খাগড়াছড়িতে সাংবাদিক গ্রেপ্তার আতঙ্ক, এবার তুলে নেওয়া হল জীতেন বড়ুয়াকে
একের পর এক হয়রানিমূলক মামলায় সাংবাদিকরা
খাগড়াছড়ি শহরের শাপলা চত্বর থেকে সাদা পোশাকের পুলিশের হাতে আটক হওয়ার একদিনের মাথায় কারাগারে পাঠানো হয়েছে খাগড়াছড়ি প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও সাংবাদিক জীতেন বড়ুয়াকে। এ ঘটনায় জেলার সাংবাদিকদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন মামলায় জড়িয়ে অন্তত আধাডজন সাংবাদিক ‘কঠিন সময়’ পার করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে মামলার ভয়ে ও হামলার আশঙ্কায় কয়েকজন সাংবাদিক আত্মগোপনে রয়েছেন বলেও জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
শুক্রবার (৮ মে) বিকেলে আদালতের মাধ্যমে জীতেন বড়ুয়াকে কারাগারে পাঠানো হয়। তিনি সময় টিভির স্টাফ রিপোর্টার, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার খাগড়াছড়ি জেলা প্রতিনিধি এবং খাগড়াছড়ি প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, বৃহস্পতিবার (৭ মে) রাতে মোটরসাইকেলে চলার সময় খাগড়াছড়ি শহরের শাপলা চত্বর এলাকা থেকে দুইজন সাদা পোশাকের পুলিশ তাঁকে টেনে-হিঁচড়ে একটি পুলিশভ্যানে তুলে নেয়। আটক অবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শে রাতেই তাঁকে জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
খাগড়াছড়ি সদর থানার ওসি মো. কায় কিসলু বলেন, জীতেন বড়ুয়ার বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দায়ের হওয়া দুটি জিআর মামলা রয়েছে। গোপন সূত্রের তথ্যের ভিত্তিতে তাঁকে আটক করা হয়েছে।
জীতেন বড়ুয়ার গ্রেপ্তারের ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব জার্নালিস্টস (আইএফজে), দক্ষিণ এশিয়া সাংবাদিক ফেডারেশন এবং বাংলাদেশ মানবাধিকার সাংবাদিক ফোরাম (বিএমএসএফ)। সংগঠনগুলোর পক্ষে বিএমএসএফের মহাসচিব সাংবাদিক খায়রুজ্জামান কামাল এক বিবৃতিতে তাঁর মুক্তি দাবি করেছেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, রাজনৈতিক ইন্ধনে খাগড়াছড়িতে অনেক পেশাদার সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় শুধু জেলার সাংবাদিকই নন, ঢাকা ও চট্টগ্রামে কর্মরত পরিচিত সাংবাদিকদেরও আসামি করা হয়েছে।
জীতেন বড়ুয়ার স্বজন ও সহকর্মীদের দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে থাকা পাঁচটি মামলার চারটি পাঁচ থেকে সাত বছর আগে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সংঘর্ষ-সংক্রান্ত। অপর মামলাটি ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের ওপর হামলার অভিযোগে দায়ের করা হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে অনেক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে একডজন পর্যন্ত মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে গত ২৬ অক্টোবর খাগড়াছড়ি সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ও সমকাল প্রতিনিধি প্রদীপ চৌধুরীকে একটি সামাজিক অনুষ্ঠান থেকে ‘মব’ করে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। পরে পাঁচ মাস ধরে নিম্ন আদালতে জামিন না পেয়ে তিনি উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন। ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়ার মাধ্যমে সাড়ে পাঁচ মাস পর জামিন পেলেও আরও পাঁচটি মামলায় তাঁকে পুনরায় গ্রেপ্তার দেখানো হয় এবং মোট সাড়ে নয় মাস কারাভোগ করতে হয় বলে বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে।
স্থানীয় সাংবাদিকদের অভিযোগ, বর্তমানে অনেক সাংবাদিক মামলা ও হামলার ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এছাড়া যমুনা টিভির শাহরিয়ার ইউনুছ, কালের কণ্ঠ ও এটিএন বাংলার আবু দাউদ, দেশ টিভির অপু দত্ত এবং ভোরের কাগজের শঙ্কর চৌধুরীও কঠিন সময় পার করছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
দীঘিনালায় চাঁদাবাজির অভিযোগে দায়ের হওয়া আরেকটি মামলায় আজকের পত্রিকার চট্টগ্রাম অফিসের স্টাফ রিপোর্টার আবু বক্কর সিদ্দিক, রামগড় উপজেলা প্রতিনিধি বেলাল হোসেন ও দীঘিনালা প্রতিনিধি আকতার হোসেনকে আসামি করা হয়েছিল। তবে পরে পিবিআই তদন্তে তাঁরা অব্যাহতি পান। ওই মামলায় কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার সাংবাদিক তোফায়েল ও রিয়াদসহ খাগড়াছড়ির আরও দুই সাংবাদিক চার মাস কারাভোগ করেছেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় সাংবাদিক বলেন, কয়েক দিন আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জেলা প্রশাসকদের ৫ আগস্ট-পরবর্তী মামলাগুলো যাচাই-বাছাই করে নির্দোষ ব্যক্তিদের হয়রানি বন্ধ এবং আইনি প্রক্রিয়ায় মামলা থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু খাগড়াছড়িতে এখনো তার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে।
তাঁরা আরও বলেন, নতুন সরকারের উচ্চপর্যায়ের কঠোর নজরদারি না থাকলে খাগড়াছড়িতে সাংবাদিকদের আইনগত অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না।




