ক্ষোভ আগের, ছুঁতো ১৭ টাকার— দিনেদুপুরে খুন, সাতকানিয়ার পুলিশ তবু মামলা নেয়নি

মৃত্যু নিশ্চিত করতে ঝাঁপিয়ে পড়ে সাতজন

দিনেদুপুরে খুনের ঘটনা ঘটলেও পুলিশ গেছে পাঁচ ঘন্টা পর, সন্ধ্যায়। তবু এমন গুরুতর ঘটনায় মামলাই নেয়নি থানার পুলিশ। খুনে ব্যবহৃত একটি মোটরসাইকেল জব্দ নিয়ে থানায় নিয়ে এলেও ঘটনার দিন রাত ১০টা পর্যন্ত স্বজনদের বসিয়ে রেখে শেষমেশ বিদায় করে দিয়েছে। পরের অন্তত দুদিন খুনের শিকার হওয়া দিনমজুরের পরিবার আকুতি জানিয়ে থানায় গেছে। কিন্তু প্রভাবশালী মহলের চাপের কথা জানিয়ে মামলা নিতে রাজি হয়নি থানা। পরে শর্ত দেয়, ঘটনায় মূল অভিযুক্ত স্থানীয় ছাত্রলীগ সভাপতিসহ তার অনুসারীদের নাম আসামির তালিকা থেকে বাদ দিলে মামলা নেওয়া হবে।

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার ছদাহা ইউনিয়নে ছুরিকাঘাতে নিহত আওয়ামী লীগ কর্মী দিনমজুর মোহাম্মদুল হক (৩৩) প্রকাশ্যে খুন হওয়ার পর থেকে তার পরিবার সাতকানিয়া থানা পুলিশের কাছ থেকে পেয়েছে এমন সব নির্মম আচরণ। অভিযোগে জানা গেছে, মোহাম্মদুলের স্বজনদের সাতকানিয়া থানার ওসি প্রিটন সরকার এমনও বলেছেন, ‘কোর্টও আমার সঙ্গে কথা না বলে এই মামলা নেবে না।’

উপায় না পেয়ে শেষ পর্যন্ত সোমবার (৩ জুন) চট্টগ্রামের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করেছেন নিহত মোহাম্মদুল হকের বড় ভাই এনামুল হক (৪১)। শুনানি শেষে আদালতের বিচারক সাতকানিয়া থানার অফিসার ইনচার্জকে (ওসি) ফৌজদারি অভিযোগটি সরাসরি এফআইআর হিসেবে গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছেন।

নৃশংস খুনের এই মামলার আসামিরা হলেন— সাতকানিয়ার ছদাহা আজিমপুর ৫ নং ওয়ার্ডের মো. সোলেমানের ছেলে মো. সাইফুল (২৪), আজিজুল হক প্রকাশ রাজা মিয়ার ছেলে আরিফুল ইসলাম সোহাগ (২৫), ফেরদৌসের ছেলে রায়হান (২২), আনিছুর রহমানের ছেলে তাসিব (২২) ও শফিকুর রহমানের ছেলে নুরুল ইসলাম ২৪), ছোট ঢেমশা ৬ নং ওয়ার্ডের মোহাম্মদ মিয়ার ছেলে ছদাহা ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি মিজানুর রহমান জয় (২৫), একই এলাকার নুরুল আবছারের ছেলে সাকিব প্রকাশ টোকাই সাকিব (২৪) ও মাহবুবুর রহমানের ছেলে আরফিন সুলতান (২২)। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ১৫-২০ জনকে মামলায় আসামি করা হয়।

মঙ্গলবার (২৮ মে) দুপুর ২টায় ছদাহা ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড মিঠার দোকান এলাকার জাকির স্টোরের সামনে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ছোট ভাই মোহাম্মদুলকে বাঁচাতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হাতে ছুরিকাঘাতে আহত হন মেজ ভাই জিয়াবুল হকও (৩৬)। সিএনজিচালিত ট্যাক্সি চালিয়ে জীবিকা চালান জিয়াবুল।

মোহাম্মদুল হকের বাড়ি সাতকানিয়ার ফকিরহাট এলাকার মিঠার দোকান এলাকায়। তিনি মিঠার দোকান এলাকায় স্থানীয় মাওলানা ফিশ ফিড কোম্পানিতে দিনমজুরের কাজ করতেন। ৫ বছর বয়সী এক কন্যাসন্তান রয়েছে তার। মোহাম্মদুল হকের বাবা ছদাহা পূর্ব আজিমপুর ৫ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি বদিউল আলম।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মোহাম্মদুল গত সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রার্থীর এজেন্ট ছিলেন। ওই নির্বাচনের পর থেকেই তিনি হত্যার হুমকি পাচ্ছিলেন বলে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন। সম্প্রতি ওই ইউনিয়নে ছাত্রলীগের নতুন কমিটি হওয়ার পর এই হুমকি আরও বেড়ে যায়। সর্বশেষ খুনের ঘটনার আগের দিনও প্রাণনাশের হুমকি পান তিনি।

এদিকে আদালতে দেওয়া অভিযোগ ও জবানবন্দিতে ওঠে এসেছে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বিবরণ।

ক্ষোভ আগের, ছুঁতো ১৭ টাকার

২৬ মে মোহাম্মদুল হক তার কর্মস্থল মাওলানা ফিশ ফিড থেকে নাস্তা করার জন্য আজিমপুর এলাকায় ফেরদৌসের চা দোকানে নাস্তা করতে যান। কিন্তু তার পকেটে টাকা না থাকায় দোকানদারের ছেলে রায়হানকে মোহাম্মদুল হক জানান, সন্ধ্যায় কাজ শেষ করে যাওয়ার সময় বকেয়া ১৭ টাকা শোধ করে যাবেন। কিন্তু নাছোড়বান্দা রায়হান অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে বকেয়া টাকা দেওয়ার জন্য চাপ দেন। এমন অবস্থায় মোহাম্মদুল হক তার কর্মস্থলের ম্যানেজারের কাছ থেকে ধার নিয়ে ১৭ টাকা বকেয়া শোধ করে কাজে চলে যান। এরপরও দোকানদারের ছেলে রায়হান মোহাম্মদুলের নামে নানা ধরনের কুৎসা রটাতে থাকেন। এর কারণ জানতে চেয়ে মোহাম্মদুল তার বন্ধু কফিল উদ্দিনকে নিয়ে সেই চা দোকানে যান। সেখানে তখন ছদাহা ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি মিজানুর রহমান জয় ছাড়াও স্থানীয় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য সাইফুল ও আরিফুল ইসলাম সোহাগ উপস্থিত ছিলেন। এ সময় তারা দোকানদারের ছেলে রায়হানের পক্ষ নিয়ে মোহাম্মদুল হকের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন। তাদের মারমুখী অবস্থা দেখে মোহাম্মদুল সেখান থেকে একপর্যায়ে চলে যান।

খুনের একদিন আগেও হুমকি

কিন্তু পরদিন ২৭ মে বিকেল চারটার দিকে ছদাহা ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি মিজানুর রহমান জয়ের নেতৃত্বে ১৫ থেকে ২০ জনের একটি সংঘবদ্ধ কিশোর গ্যাং সশস্ত্র অবস্থায় মোহাম্মদুলের বাড়িতে গিয়ে গালিগালাজের একপর্যায়ে তাকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে চলে যায়।

এক ছুরিতেই শেষ নাড়িভুঁড়ি

২৮ মে দুপুর ২টার দিকে মোহাম্মদুল হক ও মোহাম্মদুলের বড় ভাই এনামুল হকের শ্যালক আরিফুল ইসলাম নাস্তা করার জন্য ছদাহা মিঠার দোকান এলাকার জাকির সওদাগরের দোকানে গেলে তারা দেখেন, অন্তত সাতজন বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র প্রকাশ্যে নিয়ে সেখানে বসে আছেন। এর মধ্যে সাইফুল, রায়হান ও আরিফুল ইসলাম সোহাগের হাতে টিপ ছুরি ছিল। অন্যদিকে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ছিল ছাত্রলীগ নেতা মিজানুর রহমান জয়, সাকিব প্রকাশ টোকাই সাকিব, তাসিব, নুরুল ইসলাম ও আরফিন সুলতানের হাতে। অস্ত্রগুলো দেখে মোহাম্মদুল হক ও আরিফুল ইসলাম দোকান ছেড়ে বের হওয়ার জন্য চাইতেই অপেক্ষমাণ সশস্ত্র কিশোর গ্যাং সদস্যরা তাদের পথরোধ করে। এর একপর্যায়ে তারা মোহাম্মদুল হককে ঝাপটে ধরে দোকানের ভেতরে ঢুকিয়ে ফেলে। এ সময় সাইফুল তার হাতে থাকা ধারালো ছুরি মোহাম্মদুল হকের নাভির নিচে সজোরে ঢুকিয়ে দেয়। এ সময় তার নাড়ি ভুঁড়ি কাটা অবস্থায় মাটিতে নিথর হয়ে পড়ে যান মোহাম্মদুল।

মৃত্যু নিশ্চিত করতে ঝাঁপিয়ে পড়ে সাতজন

এরপরও তার মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য স্থানীয় ছাত্রলীগ সভাপতি মিজানুর রহমান জয়, সোহাগ, রায়হান, টোকাই সাকিব, তাসিব, নুরুল ইসলাম ও আরফিন সুলতান মোহাম্মদুলের নিথর শরীরের ওপর এলোপাতাড়ি ঘুষি ও লাথি মারতে থাকেন। মোহাম্মদুলের গোঙানির শব্দ শুনে তার বড় ভাই সিএনজিচালক জিয়াবুল হক জিয়া ও ভাইয়ের শ্যালক আরিফুল ইসলাম তাকে বাঁচাতে গেলে টোকাই সাকিব ও তাসিব জিয়াবুলকে ঝাপটে ধরে রাখে। ওই চক্রের সদস্য আরিফুল ইসলাম সোহাগ এ সময় জিয়াবুলের পেটে ছুরি ঢুকিয়ে দিলে তিনিও মাটিতে পড়ে যান। এ সময় আরিফুল ইসলামকেও বেদম মারধর করে তারা।

পথেই শেষ জীবনপ্রদীপ

এদিকে ঘটনার খবর শুনে আশেপাশের লোকজন এগিয়ে আসলে হত্যাকারীরা তাদের ব্যবহৃত একটি মোটরসাইকেল ফেলেই ঘটনাস্থল ছেড়ে যায়। পরে স্থানীয় লোকজন আহত জিয়াবুল হক জিয়ার পরা শার্ট খুলে দুই ভাই মোহাম্মদুল হক ও জিয়াবুলের জখম হওয়া পেটে বেধে সাতকানিয়ার কেরানিহাটের একটি হাসপাতালে নিয়ে যায়। তবে গুরুতর অবস্থা দেখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। এরপর অ্যাম্বুলেন্সে করে কয়েক ঘন্টা পর চট্টগ্রাম মেডিকেলের জরুরি বিভাগে পৌঁছালে কর্তব্যরত চিকিৎসক মোহাম্মদুল হককে মৃত ঘোষণা করেন। গুরুতর আহত আরেক ভাই জিয়াবুলকে ক্যাজুয়ালটি ওয়ার্ডে ভর্তি করানো হয়।

২৯ মে চট্টগ্রাম নগরীর পাঁচলাইশ থানার একজন পুলিশ অফিসার মোহাম্মদুল হকের লাশের সুরতহাল এবং ময়নাতদন্ত শেষে লাশটি পরিবারের হাতে হস্তান্তর করেন।

ক্ষোভ ছিল পুরনো

মোহাম্মদুল হকের ভাই এনামুল হক বলেন, ‘যেহেতু সংগঠনের বিভিন্ন পদ ও দায়িত্বে আছি আমরা, সে কারণে নেত্রীর নির্দেশে নৌকার পক্ষে কাজ করেছে আমাদের পরিবার। আওয়ামী লীগের পক্ষে কাজ করা যে এতো বড় কাল হয়ে দাঁড়াবে আমরা ভাবতেও পারিনি।’

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!