গতানুগতিক ধারার বাইরে ভাবলেই, গবেষণায় সাফল্য আসবে: প্রশান্ত কুমার

যুগে যুগে গবেষণার ওপর ভিত্তি করে সভ্যতার অগ্রগতি ঘটেছে। এমন কোনো বিষয় নেই, যেখানে গবেষণার সহযোগিতা নিতে হয়নি। অজানাকে জানার আগ্রহ, নতুন জ্ঞানের অনুসন্ধান এবং বাস্তব সমস্যার কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করার প্রয়াস থেকেই জন্ম নেয় গবেষণা। নির্দিষ্ট একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে তথ্য সংগ্রহ, পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ ও ফলাফল যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে একটি গবেষণা।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণাকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও অনেকটা তা প্রবন্ধ প্রকাশেই সীমাবদ্ধ। গবেষণা জ্ঞান সৃষ্টি, নীতি নির্ধারণ এবং সমাজ পরিবর্তনের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার। আর সেই গবেষণাকেই নিজের কর্ম, চিন্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে শক্তিতে রূপান্তরিত করার এক নিরলস অভিযাত্রায় রয়েছেন পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক প্রশান্ত কুমার শীল। সাংবাদিকতার এই শিক্ষক শিক্ষকতার পাশাপাশি গবেষণা, সম্পাদনা, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, কলাম লেখা এবং তরুণ গবেষকদের পরামর্শক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন।

গবেষণা নিয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে করণীয় ও বিভিন্ন ধাপের কথা জানান পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের এই শিক্ষক।

সহকারী অধ্যাপক প্রশান্ত কুমার বলেন, গবেষণা শুনলে আমাদের কেমন একটা ভয় কাজ করে। গবেষণা মূলত ভিন্নভাবে চিন্তা করা। আমরা এখন ডিজিটাল যুগে বসবাস করি। এই যুগটা খুব বেশি চ্যালেঞ্জিং। তাই আগামীতে ক্যারিয়ারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হতে পারে গবেষণা। গবেষণা করতে নির্দিষ্ট কোনো সময় লাগে না। সততা, পরিশ্রম ও নিষ্ঠার মাধ্যমে গবেষণায় মনোনিবেশ করা যায়। এর পাশাপাশি গবেষণাটা কোন বিষয়ে করবে, সেটাও নির্বাচন করতে হবে।

তিনি বলেন, গবেষণা করতে আরেকটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে তহবিল। আমাদের দেশের বেশিরভাগ শিক্ষার্থী বা গবেষক এটি নিয়ে চিন্তিত থাকেন। এই তহবিল না পাওয়ার পেছনে একটি কারণ আছে—গুণগত কাজ না হওয়া। কাজের গুণগত মান দেখাতে পারলে তহবিল পাওয়া সহজ। গতানুগতিক কাজ থেকে বের হয়ে ভিন্ন ধারার কাজ করলে সফল হওয়া যাবে।

ক্যারিয়ার হিসেবে গবেষণাকে বেছে নেওয়া কতটা যৌক্তিক জানতে চাইলে তিনি বলেন, ক্যারিয়ার হিসেবে গবেষণাকে বেছে নেওয়া খুবই জটিল এবং মজার। এটার জন্য ধৈর্য প্রয়োজন। কেননা, গবেষণায় রাতারাতি সফলতা আসে না। কিন্তু সঠিক নিয়মে দক্ষতা ও পরিশ্রম করতে পারলে সফলতা আসবেই।

গবেষণায় আসতে কী কী গুণ থাকা জরুরি জানতে চাইলে তিনি বলেন, যাদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বেশি, যারা পড়তে পারেন, যাদের নেটওয়ার্কিং ভালো, নতুন কিছু জানার কৌতূহল, সন্দেহপ্রবণ ও অনুসন্ধানী মনোভাব থাকতে হবে। ধৈর্য থাকতে হবে। এর পাশাপাশি তথ্য যাচাইয়ের দক্ষতা, বিভিন্ন তথ্যের মধ্যে সম্পর্ক, কারণ ও ফলাফল খুঁজে বের করতে পারা এবং প্রচলিত ধারণাকেও যুক্তি ও প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার করার সক্ষমতা থাকতে হবে। এছাড়া পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, প্রশ্ন করার দক্ষতা, লেখার দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতাও থাকা গুরুত্বপূর্ণ।

২০২৬ সালের ১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের সিন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার ইস্ট অ্যান্ড এশিয়া সেন্টার আয়োজিত চায়না-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর (সিপেক) আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তিনি বক্তা হিসেবে অংশ নেন। সেখানে তিনি বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও চীনের নতুন ত্রিমাত্রিক কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে তার গবেষণা নিবন্ধ উপস্থাপন করেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনের পাশাপাশি দেশের গবেষণা পরিবেশ উন্নয়নেও সমানভাবে সক্রিয় তিনি। ২৫ এপ্রিল ২০২৬ পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি আয়োজিত PCIU International Research Talk-এ তিনি কী-নোট স্পিকার হিসেবে বক্তব্য দেন। তার আলোচনার মূল বিষয় ছিল গবেষণা প্রবন্ধের গুণগত মান, আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনার কৌশল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা র‌্যাঙ্কিং উন্নয়নের বাস্তব দিকনির্দেশনা। গবেষণার মানোন্নয়নে তার প্রস্তাবনা তরুণ শিক্ষক ও গবেষকদের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে।

এর অল্প কিছুদিন পর, ১২ থেকে ১৫ মে ২০২৬ নাইজেরিয়ার বিখ্যাত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এডো স্টেট ইউনিভার্সিটির আর্টস অ্যান্ড কমিউনিকেশন অনুষদ আয়োজিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনেও তিনি কনফারেন্স স্পিকার হিসেবে অংশ নেন। সেখানে গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) ব্যবহার, নৈতিকতা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে তার বিশ্লেষণধর্মী বক্তব্য রাখেন।

গবেষণার আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে তিনি নেপাল, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ভারত ও শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশের গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে নিয়মিত কাজ করছেন।

লেখিকা : শিক্ষার্থী

ksrm