ক্ষুধা ভুলতে ‘ড্যান্ডি’র নেশায় ডুবে চট্টগ্রামের পথশিশুরা, ১০ থেকে ১৬ বছর বয়সীদের নিয়েই উদ্বেগ বেশি
চট্টগ্রামে পুনর্বাসন পেয়েছে শতাধিক শিশু
চট্টগ্রাম নগরের ব্যস্ত মোড়, রেলস্টেশন, ফুটওভার ব্রিজ কিংবা বাসস্ট্যান্ডে দিনের আলোতেই দেখা যায় একই দৃশ্য। হাতে ছোট একটি পলিথিন, তার ভেতরে জুতা তৈরির কাজে ব্যবহৃত সলিউশন গাম। কয়েকবার গভীরভাবে শ্বাস নেওয়ার পরই তারা হারিয়ে যায় নেশার ঘোরে। অধিকাংশের বয়স ১০ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে। ক্ষুধা ভুলে থাকতে তারা বেছে নিয়েছে ‘ড্যান্ডি’ নামের এই সস্তা নেশা। অথচ এই শিশুদের সংখ্যা কত, তাদের চিকিৎসা বা পুনর্বাসনের অবস্থা কী, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর কাছেই নেই নির্ভরযোগ্য তথ্য।
চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের ফুটপাতে কথা হয় ১৬ বছর বয়সী মোহাম্মদ রায়হানের সঙ্গে। মুখে পলিথিন চেপে ধরে সে ড্যান্ডির বাষ্প টানছিল। কিছুক্ষণ পরই নেশার ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। নিজের জীবনের গল্প বলতে গিয়ে জানায়, মা মারা যাওয়ার পর বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। সৎমায়ের নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে কুমিল্লা থেকে পালিয়ে এসে কদমতলী রেলস্টেশন এলাকায় বসবাস শুরু করে। কেন ড্যান্ডি সেবন করে, জানতে চাইলে রায়হান বলে, ‘আপা, এটা একটা সুখ। যা খাইলে রাজ্যের রাজা মনে হয়। ক্ষুধা তো লাগেই না, আর ঘুমায়। আবার পরেরদিন ওঠে আবার খায়। এটায় আমার জীবন।’
রায়হানের গল্প ব্যতিক্রম নয়। নগরের নিউমার্কেট, ২ নম্বর গেট, বহদ্দারহাট, সিআরবি, টাইগারপাস, কদমতলী বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন সড়ক ও লালদীঘির পাড়সহ বিভিন্ন এলাকায় সন্ধ্যার পর জড়ো হয় পথশিশুরা। ভাঙারি কুড়িয়ে বা ভিক্ষা করে যা আয় হয়, তার একটি অংশ খরচ হয় ড্যান্ডি কিনতে। কম দামের কারণে ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরাও এ নেশায় জড়িয়ে পড়ছে।
ড্যান্ডি নামে পরিচিত এই নেশার মূল উপাদান ড্যানড্রাইট অ্যাডহেসিভ। এতে থাকা কার্বন-ট্রাই-ক্লোরাইড, টলুইন, অ্যাসিটোন ও বেনজিনের বাষ্প শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করে তারা। নিয়মিত ব্যবহারে এটি তীব্র আসক্তিতে পরিণত হয়। ক্ষুধার অনুভূতি কমিয়ে দেওয়ায় খাবারের অভাবে থাকা পথশিশুরা ধীরে ধীরে এ নেশার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
চিকিৎসকরা জানান, টলুইন নামক বিষাক্ত উপাদানমিশ্রিত ‘ড্যান্ডি’ ব্যবহারে মস্তিষ্কের কোষ ধ্বংস, স্মৃতিশক্তি হ্রাস, মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়া ছাড়াও লিভার-কিডনি নষ্ট, শ্বাসকষ্ট, হার্ট অ্যাটাক এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
এই নেশার ভয়াবহতার একটি উদাহরণ মিলেছে গত ১৬ মে। সেদিন সন্ধ্যা ৬টার দিকে চট্টগ্রাম রেলস্টেশনের দ্বিতীয় শ্রেণির শৌচাগার থেকে ১৫ বছর বয়সী পথশিশু নাঈমকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। রেলস্টেশন সূত্র জানায়, নারীদের শৌচাগারে ঢুকে ড্যান্ডি সেবনের সময় অজ্ঞান হয়ে পড়ে সে। পরে নারী যাত্রীরা দরজা খুলতে না পেরে স্টেশন কর্তৃপক্ষকে জানালে ফায়ার সার্ভিস এসে তাকে উদ্ধার করে।
শুধু আসক্তিই নয়, নেশার অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে অনেক পথশিশু অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে। বিভিন্ন এলাকার পথচারীরা জানান, চুরি, ছিনতাই এবং পথচারীদের ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনায় এসব শিশু-কিশোরের একটি অংশ জড়িয়ে পড়ছে। ধরা পড়লে অনেকেই গণপিটুনির শিকার হচ্ছে।
তবে সমস্যার ব্যাপকতা সম্পর্কে সরকারের কাছে স্পষ্ট কোনো চিত্র নেই। সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. ওমর ফারুক জানান, আসক্ত পথশিশুদের বিষয়ে তাদের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই।
অন্যদিকে সামাজিক সংগঠন নগরফুলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান বায়েজিদ সুমন বলেন, চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় তাদের কার্যক্রম চলছে। এ পর্যন্ত ১০০-এর বেশি পথশিশুকে পুনর্বাসন করা হয়েছে এবং কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু জায়েদ মোহাম্মদ নাজমুন নূর বলেন, যেকোনো ধরনের মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি রয়েছে। মাদকে আসক্ত শিশুদের বিরুদ্ধেও অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
তবে শিশুদের জন্য আলাদা কোনো কর্মসূচি না থাকার কথা স্বীকার করেছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম মেট্রো কোতোয়ালী জোনের পরিদর্শক মোহাম্মদ আবুল কাশেম। তিনি বলেন, বর্তমানে শিশুদের নিয়ে পৃথক কোনো কার্যক্রম নেই। তবে তাদের জন্য একটি নিরাময়কেন্দ্র নির্মাণের কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। শিশুদের নিয়ে আলাদা কোনো অভিযান বা বিশেষ ব্যবস্থাও এখন পর্যন্ত চালু হয়নি।
একদিকে প্রকাশ্যে ড্যান্ডি সেবন করছে পথশিশুরা, অন্যদিকে তাদের প্রকৃত সংখ্যা, আসক্তির মাত্রা কিংবা পুনর্বাসনের প্রয়োজন নিয়ে সরকারি কোনো সমন্বিত তথ্যভান্ডার নেই। ফলে ক্ষুধা, আসক্তি ও অপরাধের যে দুষ্টচক্রে এসব শিশু আটকে পড়ছে, তা থেকে বের করে আনতে কার্যকর উদ্যোগ এখনও বড় প্রশ্ন হয়ে রয়ে গেছে।
ডিজে/সিপি




