গাড়ির দরজা টেনে অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধাকে ধাক্কা দেন কক্সবাজারের ডিসি (ভিডিও)

0

‘১৯৭১ সালে সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নিয়ে দেশের স্বাধীনতায় সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলাম। বঙ্গবন্ধু পাগল আওয়ামী লীগ প্রেমী হওয়ায়। সে অপরাধে ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর নির্যাতনের মুখে ভিটেমাটি বিক্রি করে এলাকা ছেড়ে সপরিবারে পালাতে বাধ্য হই। তখন মুখ বুঁজে সব সহ্য করলেও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি আওয়ামী লীগ সরকারের এ সময়ে আমার মতো অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধাকে একজন ডিসির হাতে এভাবে লাঞ্ছিত হতে হলো— যা কল্পনাও করতে পারছি না। আমার মন চাচ্ছে এখনই আত্মহত্যা করি।’

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. মামুনুর রশীদের হাতে লাঞ্ছিত হওয়ার পর এমন প্রতিক্রিয়া জানান অসুস্থ ও ভূমিহীন বীর মুক্তিযোদ্ধা জাফর আহমেদ (৭০)।

রোববার (১৯ ডিসেম্বর) দুপুরে কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে তাকে গাড়ির দরজা দিয়ে ধাক্কার পাশাপাশি গালমন্দ করা হয় বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা জাফর। ঘটনাটি রোববার ঘটলেও মঙ্গলবার (২১ ডিসেম্বর) দুপুরে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। এরপরই সবখানে সমালোচনার ঝড় ওঠে।

মুক্তিযোদ্ধা জাফর আহমেদ পেকুয়া উপজেলার মগনামার মৃত আমিন শরিফের ছেলে। মুক্তিযোদ্ধার গ্যাজেটে তার সিরিয়াল নম্বর ৩১১। ইতোমধ্যে ৩ বার স্ট্রোক করার কারণে একপাশ অবশ হওয়ায় অন্যের সহযোগিতায় চলাফেরা করতে হয় এই মুক্তিযোদ্ধাকে।

অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধা জাফর বলেন, ‘১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ডাকে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এলাকায় ফিরে আসি এবং আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবে জীবন চালাচ্ছিলাম। কিন্তু ২০০১ সালে জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর নির্যাতনের মুখে ভিটেমাটি বিক্রি করে পরিবার নিয়ে রাজাকারের মত এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। এরপর থেকে আমার পরিবার ভূমিহীনে পরিণত হয়েছি। কখনও চট্টগ্রাম, কখনও কক্সবাজারে ভাড়া বাসায় বাস করে আসছি আমরা।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভূমিহীন ও অসুস্থতার কারণে আর্থিক দৈন্যতায় থাকায় ২০১০ সালে তৎকালীন ডিসি গিয়াস উদ্দিন আহমদের কাছে একখণ্ড জমির জন্য আবেদন করি। ডিসি গিয়াস উদ্দিন বদলির পর ফাইলটি থেমে যায়। পরে তদবির করে মন্ত্রণালয়ে নিতে পারলেও পরে ওই ফাইলের আর কোন হদিস পায়নি। এতে হতাশ হয়ে যায়। নিরুপায় হয়ে বছর পাঁচেক আগে দ্বিতীয় দফায় ভূমিহীন হিসেবে আবারও একখণ্ড জমি পেতে আবেদন করেছি। সম্প্রতি বদলি হওয়া ডিসি কামাল হোসেনের নির্দেশনায় খুরুশকুলে ৫ গণ্ডা জমি বরাদ্দের জন্য প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। সব প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করে জেলা ভূমিহীন কমিটির মিটিংয়ে অনুমোদনের জন্য ডিসির স্বাক্ষর প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু ডিসি কামাল হোসেন বদলীর পর আবারো থেমে যায় আমার স্থায়ী একটি মাথাগোঁজার ঠাঁই পাবার স্বপ্ন।’

মুক্তিযোদ্ধা জাফর আহমেদ কান্নাজড়িত কণ্ঠে অভিযোগ করেন, ‘কক্সবাজারের বর্তমান জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ আসার পর অন্যের সহযোগিতা নিয়ে অসুস্থ শরীরে ডিসির দরজায় ২০ বারেরও বেশি ধর্না দিয়েছি। কিন্তু ডিসি কথা বলা তো দূরের কথা, সাক্ষাৎ করার সুযোগ-ই দেননি। সর্বশেষ ১৯ ডিসেম্বর ডিসির সঙ্গে দেখা করতে গেলে আমাকে ওয়েটিং রুমে বসিয়ে রাখা হয়। কয়েক ঘণ্টা বসে থাকার পর হঠাৎ দেখি ডিসি বেরিয়ে যাচ্ছেন। তখন উপস্থিত এক ব্যক্তির সহযোগিতায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে নিচে নেমে জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ের সামনে গাড়িতে উঠার সময় ডিসিকে স্যার বলে সম্বোধন করে গাড়ির দরজায় হাত দিতেই তিনি (ডিসি) বিরক্তি প্রকাশ করে গাড়ির দরজা টেনে আমায় ধাক্কা দেন। এ সময় গালমন্দও করেন।’

মুক্তিযোদ্ধা জাফর বলেন, ‘সাধারণ ভূমিহীন হিসেবেও তো আমি সরকারের সহযোগিতা পেতে পারি। কিন্তু বিজয়ের এ মাসে একজন মুক্তিযোদ্ধা জেলা প্রশাসকের হাতে লাঞ্ছিত হওয়ার বিচার কাকে দেবো? প্রধানমন্ত্রীর কাছে এর উপযুক্ত বিচার দাবি করছি। এর সুষ্ঠু বিচার না পেলে অনশন করবো।’

কক্সবাজারের জয় বাংলা বাহিনীর প্রধান বীর মুক্তিযোদ্ধা কামাল হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘ঘটনাটি মুক্তিযোদ্ধা জাফর আহমেদ আমাকে ফোনে অবগত করেছেন। আমি ফোনে অনেক কথা বুঝি না। আমি ওনাকে ডেকেছি, লাঞ্ছিত কি ডিসি করেছেন, নাকি তার সঙ্গে থাকা লোকজন বা ড্রাইভার করেছে তা জেনে; লিখিতভাবে অভিযোগ জানাবো।’

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ অবশ্য বীর মুক্তিযোদ্ধাকে লাঞ্ছনার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।

সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

ksrm