গর্ভবতীদের আতঙ্ক ‘কেয়ার হাসপাতাল’, তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিক অবরুদ্ধ
খুন করে লাশ গুমের ‘হুমকি’ হাসপাতাল মালিকের
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে কেয়ার হসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার যেন নবজাতক ও গর্ভবতীদের আতঙ্কের আরেক নাম। এখানে চিকিৎসা নিতে গিয়ে লাশ হয়ে ফিরেছেন অনেক সন্তানসম্ভবা নারী। অনিয়মের পাহাড়গড়া এই হাসপাতালে এবার অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে স্থানীয় সাংবাদিককে। ভুক্তভোগীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে তাকে হাসপাতালের মালিক আটকে রেখে ‘প্রাণনাশের হুমকি’ দেয়। এমনকি লাশ গুম করে ফেলার কথাও বলেন তিনি।

রোববার (২৯ মার্চ) দুপুরে উপজেলার পৌরসদরের কেয়ার হাসপাতালে এ ঘটনা ঘটে।
জানা গেছে, ভুক্তভোগী কয়েকজন রোগীর অভিযোগ পেয়ে চট্টগ্রাম প্রতিদিনের উপজেলা প্রতিনিধিসহ কয়েকজন স্থানীয় সাংবাদিক হাসপাতালে যান। সেখানে তখন দ্বিতীয় তলার প্রথম রুমে রোগী দেখছিলেন হাসপাতালের মহিলা ও প্রসূতি রোগের ডাক্তার প্রমি আফরিন সুইটি। উনার কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে পাঁচ মিনিট পরে প্রতিবেদক ও অন্য সাংবাদিকরা তার রুমে প্রবেশ করেন।
হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নেওয়া ভুক্তভোগীদের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. প্রমি আফরিন সুইটি বলেন, ‘আপনার যা ইচ্ছা তাই লিখে দেন। ফালতু আলাপ করার সময় নাই।’ একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘হাজার হাজার রোগী আছে একটা সমস্যা হতেই পারে’।
এ সময় হাসপাতালের ম্যানেজার তার ওই রুমে প্রবেশ করে সাংবাদিকদের সাথে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। তিনি বলতে থাকেন, ‘আপনারা এখানে কার অনুমতি নিয়ে এসেছেন?’ এক পর্যায়ে তিনি সাংবাদিকদের ম্যানেজারের রুমে নিয়ে যান। এর কিছুক্ষণ পর হাসপাতাল মালিক ডা. মীর কাশেম মজুমদার সেখানে এসে প্রতিবেদকদের মারতে তেড়ে আসেন।
ডা. মীর কাশেম মজুমদার চট্টগ্রাম প্রতিদিনের প্রতিনিধিকে বলতে থাকেন, ‘তুই আমার বউর সাথে কথা বললি কেন? তোকে খুন করে লাশ গুম করে ফেলব। তুই চাঁদাবাজ, তুই আমার কাছে চাঁদা চেয়েছি।’ তিনি এ সময় অশ্লীল ভাষায় গালাগালি করতে থাকে প্রতিবেদককে। বলতে থাকেন, ‘তুই এইখান থেকে কোথাও যেতে পারবি না। তোকে আজকে মেরে ফেলবো।’
বিষয়টি স্থানীয় সাংবাদিকরা অবগত হলে তারা দ্রুত কেয়ার হাসপাতালে যান। কিন্তু প্রতিনিধির বিরুদ্ধে করা ডাক্তারের করা অভিযোগের কোনো সত্যতা মেলেনি। পরে ডা. মীর কাশেম মজুমদার সাংবাদিকদের কাছে ক্ষমা চান।
ভুক্তভোগী প্রতিনিধি এসএম ইকবাল হোসাইন বলেন, ‘কারো বিরুদ্ধে তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে চাঁদাবাজ আখ্যা দেওয়া এখন স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। প্রশাসনের দুর্বলতার কারণে এসব প্রতিষ্ঠানগুলো গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে এমন আচরণ করছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান পর এই ধরনের হাসপাতালগুলোতে এখনও ভ্রাম্যমাণ আদালতের কোনো অভিযান পরিচালনা হয়নি।
সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলতাফ হোসেনের কাছে এই বিষয়ে বক্তব্য জন্য গেলে তিনিও বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
স্বাস্থ্য বিভাগের বিভাগীয় পরিচালক সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, সাংবাদিক হচ্ছে জাতির দর্পণ। দেশ ও জাতির স্বার্থে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে হেনস্থা ও অবরুদ্ধ হওয়া খুবই দুঃখজনক। এ ব্যাপারে আমি আইনগত ব্যবস্থা নেবো।’
হাসপাতাল নয়, যেন কসাইখানা
কেয়ার হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার নিয়ে অভিযোগের পাহাড় রয়েছে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষদের। সন্তানসম্ভবা নারী ও নবজাতকদের জন্য এটি আতঙ্কের আরেক নাম। এই হাসপাতালে প্রতিনিয়তিই চলে ‘সিজার-বাণিজ্য’।
জানা গেছে, একটি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার চালু করতে যেসব নিয়ম-নীতি ও লাইসেন্স দরকার, সেসবের তোয়াক্কা না করেই চলছে কেয়ার হাসপাতাল।
এই হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নেওয়া বিজয় নামে এক যুবক বলেন, ‘২০২৩ সালে আমার স্ত্রী প্রথম সন্তানসম্ভবা হয়। কেয়ার হাসপাতলে নিয়ে গেলে আমার প্রথম নবজাতক ফিরে লাশ হয়ে। আমার সন্তান মারা যাওয়ার পর আমার স্ত্রী অবস্থাও ছিল ক্রিটিক্যাল। প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। কিন্তু চিকিৎসক জানান, ভালো হয়ে যাবে, সমস্যা নাই। রক্ত বন্ধ না হলে এক পর্যায়ে আমার স্ত্রীকে চট্টগ্রাম মেডিকেলে নিয়ে যাই। সেখান থেকে পাঁচদিন পর সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরে।
তিনি বলেন, তখন চিকিৎসকরা আমাকে বলেছিলেন, আমি আর কখনও বাবা হতে পারব না। কিন্তু ঈশ্বর দীর্ঘ তিন বছর পর আমাকে একটা কন্যাসন্তান দিয়েছেন।
পৌরসভা এলাকার ইদিল পুরের দেলোয়ার নামে আরেক ভুক্তভোগী জানান, আমার ভাই প্রবাসে থাকেন। তার স্ত্রী নাদিয়ার প্রসব বেদনা উঠলে দ্রুত আমরা কেয়ার হাসপাতালে নিয়ে যাই। এ সময় মহিলা ডাক্তার প্রমি আফরিন সুইটি বলেন, রোগীর গর্ভে বাচ্চার পজিশন সব দিকে ঠিক আছে। স্বাভাবিক ডেলিভারি হবে। এক পর্যায়ে ডাক্তার নরমাল ডেলিভারি করার জন্য হাসপাতালে সিঁড়ি দিয়ে উঠানামা করার জন্য বলেন। কিছুক্ষণ পর ডেলিভারি রুমে আমার ভাইয়ের স্ত্রীকে নিয়ে গেলে প্রসব বেদনায় চিৎকার করতে থাকলে, তার মুখের মধ্যে কাপড় ঢুকিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ পর সন্তান প্রসব করলেও তার খিঁচুনি উঠে। কিন্তু তাৎক্ষণিক তাদের জরুরি চিকিৎসা সেবা না থাকার কারণে দ্রুত আমরা চট্টগ্রাম মেডিকেলে নিয়ে যাই। দীর্ঘক্ষণ চিকিৎসা না পাওয়ার কারণে আজীবনের জন্য প্রতিবন্ধী হয়ে গেল আমার ভাইয়ের মেয়ে।
ডিজে




