খুলির অংশ খুলে জীবনযুদ্ধ, প্রতিটি শ্বাসের দাম লাখ টাকা

আইসিইউতে এক পরিবারের শেষ আশা

বাড়ির সিঁড়ি থেকে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, জরুরি অস্ত্রোপচারে খুলির একটি অংশ অপসারণ, তারপর সংক্রমণ। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার ৩২ বছর বয়সী শাহিদুল ইসলাম পাবেল এখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি বিকেলে দুর্ঘটনার পর থেকে তিনি অচেতন অবস্থায় চট্টগ্রাম নগরীর ব্যস্ত প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ইম্পেরিয়াল হাসপাতাল–এর আইসিইউতে চিকিৎসাধীন। একটি অবুঝ শিশুর বাবাকে বাঁচাতে চিকিৎসকেরা লড়ছেন, আর পরিবার লড়ছে প্রতিদিনের বিপুল চিকিৎসা ব্যয়ের সঙ্গে।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, কর্ণফুলীর নিজ বাড়ির সিঁড়ি থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন পাবেল। প্রথমে তাঁকে মা ও শিশু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে এ্যাপোলো ইম্পেরিয়াল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে তিনি হাসপাতালের ৩-এম আইসিইউ-০৬ নম্বর কেবিনে ভেন্টিলেটর সাপোর্টে রয়েছেন।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, মস্তিষ্কের ভেতরে জমে থাকা রক্ত ও প্রচণ্ড চাপ কমাতে নিউরোসার্জন কর্নেল মো. আব্দুল হাই মানিকের নেতৃত্বে জরুরি অস্ত্রোপচার করা হয়। অস্ত্রোপচারে তাঁর মাথার খুলির একটি অংশ খুলে ভেতরের জমাট রক্ত বের করে দেওয়া হয়েছে। তবে অস্ত্রোপচারের পরও জটিলতা কাটেনি। মস্তিষ্কের পর্দায় ছড়িয়ে পড়ে মারাত্মক সংক্রমণ, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘মেনিনজাইটিস’। চিকিৎসকেরা জানান, শক্তিশালী ও প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের কারণে সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিকে সাড়া মিলছে না।

ভর্তির সময় তাঁর শারীরিক অবস্থা ছিল আশঙ্কাজনক। জ্বর ছিল ১০৩ দশমিক ৩ ডিগ্রি ফারেনহাইট এবং রক্তচাপ বিপজ্জনক মাত্রায় নেমে গিয়েছিল। সবচেয়ে উদ্বেগজনক ছিল ‘গ্লাসগো কোমা স্কেল’ বা জিসিএস স্কোর, যা রোগীর চেতনার মাত্রা নির্ধারণ করে। পাবেলের স্কোর এতটাই কম ছিল যে তিনি গভীর অচেতন অবস্থায় ছিলেন। চিকিৎসকেরা জানান, তাঁর বাম চোখের মণি অস্বাভাবিকভাবে ছোট ছিল এবং আলোতে প্রায় সাড়া দিচ্ছিল না। ডান চোখের মণি ছিল সম্পূর্ণ অচল, যা মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাতের লক্ষণ।

টানা চিকিৎসায় বর্তমানে জ্বর নিয়ন্ত্রণে এসেছে। জিসিএস স্কোর সামান্য বেড়েছে এবং তিনি নিজে থেকে শ্বাস নিতে পারছেন। তবে পুরোপুরি চেতনা না ফেরায় এন্ডোট্র্যাকিয়াল টিউব খুলে ফেলা সম্ভব হয়নি। চিকিৎসকেরা শ্বাসনালিতে স্থায়ী পথ তৈরির জন্য ট্রাকিওস্টমি করার পরিকল্পনা করছেন। হাসপাতালের সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, পাবেলের অবস্থা এখন ‘ক্রিটিক্যাল বাট স্টেবল’। তাঁর রক্তচাপ ১২০/৭০, পালস ৭৩ এবং ৬ লিটার অক্সিজেনে অক্সিজেন স্যাচুরেশন স্বাভাবিক রয়েছে। তবে ল্যাব রিপোর্টে ভেন্টিলেটর-জনিত নিউমোনিয়া ও মাইক্রোসাইটিক অ্যানিমিয়া ধরা পড়েছে। চিকিৎসকদের মতে, পরবর্তী ৭ থেকে ১৪ দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এলে তবেই পূর্ণ সচেতনতা ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

এদিকে চিকিৎসা ব্যয় বহনে হিমশিম খাচ্ছে পরিবার। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শুধু আইসিইউ ও ভেন্টিলেটরের খরচই প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। এর সঙ্গে কোলিস্টিন ও মেরোপেনেমের মতো শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক, অন্যান্য ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, কনসালটেশন ও নার্সিং খরচ মিলিয়ে দৈনিক ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় এক লাখ টাকার ওপরে। ছোটখাটো ব্যবসা করে সংসার চালানো পাবেলের পরিবারের পক্ষে এই ব্যয় বহন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

পাবেলের বড় ভাই হারুন বলেন, ভাইকে বাঁচাতে যা করার করছেন তাঁরা, কিন্তু সামর্থ্য ফুরিয়ে এসেছে। তাঁর ভাষ্য, পাবেলের একটি ছোট শিশু ও স্ত্রী রয়েছে, তাঁকে বাঁচানো একার পক্ষে সম্ভব নয়, সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।

এ পরিস্থিতিতে পরিবার ও স্বজনরা সহৃদয় ব্যক্তিবর্গের সহায়তা কামনা করেছেন। সহায়তা পাঠানোর জন্য পাবেলের বড় ভাই ফরিদের মুঠোফোন নম্বর ০১৬১৩-৫৩৮০০২ এবং ব্যক্তিগত বিকাশ নম্বর ০১৯৫৬-৭৫৬৩২৩ দেওয়া হয়েছে।

ksrm