পর্যন্ত চলাচল করে। অভিযোগ রয়েছে, অবৈধ বহু গাড়ির মালিক খোদ পুলিশ কর্মকর্তারাই। ফলে যত অভিযানই হোক, অবৈধ স্ট্যান্ডটি সদর্পে বহাল থাকে।

অবৈধ এসব গাড়ির চালকেরা জানান, তারা গাড়িপ্রতি মাসিক সাড়ে তিন হাজার এবং দৈনিক নির্ধারিত অংকের চাঁদা দেন পুলিশকে। বাবুল নামে এক ব্যক্তি পুলিশের নামে এসব টাকা তোলেন।

বহদ্দারহাট মদিনা হোটেলের সামনে রয়েছে আরও একটি টেম্পো স্ট্যান্ড। এখান থেকে নতুন ব্রিজ পর্যন্ত কয়েকশত টেম্পো চলাচল করে। নতুন ব্রিজমুখী এই সড়কে ইচ্ছেমতো পার্কিং এবং যাত্রী ওঠানামা করায় যানজটের সৃষ্টি হয় প্রতিনিয়ত। সেখান থেকে মাত্র ৩০ গজ সামনে গেলেই দেখা মিলবে একটি মাইক্রো স্ট্যান্ড— এখান থেকে অবৈধ গাড়িগুলো কক্সবাজার সড়কে চলাচল করে।

বহদ্দারহাট হক মার্কেটের সামনে ফুটপাত থেকে সড়কের ওপরও দুটি টেম্পো স্ট্যান্ড রয়েছে। এসব গাড়ি কালুরঘাট ও জেলার নোয়াপাড়া রুটে চলাচল করে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সামনে ফরিদের পাড়া সড়কেও গড়ে উঠেছে একটি মাইক্রো স্ট্যান্ড। এই স্ট্যান্ডকে কেন্দ্র করে সন্ধ্যা নামতেই বখাটেদের উৎপাত বেড়ে যায়। ইভটিজিং ও ছিনতাইসহ নানা অপরাধ সেখানে ঘটছে প্রতিনিয়ত। ফরিদের পাড়ার ৩০ হাজার বাসিন্দার জন্য এটি এখন রীতিমতো নরক যন্ত্রণায় পরিণত হয়েছে।

এদিকে সরেজমিনে দেখা গেছে, বাসের জন্য নির্ধারিত টার্মিনাল থাকলেও চান্দগাঁও থানার সামনে ও বহদ্দারহাট পুলিশ ফাঁড়ির পেছনে গড়ে উঠেছে অসংখ্য বাস কাউন্টার। গাড়িগুলো সেখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা করে। সবমিলিয়ে বহদ্দারহাট মোড় যেন এক অভিশপ্ত জংশন হয়ে উঠেছে নগরবাসীর জন্য। পরিবহনের বিশৃঙ্খলা আর যানজট লেগেই থাকে বছরজুড়ে। ফাঁড়ির পাশে ফুটপাত দখলে নিয়ে মামুন এক্সপ্রেস নামে একটি বাস কাউন্টার বসিয়ে নিয়মিত ভাড়া তোলা হয় পুলিশের নামেই।

সম্প্রতি চান্দগাঁও জোনের বিতর্কিত ট্রাফিক ইন্সপেক্টর আশীষ কুমার পালকে বদলি করা হলে তার স্থলাভিষিক্ত হন টিআই ইকবাল হোসেন। তিনি যোগদানের পর সড়কে বিশৃঙ্খলা ও চাঁদাবাজির মাত্রা আরও বেড়ে গেছে— এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।

অভিযোগের বিষয়ে চান্দগাঁও ট্রাফিক ইন্সপেক্টর ইকবাল হোসেন চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘এই বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। গ্রামের সিএনজি ট্যাক্সি, ব্যাটারিচালিত মোটর রিক্সা, ব্যাটারি টমটম, ইজিবাইক এগুলো এই এলাকায় গত ১০-১২ বছর ধরে চলাচল করছে। সেটার জন্য কোনো চাঁদা দেওয়া বা নেওয়া হয় না। আমরা জনগণের সেবক। জনগণকে সেবা দেওয়া জন্য যা করা প্রয়োজন সেটাই করে থাকি।’

সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

ksrm