গোঁজামিলে চলছে বঙ্গবন্ধু টানেলের ৪০৭ কোটি টাকার সড়ক নির্মাণ, অনিয়মে একাট্টা ঠিকাদার-সওজ

কয়েক কোটি টাকা নষ্ট করে তৈরি হচ্ছে অপ্রয়োজনীয় কালভার্ট

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে ১০ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের প্রথম বঙ্গবন্ধু টানেল আগামী ডিসেম্বরে উদ্বোধনের ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। ইতোমধ্যে টানেলের অবকাঠামোগত ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু টানেলের মুখ দিয়ে যানবাহন চলাচলে ৪ শত ৭ কোটি ৭ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য ৮ কিলোমিটার ক্রসিং-কালাবিবি ছয় লাইন সংযোগ সড়কের ৪০ শতাংশ কাজও শেষ হয়নি। ফলে ডিসেম্বরে বঙ্গবন্ধু টানেল উদ্বোধন হওয়ার পর ছয় লাইন সড়কে যানবাহন চলাচলে সুফল মিলবে কিনা তা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। যদিও বর্তমানে দিন-রাত চলছে ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ছয় লাইনের ক্রসিং-কালাবিবি সড়ক নির্মাণের কাজ।

বঙ্গবন্ধু টানেলের ছয় লাইন সংযোগ সড়কের চাতরী চৌমুহনী এলাকায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকার কালভার্টের সম্মুখে বিশাল বাড়ি। পানি চলাচলের কোন খাল বা নালা নেই। কালভার্টটির মাত্র ৪ ভাগের একভাগ ছাদ ঢালাই হয়েছে, বাকি আরও তিন ভাগ। বিপুল টাকা ব্যয়ে এসব কালভার্ট করার কী মানে?
বঙ্গবন্ধু টানেলের ছয় লাইন সংযোগ সড়কের চাতরী চৌমুহনী এলাকায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকার কালভার্টের সম্মুখে বিশাল বাড়ি। পানি চলাচলের কোন খাল বা নালা নেই। কালভার্টটির মাত্র ৪ ভাগের একভাগ ছাদ ঢালাই হয়েছে, বাকি আরও তিন ভাগ। বিপুল টাকা ব্যয়ে এসব কালভার্ট করার কী মানে?

ছয় লাইন সংযোগ সড়কের প্রকল্প পরিচালক এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলছেন, আগামী ডিসেম্বরে টানেল উদ্বোধনের আগে ছয় লাইনের কাজ তারা শেষ করতে পারবেন না। তবে যানবাহন চলাচলের জন্য তারা চার লাইন কাজ শেষ করে দেবেন। বাকি ২ লাইন কাজ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করা যাবে বলে জানিয়েছেন তারা।

বঙ্গবন্ধু টানেলের ছয় লাইন সংযোগ সড়কের ওয়াই জংশনমুখে বিশাল কালভার্টটির ১০ ভাগ কাজও শেষ হয়নি। এছাড়া ছয় লাইন সড়কের এখনও এক লাইন সড়কও দৃশ্যমান হয়নি। সম্মুখ প্রান্তে যদি ১ লাইনের কাজও শেষ না হয় আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে, তাহলে ছয় লাইনের গতি কী হবে— প্রশ্ন সাধারণ মানুষের।
বঙ্গবন্ধু টানেলের ছয় লাইন সংযোগ সড়কের ওয়াই জংশনমুখে বিশাল কালভার্টটির ১০ ভাগ কাজও শেষ হয়নি। এছাড়া ছয় লাইন সড়কের এখনও এক লাইন সড়কও দৃশ্যমান হয়নি। সম্মুখ প্রান্তে যদি ১ লাইনের কাজও শেষ না হয় আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে, তাহলে ছয় লাইনের গতি কী হবে— প্রশ্ন সাধারণ মানুষের।

তবে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, বাস্তবিক পক্ষে ৮ কিলোমিটার সংযোগ সড়কে নির্মিতব্য সড়ক, মাটি ভরাট, ২১টি কালভার্ট নির্মাণ এবং ডিভাইডার নির্মাণসহ বিবিধ বিষয়ের বর্তমান অবস্থা দেখে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে আগামী ৩ মাসের মধ্যে অর্থাৎ টানেল উদ্বোধনের আগে ডিসেম্বরে চার লাইনের কাজ শেষ করা কিছুতেই সম্ভব নয়। খুব কম সময়ের মধ্যে কোন কারণে সংযোগ সড়ক নির্মাণ কাজ আগামী ডিসেম্বরে শেষ দেখানো গেলেও বিশেষজ্ঞদের মতে তার স্থায়িত্ব ও টেকসই পরিস্থিতি হবে খুবই দুর্বল।

Yakub Group

অভিযোগ রয়েছে, সিডিউলে পুরাতন রাস্তার ওপর থেকে নতুন করে পুরো ছয় লাইন সড়কে ২ ফুট উঁচু করে কংক্রিট, পাথর, বালি ও পিচ্ ঢালাই করার শর্ত থাকলেও প্রায় জায়গায় তা মানা হচ্ছে না। প্রকাশ্যেই চলছে বালুর কমপেকশনে মাটি দিয়ে কমপেকশন, মাটির কমপেকশনে ডিপোর আর্বজনাযুক্ত মাটির কমপেকশন, কালভার্টে মরিচা ধরা লোহার ব্যবহার, কালভার্টের ছাদ ঢালাইয়ে সিলেটি বালুর পরিবর্তে স্থানীয় বালুর ব্যবহারসহ বিবিধ অনিয়ম। দীর্ঘদিন ধরে এসব অভিযোগ থাকলেও সওজ কর্তৃপক্ষের তেমন লোকবল নেই সঠিকভাবে দেখার।

সওজ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ন্যাশানাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারস্ লিমিটেড (এনডিই) নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ২০২১ সালের ১১ এপ্রিল ছয় লাইন সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু করে। ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ওই কাজের মেয়াদ ধরা আছে।

চট্টগ্রামের বহুল প্রতীক্ষিত স্বপ্নের এই বঙ্গবন্ধু টানেল উদ্বোধন হলে বাঁশখালী-আনোয়ারা-পটিয়া-চন্দনাইশ সড়কের ওপর দিয়ে কক্সবাজার-ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যানবাহন চলাচল করবে। মানুষের যাতায়াত সেবায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটবে।

সাধারণ যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের অভিযোগ, বাস্তবিক পক্ষে চলতি সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কাজের ৪০ শতাংশ কাজও স্পষ্ট রূপ নেয়নি। যদিও সওজ কর্তৃপক্ষ দাবি করছে ৬০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।

শুক্রবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কর্ণফুলী শিকালবাহা ওয়াই জংশনের মুখ থেকে আনোয়ারা কালাবিবির দীঘি ৮ কিলোমিটার ছয় লাইন সংযোগ সড়ক ঘুরে দেখা গেছে, ২১টি কালভার্টের মধ্যে ৮টি কালভার্টের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৫টি কালভার্টের কাজ পরিপূর্ণ শেষ হয়েছে। অন্য ৩টি কালভার্টের কাজ শেষ হলেও তা অনেকটাই অসম্পূর্ণ। বাকি ১৩টি কালভার্টের কাজ কোথাও আংশিক শুরু করা হয়েছে, আবার কোথাও একেবারে কাজ শুরুই করা হয়নি।

চাতরী চৌমুহনী এবং শিকলবাহা ওয়াই জংশন এলাকায় দেখা গেছে, দুটি কালভার্টের মুখে খাল কিংবা পানি চলাচলের নালা-নর্দমাযুক্ত পানি নিস্কাশন ব্যবস্থা নেই। কালভার্টের মুখে আছে নিজস্ব মালিকানাধীন বিশাল বিশাল বিল্ডিং ও দোকানপাট এবং গ্রাম্য রাস্তা। এক একটি কালভার্টের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। প্রচুর অর্থ ব্যয়ে অপ্রয়োজনীয় ও পানি চলাচলের অযোগ্য দুটি কালভার্ট নির্মাণকেও ঘিরে এলাকায় নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

জানা গেছে, অধিকাংশ কালভার্টের লোহাই জং ধরা (মরিচা পড়া), দীর্ঘদিন লোহাগুলো পানির ভিতর ডুবে কাদাময় হয়ে থাকা, স্থানীয় বালি ব্যবহার, নিম্নমানের ইট, কংক্রিট, পাথর ব্যবহার হচ্ছে প্রকাশ্যে। এছাড়া নতুনভাবে অধিগ্রহণ করা জমিতে নির্মিত রাস্তায় মাটির পরিবর্তে বিভিন্ন স্থানের ময়লার ডিপোর আর্বজনাযুক্ত মাটি এবং পুরাতন বিল্ডিংয়ের ভাঙা ইট দেওয়া হচ্ছে— যা দৃশ্যমান এবং কিছু কিছু জায়গায় বর্তমানেও আছে।

কর্মরত শ্রমিকদের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বললে নাম প্রকাশে অনিচ্ছা জানিয়ে তারা জানান, ছয় লাইনের একটি কালভার্ট করতে চলমান রাস্তায় ৩-৪ অংশ ভাগ করে এক একবার ছাদ ঢালাই করা হয়। নিয়ম অনুসারে প্রতি ছাদ ঢালাই ২১-২২ দিন পর খুলতে হয়। ছাদ ঢালাই না খুলে ওখানে গাড়ি চলাচল করতে দেওয়া হচ্ছে। যার কারণে কালভার্টের স্থায়িত্ব দীর্ঘস্থায়ী হবে না। সেই হিসেবে বাকি ১৩টি কালভার্টের কাজ আদৌ তিন মাসের মধ্যে শেষ করা যাবে কিনা সন্দেহ! কারণ ২ বছরে মাত্র ২১টি কালভার্টের মধ্যে ৮টি কালভার্টের কাজ কিছুটা শেষ হয়েছে। এমনকি বঙ্গবন্ধু টানেলের সম্মুখে আনোয়ারা প্রান্তে চাতরী চৌমহনীর দক্ষিণ পাশের কালভার্টটির কাজ সবেমাত্র গত বুধবার (২১ সেপ্টেম্বর) শুরু হয়েছে।

সরেজমিন ঘুরে শ্রমিক ও কয়েকজন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ৮ কিলোমিটার সংযোগ সড়কে খণ্ড খণ্ডভাবে মাত্র ২ কিলোমিটার সড়কে ৪ লাইন পিচ্ ঢালাই সম্পন্ন হয়েছে। চার লাইনের দুই রাস্তার মাঝখানের ডিভাইডার এবং ছয় লাইন রাস্তার দুই পাশের সিডিউলমতো মাটি ভরাট কাজ কোথাও শেষ হয়নি। ৩ কিলোমিটার সড়কে মাত্র ২ লাইন সম্পন্ন হয়েছে তাও খণ্ড খণ্ডভাবে। বাকি ৩ কিলোমিটারের মধ্যে ২ কিলোমিটার সবেমাত্র মাটি ভরাট হয়েছে এবং কংক্রিট, পাথর, বালি ফেলানো হয়েছে কিছু কিছু অংশে। অন্য ১ কিলোমিটার সড়কে মাটি-বালি কিছুই ভরাট করা হয়নি। সর্বত্র ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতা স্পষ্ট রূপ নিয়েছে।

বাঁশখালী-আনোয়ারা-পটিয়া (পিএবি) সড়কের শ্রমিক নেতা নুরুল ইসলাম বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু টানেল রাষ্ট্রীয় সম্পদ। এই সম্পদ সুরক্ষা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব ও কর্তব্য। এই টানেলের ৪০৭ কোটি ৭ লাখ টাকার সংযোগ সড়কটি নির্মাণে আরও আন্তরিক হওয়া দরকার। তড়িঘড়ি কিংবা দায়সারাভাবে যেভাবে আর্বজনা বা বিল্ডিং ভাঙ্গা ইট দিয়ে অধিগ্রহণের রাস্তা ভরাটে মাটি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, কালভার্ট নির্মাণ হচ্ছে তা দেখার কেউ যেন নেই। প্রতিদিন সড়কটি দিয়ে আসা-যাওয়ায় দেখা যাচ্ছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও সওজ কর্তৃপক্ষ একাট্টা হয়ে সবকিছু অনিয়ম করছে। মেগা প্রকল্পে অনিয়ম হলে রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। কেন্দ্রীয়ভাবে সময় দিয়ে তদন্ত করা দরকার। প্রতিদিনের যানজট নিরসনেও প্রকল্প কাজে নিয়োজিত কেউ কাজ করছে না।’

ছয় লাইন সংযোগ সড়ক প্রকল্প কাজে নিয়োজিত ন্যাশানাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারস্ লিমিটেডের (এনডিই) দায়িত্বরত ব্যবস্থাপক মো. হান্নান বলেন, ‘আমাদের ছয় লাইন প্রকল্পের পরিচালক হচ্ছেন দোহাজারী সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সুমন সিংহ । ওনার নির্দেশনা অনুসারে যাবতীয় কাজ সিডিউল অনুসারে করা হচ্ছে। বৈদ্যুতিক খুঁটি রাস্তা থেকে উঠাতে বিলম্ব করায় আমাদের কাজে ব্যাঘাত হয়েছে। অন্য কিছু আমি বলতে পারবো না। যা জানার পরিচালকের কাছ থেকে জানুন। আমাদের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম-দুর্নীতির রেকর্ড নেই।’

টানেলের ছয় লাইন সংযোগ সড়ক প্রকল্পের পরিচালক, দোহাজারী সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সুমন সিংহ বলেন, ‘প্রকল্পের কাজ সিডিউল অনুসারে হচ্ছে। কোথাও অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা হচ্ছে না। যেখানে মাটি প্রয়োজন সেখানে মাটি ব্যবহার হচ্ছে, যেখানে বালি প্রয়োজন সেখানে বালি ব্যবহার হচ্ছে। সব কিছু ল্যাবরেটরি টেস্টের মাধ্যমে হচ্ছে। আগামী ডিসেম্বরে টানেল উদ্বোধনের আগে ছয় লাইনের পরিবর্তে চার লাইন সড়কের কাজ শেষ করে সেটা চালু করা হবে। বাকি কাজ পরের বছর ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে শেষ করা হবে।’

তিনি বলেন, ‘প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও ঠিকাদারকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত সময় বাড়িয়ে দেওয়া হবে। নানা কারণে মেয়াদের আগে কাজটি শেষ করতে পারছি না।’

অপ্রয়োজনীয় দুটি কালভার্টের ব্যাপারে বলেন, ‘সিডিউলে আছে বলে তা করতে হবে। ম্যাপটি প্রয়োজন অনুসারে করা হয়েছিল।’

সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ksrm